
কানাডার আলবার্টা প্রদেশের এডমন্টন ভ্যালি জুতে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে বাস করছে একটি এশীয় হাতি লুসি। বয়স এখন প্রায় ৪৯ বছর। অথচ জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়টুকু তাকে কাটাতে হচ্ছে সম্পূর্ণ একা। কোনো সঙ্গী হাতি নেই, নেই স্বাভাবিক সামাজিক পরিবেশ। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রাণীসেবায় প্রশিক্ষিত একটি দল প্রতিদিন তার যত্ন নিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে শুধু শারীরিক পরিচর্যাই কি যথেষ্ট? সামাজিক প্রাণী হিসেবে হাতির মানসিক চাহিদার কী হবে? লুসির গল্প এখন শুধু একটি চিড়িয়াখানার গল্প নয়; এটি বিশ্বজুড়ে বন্দি প্রাণী, বিশেষত হাতিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্কের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
লুসির জন্ম শ্রীলংকায়। ১৯৭৭ সালে মাত্র দুই বছর বয়সে তাকে কানাডার এই চিড়িয়াখানায় নিয়ে আসা হয়। সে সময় বিশ্বের বহু চিড়িয়াখানাই দর্শনার্থী টানতে হাতি, বাঘ বা গরিলার মতো বড় প্রাণী সংগ্রহে প্রতিযোগিতায় নামত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাণী অধিকার ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে। গত দুই দশকের বেশিরভাগ সময় লুসি কাটিয়েছে একাই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি হাতির জন্য এটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিকর পরিস্থিতি।
প্রাণী অধিকারকর্মী ও অ্যাডভোকেসি গ্রুপের একজন মুখপাত্র বলেন, বন্য পরিবেশে হাতিরা অত্যন্ত জটিল সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বাস করে। তারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটায়, একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং দলগতভাবে চলাফেরা করে। তার ভাষায়, “হাতিদের জীবনের একটি উদ্দেশ্য থাকে খাবার খোঁজা, পানির সন্ধান করা, সঙ্গী নির্বাচন করা এবং পারস্পরিক যোগাযোগ বজায় রাখা। কিন্তু বন্দিদশায় তারা সেই স্বাভাবিক আচরণের সামান্য অংশও প্রকাশ করতে পারে না।” হাতি পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীদের মধ্যে একটি। তাদের স্মৃতিশক্তি প্রবল, আবেগ প্রকাশের ক্ষমতা রয়েছে এবং তারা শোকও অনুভব করতে পারে। ফলে দীর্ঘদিন একাকিত্বে থাকা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
লুসির ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে আধুনিক যুগে চিড়িয়াখানার প্রয়োজনীয়তা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিতর্ক। বহু প্রাণী অধিকার সংগঠন দাবি করছে, বড় স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ছোট বা সীমাবদ্ধ জায়গায় আটকে রাখা অমানবিক। এই প্রেক্ষাপটে কানাডায় আনা হয়েছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন জেন গুডাল অ্যাক্ট, যা বিল এস-১৫ নামেও পরিচিত। এই আইনে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া কানাডায় হাতি ও গ্রেট এপদের বন্দি অবস্থায় রাখার প্রথা ধীরে ধীরে বন্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে কানাডার সিনেটে বিলটি পাসও হয়। তবে চলতি বছরের শুরুতে সংসদ স্থগিত হয়ে যাওয়ায় আইনটি আপাতত থমকে আছে। তবু বিষয়টি পরিষ্কার যে, প্রাণী অধিকার নিয়ে কানাডাসহ বিশ্বের বহু দেশে নতুন ধরনের নৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন শহর ইতিমধ্যেই ঐতিহ্যগত চিড়িয়াখানার বিকল্প মডেল খুঁজতে শুরু করেছে। এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ বুয়েন্স আয়ার্স ইকো-পার্ক। ২০১৬ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েন্স আয়ার্স সরকার ১৪০ বছরের পুরোনো চিড়িয়াখানাটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেখানে থাকা প্রায় আড়াই হাজার প্রাণীর বেশিরভাগকে অভয়ারণ্য বা প্রাকৃতিক পরিবেশে স্থানান্তরের পরিকল্পনা করা হয়। বর্তমানে সেই জায়গাটি একটি “ইকো-পার্ক”-এ রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে দর্শনার্থীদের মূলত প্রাণীদের প্রাকৃতিক আবাস, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে সচেতন করা হয়। অর্থাৎ, প্রাণীকে প্রদর্শনের বস্তু না বানিয়ে তাদের স্বাভাবিক জীবন ও পরিবেশ বোঝানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
ভবিষ্যতের চিড়িয়াখানা হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নেবে। সেখানে প্রাণীদের কৃত্রিম খাঁচায় আটকে রাখার বদলে বড় প্রাকৃতিক আবাস, পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভার্চুয়াল প্রদর্শনের দিকে ঝুঁকতে পারে প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের যুক্তিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাদের দাবি, অনেক বিপন্ন প্রাণী সংরক্ষণ, গবেষণা এবং জনসচেতনতা তৈরিতে চিড়িয়াখানার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন সংরক্ষণের নামে কোনো প্রাণীকে সারাজীবন একাকী বন্দিদশায় রাখা কতটা ন্যায্য?
এডমন্টনের চিড়িয়াখানায় লুসি হয়তো এখনও প্রতিদিন দর্শনার্থীদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু তার নিঃসঙ্গ জীবন এখন বিশ্বজুড়ে একটি বড় নৈতিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে মানুষের বিনোদনের জন্য কি বুদ্ধিমান ও সামাজিক প্রাণীদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া উচিত? লুসির জীবন সেই প্রশ্নেরই এক নীরব প্রতিচ্ছবি।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

