
টরন্টোর মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যানজট কতটা প্রভাব ফেলছে, তার প্রতিফলন পাওয়া গেছে নতুন এক জনমত জরিপে। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় চারজনের একজন বলেছেন, শহরের জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার পেছনে যানজটই সবচেয়ে বড় সমস্যা। তবে আবাসনের ক্রমবর্ধমান ব্যয়, জননিরাপত্তা, সম্পত্তি কর ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ভোটারদের উদ্বেগের তালিকায় রয়েছে।
কানাডার টরন্টোতে আসন্ন পৌর নির্বাচন সামনে রেখে সিপি২৪ ও সিটিভি নিউজ টরন্টোর জন্য এই সমীক্ষা পরিচালনা করেছে ন্যানোস রিসার্চ। ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ৭৫৫ জন টরন্টোবাসীর মতামত নেওয়া হয়। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, ২৬ শতাংশ উত্তরদাতা যানজটকে তাঁদের জীবনযাত্রার মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলা সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে, ১৮ শতাংশ উত্তরদাতা আবাসন ব্যয়, ১৬ শতাংশ জননিরাপত্তা ও অপরাধ, ১২ শতাংশ সম্পত্তি কর এবং ৯ শতাংশ মুদিপণ্যের দামকে প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফলাফল বলছে, টরন্টোর ভোটারদের কাছে শহরের সমস্যা শুধু যাতায়াতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দৈনন্দিন ব্যয় সামলানো এবং নিরাপদ পরিবেশে বসবাসের বিষয়টিও তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
টরন্টোর সড়কে দীর্ঘ সময় আটকে থাকা অনেক বাসিন্দার দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা। কর্মস্থলে যাতায়াত, সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়া কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে শহরের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার ক্ষেত্রে যানজট সময় ও অর্থ দুইয়ের ওপরই চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ন্যানোস রিসার্চের প্রধান ডেটা সায়েন্টিস্ট নিক ন্যানোস এক বিবৃতিতে বলেন, ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগের মধ্যে মেয়র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও শহরের বাসিন্দারা জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে যানজটকে চিহ্নিত করেছেন।
সমীক্ষায় বিভিন্ন বয়স ও লিঙ্গের উত্তরদাতাদের মধ্যেই যানজটের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে তরুণ ভোটারদের উদ্বেগের ক্ষেত্রে আবাসন ব্যয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে। জেন-জি ও তরুণ মিলেনিয়ালদের মধ্যে প্রায় ৩১ শতাংশ আবাসন ব্যয়কে জীবনযাত্রার মানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই ফলাফল থেকে বোঝা যায়, শহরের সমস্যাগুলো সব বয়সের মানুষের কাছে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়। দীর্ঘ যাতায়াতের ভোগান্তি অনেকের কাছে প্রধান সমস্যা হলেও তরুণদের জন্য বাড়িভাড়া ও আবাসনের সামর্থ্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
সমীক্ষায় শুধু বর্তমান সমস্যার চিত্রই উঠে আসেনি; পরবর্তী মেয়রের কাছে বাসিন্দাদের প্রত্যাশার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে। ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে আবাসন ব্যয় ও সম্পত্তি করকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অনেকে। জরিপে অংশ নেওয়া ৩১ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, পরবর্তী মেয়রের প্রধান অগ্রাধিকারের মধ্যে আবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। অন্যদিকে, ২৭ শতাংশ উত্তরদাতা সম্পত্তি করকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।
টরন্টোর বাসিন্দাদের জন্য আবাসনের খরচ ও সম্পত্তি করের প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। ভাড়াটিয়াদের কাছে ভাড়া এবং আবাসনের সহজলভ্যতা গুরুত্বপূর্ণ, আর বাড়ির মালিকদের জন্য সম্পত্তি কর সরাসরি পারিবারিক বাজেটে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে পরবর্তী মেয়রকে একাধিক আর্থিক চাপের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে। যানজট জরিপে সবচেয়ে বেশি উল্লেখিত সমস্যা হলেও ভোটারদের প্রত্যাশায় আবাসন ব্যয় ও সম্পত্তি করের গুরুত্বও স্পষ্ট। নির্বাচিত মেয়রের সামনে তাই পরিবহনব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি শহরে বসবাসের ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ মোকাবিলার প্রশ্নও থাকবে।
টরন্টোর মেয়র নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন মোড় নিয়েছে। ক্রিস আলেক্সান্ডার প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর পর বর্তমান মেয়র অলিভিয়া চাউ এবং সিটি কাউন্সিলর ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ডের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ন্যানোস রিসার্চের আরেকটি জরিপে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা ভোটারদের মধ্যে চাউ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যাডফোর্ডের চেয়ে ১০ পয়েন্ট এগিয়ে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ২২ শতাংশ ভোটার তখনো কাকে ভোট দেবেন, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেননি। অর্থাৎ জরিপে চাউয়ের এগিয়ে থাকার চিত্র পাওয়া গেলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটারের সিদ্ধান্ত তখনো চূড়ান্ত হয়নি। নির্বাচনের আগে তাঁদের পছন্দ বদলালে প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্রও পরিবর্তিত হতে পারে। জরিপের ফলাফলকে তাই ভোটের চূড়ান্ত ফল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
টরন্টোর পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ২৬ অক্টোবর। ভোটারদের সামনে এখন শহরের যানজট, আবাসন ব্যয়, জননিরাপত্তা ও সম্পত্তি করের মতো বিষয়গুলো নিয়ে প্রার্থীদের অবস্থান বিবেচনা করার সুযোগ রয়েছে। ন্যানোসের সমীক্ষায় উঠে আসা তথ্য নির্বাচনের আগে বাসিন্দাদের অগ্রাধিকারের একটি ধারণা দেয়। তবে জরিপে কোনো একটি সমস্যা বেশি গুরুত্ব পাওয়ার অর্থ এই নয় যে অন্য বিষয়গুলো ভোটারদের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সিদ্ধান্ত নির্ভর করতে পারে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি, আগের কাজের মূল্যায়ন এবং শহরের সমস্যা সমাধানে তাঁদের পরিকল্পনার ওপর। যানজটকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করলেও টরন্টোর অনেক বাসিন্দার কাছে সাশ্রয়ী আবাসন ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য জীবনযাত্রার ব্যয়ও নির্বাচনী সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।

