
প্রায় এক দশক ধরে আলোচিত একটি আন্তঃদেশীয় কোকেন পাচার মামলায় অবশেষে গুরুত্বপূর্ণ মোড় এসেছে। দীর্ঘ সাত বছর ধরে কারাগারের বাইরে থেকে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া ৩৭ বছর বয়সী আলি লালজির স্বাধীনভাবে থাকার অধ্যায়ের ইতি ঘটেছে। অন্টারিওর কোর্ট অব আপিলের সম্ভাব্য রায়ের আগেই তিনি স্বেচ্ছায় আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন। খুব শিগগিরই এই বহুল আলোচিত মামলায় তার সাজা ঘোষণা করা হবে।
এই মামলাটি প্রথম আলোচনায় আসে প্রায় দশ বছর আগে, যখন অস্ট্রেলিয়ায় বিপুল পরিমাণ কোকেন পাচারের একটি সুপরিকল্পিত আন্তর্জাতিক চক্রের সন্ধান পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তদন্তে উঠে আসে, তরুণদের আকৃষ্ট করতে পরিচিত মিডিয়া প্রতিষ্ঠান ভাইস-এর সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তি এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, মাদক পাচারের জন্য ইন্টার্ন, মডেল এবং সংগীতশিল্পীদের ব্যবহার করা হয়েছিল, যাতে সন্দেহ এড়িয়ে সহজেই আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করা যায়।
তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচজনকে ‘কুরিয়ার’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে চারজন ছিলেন কানাডার নাগরিক এবং একজন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। প্রত্যেকের লাগেজে বিশেষভাবে লুকিয়ে বিপুল পরিমাণ কোকেন বহন করে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পনা সফল হওয়ার আগেই সিডনি বিমানবন্দরে অস্ট্রেলিয়ার সীমান্ত কর্তৃপক্ষ অভিযান চালিয়ে প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ ডলার মূল্যের কোকেন জব্দ করে। একই সঙ্গে ওই পাঁচজনকেও গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে তারা অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন কারাগারে কয়েক বছর কারাভোগ করেন।
মামলার অন্যতম অভিযুক্ত হলেও আলি লালজি দীর্ঘ সময় কারাগারের বাইরে থাকতে সক্ষম হন। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ আইনি কৌশল, আপিল প্রক্রিয়া এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ও লজিস্টিক বিলম্বের কারণে তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায় কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে।
তবে সম্প্রতি অন্টারিওর কোর্ট অব আপিলের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠার পর লালজি বুঝতে পারেন যে, তার পক্ষে আর আইনি সুযোগ খুব বেশি অবশিষ্ট নেই। সেই কারণেই তিনি রায় ঘোষণার আগেই আদালতে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক সাজা ঘোষণা করা হতে পারে।
লালজির পক্ষে আইনজীবী রবীন পিল্লাই এ বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি জানিয়েছেন, মক্কেলের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কোনো মন্তব্য করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত তার দপ্তর থেকেও আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
আলি লালজি একসময় ভাইসের বিজ্ঞাপন বিভাগে কর্মরত ছিলেন। সেখানেই তার পরিচয় হয় প্রতিষ্ঠানটির কানাডাভিত্তিক সংগীত সম্পাদক ইয়ারোস্লাভ পাস্টুকভ-এর সঙ্গে, যিনি স্লাভা পাস্টুক নামেও পরিচিত। তদন্তে উঠে আসে, এই বন্ধুত্বের সূত্র ধরেই একটি আন্তর্জাতিক মাদক পাচার নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, তরুণ কর্মী, মডেল ও শিল্পীদের বিদেশ ভ্রমণের সুযোগ দেখিয়ে তাদের মাধ্যমে মাদক পরিবহনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছিল। পাস্টুকভও এই মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন এবং অন্টারিওর একটি কারাগারে কয়েক বছর সাজা ভোগ করেন। অন্যদিকে, মাদক বহনকারী পাঁচজনের সবাই অস্ট্রেলিয়ায় বিচারের মুখোমুখি হয়ে কারাদণ্ড ভোগ করেন।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মতে, এই মামলাটি আন্তর্জাতিক মাদক পাচার দমনে বহুজাতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত তদন্তের ফলেই চক্রটির কার্যক্রম উন্মোচিত হয় এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়। সামাজিক যোগাযোগ, জনপ্রিয় সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অপরাধচক্রগুলো যেভাবে তরুণদের ব্যবহার করার চেষ্টা করে, এই মামলাটি তার একটি বড় উদাহরণ। একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে, দীর্ঘ সময় আইনি প্রক্রিয়া চললেও শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা সম্ভব।
এখন নজর অন্টারিওর আদালতের দিকে। আদালতের চূড়ান্ত রায়ে আলি লালজির শাস্তির মেয়াদ নির্ধারিত হলে প্রায় এক দশক ধরে আলোচিত এই আন্তর্জাতিক কোকেন পাচার মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটবে।

