
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবার সরাসরি অনুভূত হতে শুরু করেছে উত্তর আমেরিকার অর্থনীতিতেও। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা কানাডার অভ্যন্তরীণ বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করেছে। এপ্রিল মাসে দেশটির মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮ শতাংশে, যা ২০২৪ সালের পর সর্বোচ্চ বলে জানিয়েছে স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা।
মঙ্গলবার প্রকাশিত সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে এই বৃদ্ধি অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও রয়টার্সের জরিপে অংশ নেওয়া বিশ্লেষকরা এপ্রিলেই মূল্যস্ফীতি ৩ শতাংশে পৌঁছাবে বলে ধারণা করেছিলেন, বাস্তব চিত্র কিছুটা কম হলেও পরিস্থিতিকে মোটেও স্বস্তিদায়ক মনে করছেন না তারা।
বর্তমান পরিসংখ্যানে ইরান যুদ্ধের পুরো প্রভাব এখনও প্রতিফলিত হয়নি। বরং সামনের মাসগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কারণ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য বলছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এপ্রিল মাসে গ্যাসোলিনের দাম বেড়েছে ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ। মূলত মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কানাডার পেট্রোল পাম্পগুলোতে। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে।
তবে আপাতত কিছুটা স্বস্তি রয়েছে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে। এপ্রিল মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে, যা মার্চের তুলনায় কম। মুরগির মাংস, তাজা সবজি, কফি ও চায়ের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তুলনামূলক ধীরগতিতে বাড়ায় সামগ্রিক খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে ছিল।
তবুও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এই স্বস্তি হয়তো খুব বেশি দিন থাকবে না। বিএমও’র কানাডিয়ান রেটস অ্যান্ড ম্যাক্রো স্ট্র্যাটেজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেঞ্জামিন রাইটজ মনে করেন, ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বৈশ্বিক সার সরবরাহেও বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। আর তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মুদি দোকানের পণ্যের দামেও পড়বে। তার ভাষায়, “বর্তমানে খাদ্যপণ্যের বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও যুদ্ধ দীর্ঘ হলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। জ্বালানি ও সারের মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব ধীরে ধীরে ভোক্তাদের গ্রোসারি বিলেও প্রতিফলিত হবে।”
কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্যও এটি একটি কঠিন সময়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানো হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, আবার সুদের হার অপরিবর্তিত রাখলেও মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংঘাত এখন আর শুধু আঞ্চলিক সংকট নয়; এর ঢেউ বিশ্ব অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে আঘাত হানছে। কানাডার এপ্রিলের মূল্যস্ফীতির তথ্য সেই বৈশ্বিক বাস্তবতারই নতুন এক ইঙ্গিত বহন করছে।

