“ধিক”

“ধিক” - the Bengali Times
মম কাজী

ছ‍্যা ছ‍্যা ছ‍্যা ছ‍্যা – লজ্জা লজ্জা লজ্জা- আজ কি ভীষণ লজ্জিত আমি। অসম্ভব রকম লজ্জিত এবং রাগান্বিত। রাগে নিজের হাত পা কামড়াতে ইচ্ছা করছে। মনে হচ্ছে কামড় দিয়ে দু’টুকরো করে ফেলি নিজের জিহ্বা। বিজ্ঞ সুশীল সমাজ এবং আমাদের উচ্চশ্রেণীর বিজ্ঞ বাংলাদেশি কেনেডিয়ান মানুষদের কাছে আমার কথাগুলো যতই সালফিউরিক অ্যাসিডের মতো গায়ের উপরে পোড়া দাগ কেটে যাক এবং আপনারা যতই আমাকে এর কারনে একঘরে করে দিতে চান, তবু আমি আমার কথা বলব এবং আপনাদের অনুভূতির এতটুকু তোয়াক্কা না করে লজ্জার এই সত‍্যি কথাটা লিখে যাব।

আমার এই এতদিনের কেনেডিয় জীবনে বহু বহু বাংলাদেশী কমিউনিটির অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার সুযোগ হয়েছে। মাইক্রোফোন হাতে নেওয়া এবং মাইক্রোফোন হাতে অন‍্য মানুষের কথা শোনা সবই হয়েছে। এই যে এতো হাজার হাজার অনুষ্ঠান, সভা, সমিতি, বইমেলা, পিকনিক,মেলা, কর্মশালাগুলো যারা আয়োজন করেন, তাদের নানাবিধ ধর্ম, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও কিছু ব্যাপারে এরা সবাই এক- প্রথমত তেনাদের নিজেদের ভাষায় ইনারা বাঙালি কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশী।

- Advertisement -

মানে বাংলাদেশের সাথে একটি নিবিড় সম্পর্ক এরা দাবী করেন। সকলেই বিরাটাকারে দেশপ্রেমিক বিশেষ করে যাদের একটুসখানি লেখালেখির হাত আছে তাদের তো কথাই নেই। দেশপ্রেম – যা বিশেষ করে দেশপ্রেম তা মনোযোগ না দেওয়া জ্বালরত দুধের মতোই উপচে পড়ছে।

আর একটি ব্যাপার সকলেই উচ্চশিক্ষিত, বিরাট বড় বড় মানুষ এবং এটা তারা ইনিয়ে বিনিয়ে ফাঁক ফোকর দিতে যুত করে আস্তে বলে ফেলেন কিংবা বুঝিয়ে দেন। আর যদি বান্দা বাংলাদেশের কোনও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র হয়ে থাকেন তাহলে তো কথাই নেই। বেশিরভাগের গরমে মাটিতে পা পড়ে না।

তো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অতি শিক্ষিত প্রাক্তন ছাত্রটি যখন কানাডায় এসে সভা সমিতি করে উচ্চস্বরে দাবি করেন যে সে একজন মহান দেশপ্রেমিক, দেশ নিয়ে তাঁর রিসার্চের অন্ত নেই তখন আমার মতো অশিক্ষিত মূর্খ গরীব ছোট মানুষ মনে মনে উচ্চস্বরে হেসে ওঠে। যেই দেশের সাধারন মানুষ রিকশা চালানোর মতো কঠোর পরিশ্রম করে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চালায় যেন সেইসব ছাত্রটা পাশ করে দেশে থেকে দেশটার উন্নতি করবে, আর এই অতি শিক্ষিত ছাত্ররা দেশের সেই আশার মুখে চুন কালি দিয়ে সেই দেশকে ত‍্যাগ করে দিব‍্যি বিদেশে পাড়ি জমিয়েই থেমে থাকে না আবার দেশপ্রেমের নাকি কান্না কাঁদে।

আরও এক কাঠি বেশি সরেস হচ্ছেন তারা- যারা আওয়ামী, বি এন পি কিংবা জামাতের মতো দলের মতাদর্শে বিশ্বাসী এবং সেই সরকারের আমলেই দেশ ত‍্যাগ করেছেন কিংবা সেই সরকারের আমলে বিদেশে অবস্থানরত ছিলেন। হা হা হা হা হা হা – যখন তারা কানাডার মাটিতে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন- বলেন আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ অথচ মুক্তিযুদ্ধের ফলে যেই অভাগা দেশটির জন্ম হয়েছে সেখানে নিজে থেকে কোনও কাজ না করে বিদেশে এসে বিশাল দেশপ্রেমের বুলি ছাড়েন।

আমি বি এন পি এবং আওয়ামী দুই আমলেই কানাডায় অবস্থান করেছি এবং দুই দলের সমর্থকদেরই অপরপক্ষকে ধুয়ে দিতে দেখেছি কিন্তু একজনও নিজের সমর্থনের সরকারের আমলে দেশে ফেরত যাননি। কিন্তু হাসিনা এবং খালেদা এবং আরেকটু দূরে গেলে আমাদের তসলিমা নাসরিন আপা- এরা সকলেই কিন্তু নিজের দেশে অবস্থান করে দেশের কাজ করতে চেয়েছেন। হায়রে একটা অভাগা দেশ- হায়রে দেশ মা- কত শত বার বিক্রি হতে হয়েছে।

এবার আসি মূল লজ্জার কথায়। ইনিয়ে বিনিয়ে এতক্ষন কথা বলালাম যেন অধৈর্য পাঠক মেজাজ খারাপ করে লেখাটি ত‍্যাগ করেন কারন এখন যা বলব তা ধারন করার ক্ষমতা সবার নেই। এই যে গরীব মা বাংলাদেশকে এক প্রকার লাথি দিয়েই সুন্দর সহজ জীবনের খোঁজে আমরা পাড়ি জমিয়েছি নতুন ধনী মা কানাডায়। মুখে যত বড় কথাই বলি না কেন কিংবা যত বড় পজিশনে চাকরী করি কিংবা ব্যাবসা করে বিশাল বাড়ি গাড়ি করে ফেলি না কেন আমরা আমাদের এই নতুন মায়ের সন্মান কতখানি বজায় রাখতে পারছি? কানাডা তো এমনকি বাংলাদেশের চেয়েও আমাদের জন‍্য বেশি করছে- অবশ‍্যই করছে কারন আমরা জীবন যাপনের জন্য কানাডাকেই বেছে নিয়েছি। আমরা এখানে জন্মগ্রহণও করিনি। কানাডার কি ঠেকা পড়েছে আমাদের মতো অকৃতজ্ঞ জাতিকে ঠাঁই দেওয়ার?

প্রতিটা বাঙালি অনুষ্ঠানে আমরা পুরোদমে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করি কিন্তু যখনই কানাডার জাতীয় সংগীতটির সময় আসে তখনই শুরু হয়ে যায় নানাবিধ টালবাহানা। সেই যে তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানও মাত্র ছয় লাইনের সবচেয়ে সহজ জাতীয় সংগীতটি গাইতে পারেন না। এটার থেকে হাস‍্যকর আর কি হতে পারে যে কানাডার বুকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে আমার সোনার বাংলা গাওয়া মানুষগুলো মন্চে দাঁড়িয়ে কানাডার জাতীয় সংগীত গাওয়ার জন‍্য তাঁদের স্কুলে পড়ুয়া দশ বছরের বাবুটার পায়ে ধরেন। কি সন্মানটা রাখছেন আপনারা আমাদের এই আগামী প্রজন্মের কাছে যারা বাবা মায়ের কথা শুনে চোখ নাকমুখ শক্ত করে, কাঁধে একটি অবজ্ঞার ঝাঁকুনি দিয়ে কোনওরকমে কানাডার জাতীয় সংগীতটি গেয়ে আপনাদের উদ্ধার করেন।

আমাদের কমিউনিটির এই যে হাজার হাজার অনুষ্ঠানে নতুন প্রজন্মের কয়টা বাচ্চা দেখা যায় বলেন। আপনারা অভিভাবক, আপনারা জানেন যে একটা বাচ্চাকে এই ধরনের একটা অনুষ্ঠানে উপস্থিত করার পেছেনে একজন বাবা কিংবা মায়ের কতখানি পরিশ্রম করতে হয়। বিশেষ করে বাচ্চাটির জন্ম যদি কানাডায় হয়ে থাকে তাহলে তো কথাই নেই।

আপনার কি মনে হয় না যে বাংলাদেশে জন্মেছেন বলে বাংলাদেশের প্রতি আপনার যে মমতা আছে কানাডায় জন্মানো একটি শিশুর মাঝে তার দেশ কানাডার জন‍্য সেই একই মমতা কাজ করে? আপনার কি মনে হয়না যখন আপনি কানাডার জাতীয় সংগীতটি গাইতে না পারেন, কিংবা কাগজ দেখে গান, কিংবা ভুলভাল গান তখন তাঁর দেশপ্রেমে আঘাত লাগে? তার কি মনে হয় না – এই যে খয়রী রং এর ছোট ছোট ভোটকা সাউথ এশিয়ান মানুষগুলো নিজের দেশকে তো নষ্ট করেছেই তার উপরে কানাডার সব সুযোগ সুবিধা নিচ্ছে কিন্তু সামান‍্য জাতীয় সংগীতটা গাইতে পারছে না। কি লজ্জা কি লজ্জা।

এই যে এতগুলো সংগঠন, এত দেশপ্রেম, আর কয়জন তাদের নিজের সন্তানদের ইনভল্ভ করতে পারছেন। সেই একই বয়সের কতগুলো মানুষ খামোখা জটলা পাকাচ্ছেন আর আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগে যত্রতত্র অনুষ্ঠান আয়োজন করছেন। যদি দেশপ্রেম থাকে তা নিজের বাসা থেকে শুরু করুন, নিজের সন্তানকে আগে সামনে নিয়ে আসুন তার আগে নিজেকে এমনভাবে তৈরি করুন যেন সন্তান খুশি খুশি আপনার সাথে আসে।

গতরাতে আমি চারটি ভিন্ন ভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম- সবই কমিউনিটি অনুষ্ঠান এবং সবগুলোরই প্রথমভাগ দেখেছি। প্রশ্ন আসতে পারে একই রাতে চারটি আনুষ্ঠান কিভাবে সম্ভব। সম্ভব হয়েছে তখনই যখন প্রতিটি অনুষ্ঠান অন্তত দেড় ঘন্টা লেট করে শুরু হয়েছে এবং আমি সবগুলোতেই তাদের দেওয়া সময় অনুযায়ী গেছি। যাই হোক জাতীয় সংগীতের বেলায় প্রতিটা অনুষ্ঠানের একই অবস্থা। প্রতিটা অনুষ্ঠানের শুরুটা দেখার পরেই মেজাজ সপ্তম আসমানে চড়ে গেছে।

কোনও অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়েছে আর কানাডারটা ইউটিউবে বাজানো হয়েছে। কোনওটাতে বড়রা বাংলাদেশেরটা গেয়েছেন আর একটি ভীষণ রাগান্বিত ছোট্ট বন্ধু কানাডারটা গেয়ে দিয়েছে। কোনওটাতে একদল কোকিলকন্ঠী গাইকা আরও কিছু বড়দের নিয়ে বিশাল আবেগ নিয়ে বাংলাদেশেরটা গাওয়ার পরে মন্চ থেকেই উপস্থিত স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাদের ডাকতে শুরু করেছেন, যারা তো সামনে আসেই নি, এবং পরে ইউটিউবে বাজিয়ে সাথে সাথে লিপসিং করেছেন। সেই অনুষ্ঠানে কমিউনিটির সকল বড় বড় শিক্ষিত মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বেশিরভাগেরই কানাডায় অবস্থানকাল বিশ বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। তবু এই লজ্জায় তাদের মাথা কাটা যায়নি। একটু পরেই আবার সেই দেশপ্রেমের ফাঁকা বুলি আওড়াতে শুরু করেছেন। এরাই নাকি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বাঁচাতে শতকন্ঠে গানটি গাওয়ার আয়োজন করেছিলেন তাও আবার এই শহরে। আর সহ‍্য হয়নি, নিজেকে আর টর্চার না করতে পেরে মানে মানে কেটে পড়েছি।

প্লিজ একটা অনুরোধ সকল বাংলাদেশি এডাল্টদের কাছে। প্লিজ কানাডার জাতীয় সংগীতটা খুবই সহজ, সহজ সুর সহজ ভাষা। শিখে ফেলুন, এতটুকু কৃতজ্ঞতাবোধ তো সকলেরই থাকা উচিত তাই নয় কি।

এই ব্যাপারে একমাত্র ব‍্যাতিক্রম পেয়েছি দুইজন বাংলা অনুষ্ঠান করা মানুষকে চমন আরা এবং আইরিন আলম। তাদের প্রতি স‍্যালুট। তারা কোনও কিছু না দেখে মুখস্থভাবে এমনকি হারমোনিয়ামে বাজিয়েও কানাডার জাতীয় সঙ্গীত গাইতে দেখেছি। আরো কেউ থাকলে আওয়াজ দিয়েন- স‍্যালুট দিব।

বি.দ্র. মজার বিষয় হলো বেশিরভাগ বাংলাদেশী মানুষ পড়ে না। যদি কেউ দুর্ভাগ্যবশত আমার এই লেখা পড়েও ফেলেন এবং আপনার মনে আমার প্রতি ক্ষোভের জন্ম নেয় তবে পাগলের প্রলাপ ভেবে উড়িয়ে দিতে পারেন। আমি একজন মূর্খ ছাড়া আর কিছুই নই। ধন‍্যবাদ।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles