
মেয়েটি সেদিন সুন্দর করে সেজেছিলো । সাদা লাল পাড় ধনেখালি শাড়ী পড়েছিলো । হাতে কয়েকটা লাল কাঁচের চুড়ি কপালে লাল টিপ আর হাত খোপা করে তাতে একটা ফুল গুজে ছিলো ।একটু হালকা প্রসাধনী মেখে নিজেকে সাজিয়ে ছিলো । ছোট আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নিজে দেখে কেমন যেনো একটা আনন্দ খেলে গেলো মনে। ছেলেটি আজ আসবে ঠিক বিকেল পাঁচটায় । সে রকমই কথা ছিলো । তাই মেয়েটি নিজেকে সাজিয়েছে ছেলেটির পছন্দ মতো । ছেলেটি ঠিক পাঁচটাতে এসে দাঁড়ালো হলের গেঁটের সামনে। ছেলেটি আর মেয়েটির ছাত্রাবাসের দূরত্ব পাঁচ থেকে সাত মিনিট । তা সত্ত্বেও তাদের ডাক পিয়নের চিঠির মাধ্যমে কথা বার্তা হতো কখন কবে দেখা হবে হলের সামনে নাকি ক্লাস রুমের সামনে ।দেখা হওয়া মানে বিশেষ কিছু না। দুজন হেটে হেটে গল্প করা কিংবা একটু নিরিবিলি জায়গাতে বসে অন্য অনেক গল্পের মাঝে ভালোবাসার গল্প একটু হাতে হাত রাখা এতোটুকুই । কিন্তু দুজন দুজনকে ভালবেসেছিল প্রান দিয়ে । কেউ কাউকে ছেড়ে কখনো যাবে না সে প্রতিজ্ঞাও করেছিলো তারা। কিন্তু মেয়েটি তার প্রতিজ্ঞা রাখতে পারেনি। ছেলেটি পাঁচটা সময় এসে মেয়েটিকে খুঁজে পেলো না। তার আগেই মেয়েটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো বিশেষ একটি কাজের কথা বলে। মেয়েটি মুখ ফুটে বলতে পারলো না, নাহ আমি যেতে পারবো না। আমার একজনের সাথে দেখা করার কথা আছে। শুধু এক বন্ধুকে বলে গেলো, পারিবারিক কারনে আমাকে চলে যেতে হোল, আরেকদিন দেখা করবো । ছেলেটি নিরাশ হয়ে মন খারাপ করে ফিরে গেলো। কিন্তু মেয়েটির আর কোনদিনও ছেলেটির সাথে দেখা হোল না। মেয়েটি খাঁচায় বন্ধী হয়ে গেলো । ছেলেটির সাথে যোগাযোগের পথে কাটা ছড়িয়ে দেয়া হোল । দুজন দুজনের সাথে শেষ কথটিও বলা হোল না। মেয়েটি বলতে পারলো না ছেলেটিকে তুমি আমাকে বাঁচাও আমি বড্ড বিপদে আছি। নিজেরা বসে কোন সিধান্ত নিতে পারলো না তাদের এখন কি করা উচিৎ।
গাড়ী ছুটে চলেছে । মেয়েটির চোখ থেকে শ্রাবণ ধারার মতো অশ্রু ঝরে পরছে। পাশে বসে থাকা মেয়েটির বাবা যেনো কিছুই দেখছেন না কিছুই বুঝছেন না সে ভঙ্গিতে বসে থাকলেন।মেয়েটি বুঝতে পারছিলো না কি অপরাধের শাস্তি দিতে তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ঘটনাগুলো একের পর এক খুব দ্রুত গতিতে ঘটে গেলো। মেয়েটি সকালে কাঁদলো, দুপুরে কাঁদলো , বিকেলে কাঁদলো , সারারাত কেঁদে বালিশ ভিজালো কিন্তু তার এই কান্নার কেউ কোন গুরুত্ব দিলো না। মেয়েটিও শক্ত ভাবে প্রতিবাদ করতে পারল না। নাহ আমি এখন বিয়ে করবো না। বিয়ের কাজে এমন ব্যস্ত হয়ে গেলো সবাই যে ইচ্ছাকৃত ভাবে তারা ভুলে গেল মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করতে মেয়েটির বিয়েতে মত আছে কিনা এবং ওরা তার হবুবরের একটা ছবি দেখাতেও যেন ভুলে গেলো।
মেয়েটি বুকের মাঝে একরাশ ব্যথা নিয়ে অনুভূতিহীন ভাবে স্বামীর সংসারে পা রাখলো। সুখে দুঃখে, হাসি বেদনায় অনেক গুলো বছরই কাটিয়ে দিলো মেয়েটি। কিন্তু মেয়েটির বুকে তার পরিবার যে নিষ্ঠুরতার ক্ষত লাগিয়ে দিয়েছিলো সেটা মাঝে মাঝেই দগদগ ঘায়ের মত জ্বলতে থাকে। এখন মেয়েটি আর মেয়ে নেই। এখন তার হেলে পড়া যৌবন । কিন্তু এখনও মেয়েতির ঘা টি শুকিয়ে যায়নি। তার পরিবারের নির্দয় নিষ্ঠুরতার কথা মনে হলে ঘুম ভেঙ্গে পায়চারি শুরু করে এখনো। তার প্রতি কেন এমন অন্যায় আচরণ করা হয়েছিলো তার জবাব এখনো মেয়েটির জানতে ইচ্ছা করে। নিজের কাছে নিজের জানতে ইচ্ছা করে কেনো সে নিজেকে শক্ত করে দাঁড়াতে পারলো না। তার দেহের পুরো অংশ গুলো কেন এমন দুর্বল হয়ে পড়েছিলো?জীবনের এতোটা সময় কেটে গেছে। কিন্তু মেয়েটি সারা জীবন ছেলেটিকে মনে করে বার বার গুনগুন করে গেয়েছে-“তুমি রবে নিরবে হৃদয়ে মম” । মেয়েটির আর কোনোদিনও দেখা হোল না ছেলেটির সাথে।

