ক্রিস্টা পাইকের দন্ড কি আবারও কার্যকরের চেষ্টা করবে টেনেসি?

ক্রিস্টা পাইকের দন্ড কি আবারও কার্যকরের চেষ্টা করবে টেনেসি? - the Bengali Times
গত ৩০ সেপ্টেম্বর পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় তাঁর শরীরে পেন্টোবারবিটাল নামের প্রাণঘাতী ওষুধ দুই দফায় প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর নতুন আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্রিস্টা পাইককে আবারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা রাজ্যটিকে আইনের এক অনিশ্চিত ও প্রায় নজিরবিহীন পরিস্থিতির মুখে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। প্রথম প্রচেষ্টায় প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগের পরও একজন বন্দী বেঁচে যাওয়ার ঘটনায় দ্বিতীয়বার একই শাস্তি কার্যকরের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় তাঁর শরীরে পেন্টোবারবিটাল নামের প্রাণঘাতী ওষুধ দুই দফায় প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাতেও তাঁর মৃত্যু হয়নি। বরং তাঁর দুই বাহুতে ক্ষত, পোড়া দাগ ও ফোস্কা দেখা দেয় বলে জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবীরা। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কয়েক দিন অচেতন থাকার পর তিনি জ্ঞান ফিরে পান। ৭ অক্টোবর তাঁর আইনজীবীরা জানান, পাইক কথা বলতে পারছেন, যদিও তাঁর শারীরিক অবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে তখনও অনিশ্চয়তা ছিল। ১৯৯৫ সালে সহপাঠী কলিন স্লেমারকে হত্যা করার দায়ে পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তখন তাঁর বয়স ছিল ১৮ বছর। দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায় থাকা পাইকের ক্ষেত্রে গত সেপ্টেম্বরের ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

- Advertisement -

পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দ্বিতীয় প্রচেষ্টা নেওয়া হলে একাধিক সাংবিধানিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে টেনেসি প্রশাসন। এর মধ্যে রয়েছে একই অপরাধের জন্য দুবার শাস্তি দেওয়ার নিষেধাজ্ঞা এবং নিষ্ঠুর ও অস্বাভাবিক শাস্তির বিরুদ্ধে মার্কিন সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর সুরক্ষা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আইনে আগের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেই যে দ্বিতীয়বার চেষ্টা করা নিষিদ্ধ, এমন কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই। অতীতে কয়েকটি ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হলেও শিরায় ওষুধ দেওয়ার উপযুক্ত পথ স্থাপন করতে না পারায় তা বন্ধ করা হয়েছিল। পরে সেসব বন্দীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ ছিল।

পাইকের ঘটনা সেসব ঘটনার চেয়ে আলাদা। কারণ, তাঁর শরীরে প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগের চেষ্টা হয়েছিল দুই দফায়, অথচ তিনি বেঁচে যান। ফলে দ্বিতীয়বার একই প্রক্রিয়া চালানোর বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক ডেবোরা ডেনোসহ মৃত্যুদণ্ডবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পাইকের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা নিষ্ঠুর ও অস্বাভাবিক শাস্তির সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞার প্রশ্ন তুলতে পারে। অন্যদিকে, কিছু আইন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়া মানেই রাষ্ট্রের সেই সাজা কার্যকর করার আইনি অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাওয়া নয়। অর্থাৎ, দ্বিতীয়বার চেষ্টা করা হলে আদালতকে শুধু আগের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার বিষয়টি নয়, বন্দীর শারীরিক অবস্থা, প্রথম প্রচেষ্টায় তাঁর ওপর কী ঘটেছে এবং নতুন প্রচেষ্টা কতটা যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে এসব বিষয়ও বিবেচনা করতে হতে পারে।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর পাইক কয়েক দিন অচেতন ছিলেন। তাঁর আইনজীবীরা প্রথমে আশঙ্কা করেছিলেন, তিনি হয়তো মস্তিষ্কের গুরুতর ক্ষতির শিকার হয়েছেন। কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর তিনি কী ঘটেছে সে বিষয়ে সচেতন বলে জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবীরা। আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো অভিজ্ঞতা নিয়ে পাইক ক্ষুব্ধ ও বিভ্রান্ত। তাঁর শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক অবস্থার বিষয়টিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চিকিৎসকেরা তাঁর দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও স্নায়বিক ক্ষতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করেছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।

গত ৩০ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর তাঁকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর অবস্থার উন্নতি হলে তাঁকে আবার কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয় বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পাইকের আইনজীবীরা আগেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য, ওষুধ প্রয়োগের প্রক্রিয়ায় সমস্যা হওয়ায় পাইককে গুরুতর শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত ও প্রাসঙ্গিক চিকিৎসা নথি গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ঘটনার পর টেনেসির বিদায়ী রিপাবলিকান গভর্নর বিল লি রাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেন। একই সঙ্গে ৩০ সেপ্টেম্বরের ব্যর্থ প্রচেষ্টার কারণ অনুসন্ধানে বাইরের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পর্যালোচনার নির্দেশ দেন। এই পর্যালোচনায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া, ওষুধ প্রয়োগের পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তবে তদন্তের ফল প্রকাশের আগে ব্যর্থতার নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। পাইককে আবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে টেনেসি প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ফলে আপাতত তাঁর সাজা কার্যকরের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

পাইকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, প্রথম প্রচেষ্টায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া এত দূর এগোনোর পরও রাষ্ট্র কি একই শাস্তি কার্যকর করার জন্য দ্বিতীয়বার উদ্যোগ নিতে পারে? এর উত্তর নির্ভর করবে সাংবিধানিক ব্যাখ্যা, আগের মামলার নজির এবং পাইকের আইনজীবীদের উত্থাপিত যুক্তির ওপর। একদিকে রাষ্ট্রের পক্ষে যুক্তি হতে পারে, আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় এখনো বহাল রয়েছে। অন্যদিকে, পাইকের আইনজীবীরা যুক্তি দিতে পারেন, প্রথম প্রচেষ্টায় তাঁর শরীরে প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগের পর বেঁচে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এবং শারীরিক ক্ষতির কারণে দ্বিতীয়বার চেষ্টা করা অসাংবিধানিক শাস্তির পর্যায়ে পড়তে পারে।

এ ধরনের বিরল পরিস্থিতিতে আদালতের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি ও সীমা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত হয়নি। সব মিলিয়ে, ক্রিস্টা পাইকের ঘটনা শুধু একটি ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা নয়; এটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সাংবিধানিক সীমা, রাষ্ট্রের ক্ষমতা এবং বন্দীর সুরক্ষা নিয়ে নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে। টেনেসি প্রশাসন দ্বিতীয়বার চেষ্টা করবে কি না, আর করলে আদালত সেই উদ্যোগকে কীভাবে দেখবে এখন সেই প্রশ্নের উত্তরই অপেক্ষায় রয়েছে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles