
আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে অন্টারিওর স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে নতুন মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করছে প্রাদেশিক সরকার। এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত ফলাফলের একটি নির্দিষ্ট অংশ শুধু শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি ও পাঠদানে সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর নির্ভর করবে। একই সঙ্গে ক্রীড়া টুর্নামেন্ট বা অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় কারণে সন্তানদের স্কুলের বাইরে না রাখার জন্য বাবা-মায়েদের প্রতি সরাসরি আহ্বান জানিয়েছেন অন্টারিওর শিক্ষামন্ত্রী পল ক্যালান্দ্রা।
শিক্ষামন্ত্রীর ভাষ্য, শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বা অন্যান্য সহশিক্ষামূলক কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলো যেন কখনোই নিয়মিত শিক্ষার বিকল্প না হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার কারণে বারবার ক্লাস মিস করার প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের শেখার ধারাবাহিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে কার্যকর হওয়া নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, গ্রেডভেদে শিক্ষার্থীদের চূড়ান্ত নম্বরের একটি অংশ উপস্থিতি ও শ্রেণিকক্ষে অংশগ্রহণের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। গ্রেড ৯ ও ১০-এর শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নম্বরের ১৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকবে উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের জন্য। গ্রেড ১১ ও ১২-এর শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই হার হবে ১০ শতাংশ। এর অর্থ হলো, শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই হবে না; নিয়মিত স্কুলে উপস্থিত থাকা এবং পাঠদানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়াও শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।
নতুন নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষার্থী যদি যৌক্তিক কারণ ছাড়া পরপর দুই দিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকে, তাহলে উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের জন্য নির্ধারিত ১০ বা ১৫ শতাংশ নম্বরের পুরোটা সে পাবে না। তবে সরকার স্পষ্ট করেছে, সব ধরনের অনুপস্থিতিকে একইভাবে দেখা হবে না। অসুস্থতা, সরকারি ছুটি বা অন্যান্য গ্রহণযোগ্য কারণ থাকলে তা যৌক্তিক অনুপস্থিতি হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থাৎ প্রকৃত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা শাস্তির মুখে পড়বে না।
অন্টারিওতে বিভিন্ন সময়ে আয়োজিত হকি টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার জন্য অনেক পরিবার সন্তানদের স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে থাকে। এ বিষয়ে সরকার জানিয়েছে, শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া হকি টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের যৌক্তিক ছুটি নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষামন্ত্রী পল ক্যালান্দ্রা স্পষ্ট করে বলেছেন, এই ধরনের ছাড় যেন নিয়মে পরিণত না হয়। তাঁর মতে, বিশেষ পরিস্থিতিতে নমনীয়তা দেখানো হলেও নিয়মিতভাবে খেলাধুলার কারণে ক্লাস ফাঁকি দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, বর্তমানে কানাডার বিভিন্ন অঞ্চলের তুলনায় অন্টারিওর সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার উদ্বেগজনকভাবে কম। এই পরিস্থিতি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, “অন্টারিওর স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার দেশের অন্যতম নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য আমাদের কিছু না কিছু করতেই হবে।” তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে আরও বলেন, “আমার পরামর্শ হবে, সন্তানদের স্কুলে রাখুন। তাদের জীবনে শিক্ষাই হওয়া উচিত প্রথম অগ্রাধিকার।”
সরকার জানিয়েছে, নতুন উপস্থিতি নীতির কার্যকারিতা আগামী শিক্ষাবর্ষজুড়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না পৌঁছালে ভবিষ্যতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকার আগামী বছর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং প্রয়োজন হলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত স্কুলমুখী করতে অতিরিক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
অন্টারিও সরকারের এই উদ্যোগ মূলত কোভিড-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেড়ে যাওয়া অনিয়মিত উপস্থিতি কমানোর প্রচেষ্টার অংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক শিক্ষার্থী ব্যক্তিগত, পারিবারিক কিংবা সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমের কারণে নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকছে না। এর ফলে শুধু একাডেমিক ফলাফল নয়, শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শেখা, দলগত কাজ, সামাজিক যোগাযোগ এবং শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত সম্পৃক্ততাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে সরকার একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে শিক্ষা কেবল পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নিয়মিত উপস্থিতি, শ্রেণিকক্ষের অংশগ্রহণ এবং শেখার ধারাবাহিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ক্রীড়া ও অন্যান্য কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ নিরুৎসাহিত না করে সেগুলোর সঙ্গে শিক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উপস্থিতির সঙ্গে নম্বর যুক্ত করলে অনেক পরিবার সন্তানদের অপ্রয়োজনীয় কারণে স্কুল থেকে ছুটি দেওয়ার আগে আরও সতর্ক হবে। তবে অসুস্থতা বা প্রকৃত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে নমনীয়তা বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ, যাতে কোনো শিক্ষার্থী অন্যায়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

