
রাজধানীর উত্তরখানে তুরাগ নদ থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সাউরির মরদেহ উদ্ধারের পর তাঁর মৃত্যু ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এটি হত্যাকাণ্ড, দুর্ঘটনা নাকি অন্য কোনো কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে—তা নিয়ে চলছে আলোচনা। এর মধ্যেই তাহসিফের এক সাবেক সহপাঠী ও বন্ধুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্ট নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বন্ধুর আশঙ্কা, ব্যক্তিগত বিরোধ বা দুর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত না হলে এর পেছনে রাজনৈতিক কারণও থাকতে পারে।
তাহসিফের সহপাঠী কেএসএম ইনতিসার ইনজিমাম ফেসবুক পোস্টে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে তাহসিফের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠার পর বিভিন্নভাবে তাঁর মানহানি করা হয়েছিল। তবে তাঁর জানা মতে, এ ঘটনায় তাহসিফের বিরুদ্ধে কোনো পুলিশি মামলা হয়নি।
বন্ধুর দাবি, ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন বিষয়ে তাহসিফকে হেয় করা হয়েছিল। এসব ঘটনার সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তবে বন্ধুর এই আশঙ্কার পক্ষে কোনো প্রমাণ তুলে ধরা হয়নি।
ইনতিসার আরও লেখেন, তাহসিফের মরদেহের ছবিতে তাঁর হাতে কাদা দেখা গেলেও শরীরের অন্য অংশ পরিষ্কার ছিল। বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তবে এ ধরনের শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
আদমজী কলেজে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন তাহসিফ ও ইনতিসার। পরে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে ৭৯ বিএমএ ইক্যুইভ্যালেন্ট কোর্সেও তাঁরা সহপাঠী ছিলেন। বন্ধুর ভাষ্য, তাঁদের আদর্শগত পার্থক্য থাকলেও তাহসিফ তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন।
যেভাবে উদ্ধার হয় মরদেহ
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উত্তরার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন তাহসিফ। বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তুরাগ নদের রাজাবাড়ি ঘাট এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। কচুরিপানার মধ্যে ভাসমান অবস্থায় মরদেহটি পাওয়া যায়। এ সময় তাঁর পরনে ছিল কালো জামা ও সাদা ট্রাউজার।
টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ফিরোজ উদ্দিন জানান, ৯৯৯ নম্বরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর জানা যাবে।
ঢাকা জেলা নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, তাহসিফের শরীরে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান, এ ঘটনায় তখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি।
৫ আগস্টের ভিডিও নিয়ে বিতর্ক
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়কার একটি ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার সঙ্গে তাহসিফের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তবে অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পরে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, তাহসিফ সাউরি ও আরেক কর্মকর্তা রিফাত আশরাফীকে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিমানবাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী অবসর দেওয়া হয়েছে। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে বিভ্রান্তিকর বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল।
এদিকে, তাহসিফের মৃত্যুর ঘটনায় বন্ধুর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, তার কোনো সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের তথ্যের ভিত্তিতেই মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

