
টরন্টোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগমস্থল সানকোফা স্কয়ার (সাবেক ইয়ং-ডানডাস স্কয়ার) আবারও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। মেয়র পদপ্রার্থী ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, নির্বাচিত হলে তিনি শুধু স্কয়ারটির নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাই নিশ্চিত করবেন না, বরং এর নাম পরিবর্তন করে ‘টরন্টো স্কয়ার’ রাখার উদ্যোগও নেবেন। ব্র্যাডফোর্ডের দাবি, একসময় এই স্কয়ার ছিল টরন্টোর প্রাণকেন্দ্র। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা, শিল্পী ও তরুণদের মিলনস্থল হিসেবে এর আলাদা পরিচিতি ছিল। অনেকেই একে ‘কানাডার টাইমস স্কয়ার’ বলেও অভিহিত করতেন। এখানে সারা বছর নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, উৎসব, কনসার্ট ও জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হতো।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলে গেছে বলে অভিযোগ তাঁর। ব্র্যাডফোর্ডের ভাষায়, বর্তমানে স্কয়ারটির পরিবেশ অনেকটাই “ওয়েস্টল্যান্ডের” মতো হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, জায়গাটি এখন অপরিচ্ছন্ন, বিশৃঙ্খল এবং সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ নয়। দিনের বেলাতেই প্রকাশ্যে মাদক সেবনের মতো ঘটনা ঘটছে। ফলে পর্যটকরা এই এলাকা এড়িয়ে চলছেন। পরিবারগুলো শিশুদের নিয়ে সেখানে স্বস্তিতে সময় কাটাতে পারছে না। অনেক অভিভাবক দ্রুত এলাকা পার হয়ে যান কিংবা পুরো জায়গাটিই এড়িয়ে চলেন।
মেয়র নির্বাচিত হলে সানকোফা স্কয়ারকে আগের জনপ্রিয় অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড। তার পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে : স্কয়ারে একটি স্থায়ী পুলিশ সাব-স্টেশন স্থাপন করা।, পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট সার্ভিস স্ট্যান্ডার্ড প্রকাশ করা। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা। বছরজুড়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, উৎসব ও পারিবারিক আয়োজনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি বাড়ানো। এবং পুরো এলাকাকে পরিবারবান্ধব ও পর্যটকবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা। তাঁর মতে, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও প্রাণবন্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারলে স্কয়ারটি আবারও টরন্টোর অন্যতম আকর্ষণীয় জনপরিসরে পরিণত হবে।
বর্তমান সানকোফা স্কয়ার আগে পরিচিত ছিল ইয়ং-ডানডাস স্কয়ার নামে। ২০২৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এর নাম পরিবর্তন করা হয়। এই পরিবর্তনের পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক। প্রায় ১৪ হাজার মানুষের স্বাক্ষরসংবলিত একটি পিটিশন টরন্টো সিটি কাউন্সিলে জমা দেওয়া হয়। আবেদনকারীদের অভিযোগ ছিল, ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ হেনরি (হ্যারি) ডানডাস ট্রান্স-আটলান্টিক দাসপ্রথা বিলুপ্তির প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। তাই তাঁর নামে থাকা গুরুত্বপূর্ণ জনপরিসরের নাম পরিবর্তনের দাবি ওঠে। একই সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে ডানডাস সাবওয়ে স্টেশনের নাম পরিবর্তন করে টিএমইউ স্টেশন রাখা হয়। তবে ডানডাস স্ট্রিটের নাম অপরিবর্তিত রাখা হয়।
নতুন নাম হিসেবে ‘সানকোফা’ নির্বাচন করা হয়, যার উৎপত্তি পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানার আকান সংস্কৃতি থেকে। শব্দটির মূল অর্থ অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়া। এটি আফ্রিকান ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে সম্মান জানানোর প্রতীক হিসেবেই বেছে নেওয়া হয়েছিল।
শুরুতে ইয়ং-ডানডাস স্কয়ারের নাম পরিবর্তনে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩ লাখ কানাডিয়ান ডলার। তবে পরে প্রশাসন জানায়, বিভিন্ন সাইনেজ, ডিজিটাল অবকাঠামো ও অন্যান্য পরিবর্তনের কারণে ব্যয় বেড়ে প্রায় ৬ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। এদিকে ২০২৪ সালে পরিচালিত একটি জনমত জরিপে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের বড় একটি অংশ নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। ফলে শুরু থেকেই বিষয়টি জনমতের দিক থেকে বিভক্ত ছিল।
ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ডের নতুন প্রস্তাব শুধু একটি জনপরিসরের নাম পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি টরন্টোর নগর ব্যবস্থাপনা, জননিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে তিনি যুক্তি দিচ্ছেন, নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও প্রাণবন্ত শহর গড়ে তুলতে প্রতীকী পরিবর্তনের পাশাপাশি বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, মাত্র এক বছর আগে পরিবর্তিত একটি নাম আবার বদলানোর উদ্যোগ অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি করতে পারে এবং অতিরিক্ত সরকারি ব্যয়ের প্রশ্নও সামনে আনতে পারে।
সানকোফা স্কয়ারের ভবিষ্যৎ এখন শুধু একটি জনপরিসরের উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়, বরং টরন্টোর নাগরিক পরিচয়, ইতিহাসের মূল্যায়ন এবং নগর পরিচালনার দর্শন নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। মেয়র নির্বাচনের প্রচারণা যত এগোবে, এই বিতর্কও তত বেশি গুরুত্ব পাবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

