তিন ভাইয়ের তিন শিল্পভাষা, আর টরন্টোয় এক আনন্দময় সন্ধ্যা

তিন ভাইয়ের তিন শিল্পভাষা, আর টরন্টোয় এক আনন্দময় সন্ধ্যা - the Bengali Times
সৈয়দ ইকবাল

টরন্টোর শিল্পাঙ্গনে পাকিস্তানের তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীদের উপস্থিতি ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। সেই ধারাবাহিকতায় দাওয়ানি আর্ট গ্যালারী প্রায় ছয় থেকে আট মাস অন্তর পাকিস্তানের উদীয়মান শিল্পীদের নিয়ে যৌথ প্রদর্শনীর আয়োজন করে থাকে। এবার ৮ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত তারা আয়োজন করেছে তিন শিল্পী ভাই ফারহাত আলী, রাহাত আলী ও রওনক আলীর যৌথ চিত্রপ্রদর্শনী। শিরোনাম ‘3 Brothers, 3 Voices’। প্রদর্শনীটি কিউরেট করেছেন টরন্টোর দক্ষিণ এশীয় শিল্পসমাজের পরিচিত মুখ মারিকা সার্দার।

টরন্টোর ডাউনটাউনের প্রাণকেন্দ্র ডানডাস স্ট্রিট ওয়েস্টে অবস্থিত ‘আঁতেলিয়ে নেক্সট ডোর’ গ্যালারিতে বসেছে এই প্রদর্শনী। ছোট্ট, ছিমছাম, বেশ আরামদায়ক একটি শিল্পপরিসর। ন্যান্সি ও তাঁর স্বামী মিলে গ্যালারিটি পরিচালনা করেন। দাওয়ানি আর্ট গ্যালারি তাঁদের কাছ থেকে জায়গা ভাড়া নিয়ে নিয়মিত প্রদর্শনীর আয়োজন করে।

- Advertisement -

পাকিস্তানের লাহোর ও করাচির শিল্পজগৎ এবং সেখানকার শিল্পীরা সমসাময়িক আন্তর্জাতিক শিল্পচর্চায় কতটা এগিয়ে গেছেন, তাঁদের কাজ না দেখলে তা বোঝা কঠিন। যুগের পর যুগ সামরিক শাসনের নানা বিধিনিষেধের মধ্যে থেকেও তাঁরা শিল্পচর্চা চালিয়ে গেছেন। আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনে নিজেদের তুলে ধরার সুযোগও তাঁদের খুব বেশি ছিল না। তবু প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে তাঁরা অনেক দূর এগিয়েছেন। অন্তত আন্তর্জাতিক শিল্পপরিসরে নিজেদের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তুলনায় পাকিস্তানের শিল্পীরা বেশ এগিয়ে আছেন বলেই আমার মনে হয়।

একটি ছোট্ট উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। টরন্টো ও মিসিসাগায় পাকিস্তানের দুই নারী শিল্পী নিজস্ব উদ্যোগে আর্ট গ্যালারি প্রতিষ্ঠা করে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালনা করেছেন। টরন্টোর বিখ্যাত আগা খান মিউজিয়ামে গত দশ বছরে পাকিস্তানের সমসাময়িক শিল্পীদের চারটি যৌথ প্রদর্শনী হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের শিল্পীদের নিয়ে সেখানে আজ পর্যন্ত এমন একটি প্রদর্শনীও হয়নি! আগামী দশ বছরে হবে কি না, কে জানে!

এ প্রসঙ্গে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে।

একসময় আগা খান মিউজিয়ামের মহাপরিচালক হেনরি কিম ছিলেন আমার বন্ধুস্থানীয়। তাঁকে বহুবার অনুরোধ করেছি, ‘বাংলাদেশের সমসাময়িক শিল্পীদের নিয়ে একটা যৌথ প্রদর্শনী না করে আগা খান ছেড়ে অন্য কোথাও যেয়ো না, ভাই!’

হেনরি কিম প্রতিবারই বলতেন, ‘তুমি একা বললে তো হবে না। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠাতে বলো। তারপর আমি দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারব।’

দেশে গেলে কয়েকবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালকের সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি আমার অত্যন্ত পরিচিতজন ছিলেন। গেলে আন্তরিকভাবে আপ্যায়ন করতেন, ভালো করে খাওয়াতেন। আর প্রস্তাব পাঠানোর কথা বললেই বলতেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই হবে।’

টরন্টোয় ফিরে হেনরি কিমকে আবার জিজ্ঞেস করতাম, ‘বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কি প্রস্তাব পাঠিয়েছে?’

কিমের উত্তর প্রতিবারই এক, ‘না!’

এভাবে ‘না’ শুনতে শুনতেই একদিন হেনরি কিম আগা খান মিউজিয়াম ছেড়ে অটোয়ার ন্যাশনাল মিউজিয়ামে নতুন দায়িত্ব নিয়ে চলে গেলেন। এদিকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সেই মহাপরিচালকও পদ ছেড়ে দিলেন। শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটি আর পাঠানোই হলো না!

বাংলাদেশের শিল্পীদের আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার একটি সম্ভাবনাময় সুযোগ এভাবেই হাতছাড়া হয়ে গেল।

যাক, ফিরে আসি টরন্টোর সেই প্রদর্শনীতে।

টরন্টোর ডাউনটাউনে গাড়ি নিয়ে যাওয়া মানেই পার্কিংয়ের এক মহা ঝামেলা। তার ওপর কর্মদিবস বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা হলে তো কথাই নেই! তাই ঠিক করলাম, বাসা থেকে বাসে কেনেডি সাবওয়ে স্টেশন, সেখান থেকে পাতালরেলে ডাউনটাউন, তারপর ডানডাস স্ট্রিটকারে চড়ে একেবারে গ্যালারির সামনে নেমে পড়ব।

ভাবলাম, শিল্পীবন্ধু তাজউদ্দিন আহমদকে সঙ্গে নিয়ে যাই। একা যাওয়ার চেয়ে দুজনে গেলে নিশ্চয়ই বেশি ভালো লাগবে।

প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বিকেল পাঁচটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত। পৌঁছে দেখি, গ্যালারি ইতোমধ্যেই নানা বর্ণ ও জাতিগোষ্ঠীর শিল্পপ্রেমী মানুষের উপস্থিতিতে মুখর। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় শিল্পানুরাগীদের বেশ সমাগম হয়েছে।

মন ভালো ছিল, মেজাজও ছিল ফুরফুরে। তাই পকেট থেকে মুঠোফোন বের করে ভিডিও ধারণ শুরু করলাম। পাকিস্তানের তিন তরুণ শিল্পী অবশ্য প্রদর্শনীতে উপস্থিত থাকতে পারেননি। এসেছে শুধু তাঁদের শিল্পকর্ম।

দর্শনার্থীদের কাছে জানতে চাইছিলাম, শিল্পকর্মগুলো কেমন লাগছে। মজার ব্যাপার হলো, যে সুন্দরীর কাছেই নাম জানতে চাই, উত্তর আসে ‘মারিয়া’! একজন মারিয়া খান, অন্যজন মারিয়া আকবর।

কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘পাকিস্তানে এত মারিয়া! তোমরা কি খ্রিষ্টান?’

তাঁরা দুজনেই একসঙ্গে ‘না, না’ বলে উঠলেন।

যাক, মাতা মারিয়া সবাইকে সুমতি দিন!

প্রদর্শনীতে দীর্ঘদিন পর দেখা হয়ে গেল ভারতীয়-কানাডীয় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও বিশিষ্ট শিল্পসংগ্রাহক, আমার শিল্পীবন্ধু বিশাল মিশ্রের সঙ্গে। পাকিস্তানের এই তিন তরুণ শিল্পীর তিনটি চিত্রকর্মই তিনি কিনেছেন।

বিশাল মিশ্রের শিল্পসংগ্রহ সত্যিই বিস্ময়কর। ভারতীয় আধুনিক শিল্পকলার প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীর কাজ রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। যামিনী রায়েরই রয়েছে কয়েকটি। মকবুল ফিদা হুসেন, আকবর পদমসী, অঞ্জলি ইলা মেনন থেকে শুরু করে দিল্লি-মুম্বাইয়ের বহু খ্যাতিমান শিল্পীর কাজ তাঁর সংগ্রহশালায় স্থান পেয়েছে।

বাদ যাননি কলকাতা ও বাংলার শিল্পীরাও। সোমনাথ হোর, গণেশ পাইন, যোগেন চৌধুরী, পরিতোষ সেন, পরেশ মাইতি, রবীন মণ্ডল—কত নাম আর বলব!

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার, তাঁর সংগ্রহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি মৌলিক শিল্পকর্মও রয়েছে!

সেই সন্ধ্যায় দেখা হলো টরন্টোর দক্ষিণ এশীয় শিল্পাঙ্গনের পরিচিত কিউরেটর মারিকা সার্দারের সঙ্গে। প্রদর্শনীর আয়োজক মুরলী দাওয়ানি শত ব্যস্ততার মধ্যেও আমাকে দেখে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন। শিল্পীদের কাজ, শিল্পসংগ্রাহকদের উৎসাহ আর পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় সন্ধ্যাটি বেশ প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

একই সন্ধ্যায় অবশ্য আরেকটি আমন্ত্রণ ছিল। মিসিসাগায় দক্ষিণ এশীয় চলচ্চিত্র উৎসবের সভাপতির পক্ষ থেকে উদ্বোধনী ককটেল অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম।

প্রিয় আবৃত্তিশিল্পী ও নাট্যজন আহমেদ হোসেনও বেশ প্রলুব্ধ করছিলেন। বলছিলেন, ‘আপনাকে গাড়ি নিতে হবে না। ঘণ্টাখানেকের পথ, আমি একাই যাচ্ছি। আপনাকে বাসা থেকে তুলে নেব।’

কোথায় যাব, তা নিয়ে কিছুটা দ্বিধায় ছিলাম। কিন্তু আর্ট গ্যালারির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসে সেই দ্বিধা পুরোপুরি কেটে গেল। চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনীতে যেতে না পারার কোনো আফসোসই আর রইল না। ভাবলাম, আগামী রোববার, ১১ অক্টোবর দুপুরে রুবাইয়াত হোসেনের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ দেখলেই যথেষ্ট।

তবে আসল মজার কথাটি না বললে এই গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

দীর্ঘদিন পর শিল্পীবন্ধু তাজউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বাস, সাবওয়ে আর স্ট্রিটকারে চড়ে ঘণ্টাখানেকের যে ভ্রমণ, সেটিই ছিল সন্ধ্যার অন্যতম সেরা প্রাপ্তি।

তাজউদ্দিনকে গাড়িতে নিয়ে প্রায়ই এদিক-ওদিক যাই। কিন্তু তখন আমার সমস্ত মনোযোগ থাকে গাড়ি চালানোর দিকে। গল্প হয় বটে, তবে মন খুলে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ থাকে কম।

এবার ছিল না স্টিয়ারিং ধরার দায়িত্ব, ছিল না যানজটের বিরক্তি কিংবা পার্কিং খোঁজার দুশ্চিন্তা। পাশাপাশি বসে দুই বন্ধু কত কথা বললাম! শিল্প, সাহিত্য, মানুষ, জীবন আর দুনিয়ার কত না প্রসঙ্গ!

কখন যে বাসের পথ শেষ হলো, কখন পাতালরেল পেরিয়ে স্ট্রিটকারে উঠে পড়লাম, টেরই পাইনি।

সেদিন বুঝলাম, একটি সুন্দর শিল্পপ্রদর্শনী যেমন মনকে সমৃদ্ধ করে, তেমনি পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে নির্ভার পথচলাও হয়ে উঠতে পারে অসাধারণ এক আনন্দের অভিজ্ঞতা।

তিন ভাইয়ের তিন শিল্পভাষা দেখতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত আবিষ্কার করলাম বন্ধুত্বের এক চিরচেনা, অথচ নতুন আনন্দ।

শিল্পের আনন্দের সঙ্গে বন্ধুত্বের আনন্দ মিলে টরন্টোর সেই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যাটি হয়ে রইল সত্যিই স্মরণীয়।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles