
দিনাজপুরের বিরামপুরে ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ৮৫ বছর বয়সী প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মওলা বক্স। ২০১১ সালে স্ত্রী জাহানারা বেগম বক্স ঝর্ণাকে হারানোর পর থেকে প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষে ঝাঁড়ু হাতে কবরস্থানে যান তিনি। স্ত্রীর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করেন, তারপর নিজের হাতে পরিষ্কার করেন পুরো কবরস্থান।
১৯৭০ সালে সামাজিক বাধা পেরিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বী এক তরুণীকে বিয়ে করেছিলেন মওলা বক্স। বিয়ের পর স্ত্রীর নাম রাখা হয় জাহানারা বেগম বক্স ঝর্ণা। ভালোবাসা, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধায় গড়ে ওঠে তাঁদের দীর্ঘ দাম্পত্যজীবন। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে কেটেছে তাঁদের সুখের দিনগুলো।
চার দশকেরও বেশি সময়ের জীবনসঙ্গীকে হারানোর পর স্ত্রীর স্মৃতিকে আগলে রাখার পথ হিসেবে বেছে নেন কবরের পরিচর্যা। প্রথমে শুধু স্ত্রীর কবর পরিষ্কার করলেও ধীরে ধীরে পুরো কবরস্থানের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। বয়সের ভার কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়া—কোনো কিছুই তাঁর এই অভ্যাসে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
মওলা বক্স বলেন, তাঁর স্ত্রী নিজের পরিবার, ধর্ম ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে তাঁর ওপর বিশ্বাস রেখেই সংসার গড়েছিলেন। স্ত্রীর সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ঋণ শোধ করার সাধ্য তাঁর নেই। সেই আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করেই প্রতিদিন কবরস্থানে আসেন তিনি।
দিনাজপুর জজ কোর্টের এই প্রবীণ আইনজীবী বিরামপুর জেলা বাস্তবায়ন আন্দোলনের স্বপ্নদ্রষ্টা ও সভাপতি হিসেবেও পরিচিত। তবে কবরস্থানে তাঁর পরিচয় পদ-পদবিতে নয়; সেখানে তিনি কেবল প্রিয়জনের স্মৃতি আগলে রাখা একজন স্বামী।
মওলা বক্সের কাছে কবর পরিষ্কার করা নিছক দৈনন্দিন কাজ নয়, বরং প্রয়াত স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক নীরব ভাষা। তাঁর প্রতিদিনের এই অভ্যাস মনে করিয়ে দেয়, প্রিয় মানুষটি চলে গেলেও ভালোবাসা ফুরিয়ে যায় না। কখনো কখনো সেই ভালোবাসা বেঁচে থাকে ছোট্ট একটি কাজে, দীর্ঘদিনের অভ্যাসে আর স্মৃতির কাছে বারবার ফিরে যাওয়ার মধ্যে।

