
কানাডায় সংবাদমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, জনপ্রিয় এআইভিত্তিক সেবাগুলো মূলত সংবাদমাধ্যমের তৈরি কনটেন্টের ওপর নির্ভর করেই নিজেদের তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করছে, কিন্তু সেই উৎসকে যথাযথ স্বীকৃতি বা আর্থিক মূল্য দিচ্ছে না। ফলে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নীতিনির্ধারক ও গণমাধ্যম মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি দল হাজার হাজার সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আধুনিক এআই সিস্টেমগুলো কানাডার সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে বিস্তৃত ও আপডেট ধারণা রাখে যা মূলত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। তবে ব্যবহারকারীরা যখন এসব সেবাকে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এআই উত্তর দেয় উৎসের উল্লেখ ছাড়াই। ফলে তথ্য পাওয়া গেলেও, সেটি কোন সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমের কাজ তা অজানাই থেকে যায়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কোনো নির্দিষ্ট প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু জানতে চাইলে এআই এমনভাবে সারসংক্ষেপ বা বিশ্লেষণ করে, যাতে ব্যবহারকারীর মূল প্রতিবেদনটি পড়ার প্রয়োজন অনেকটাই কমে যায়। এর ফলে সংবাদমাধ্যমে সরাসরি পাঠক যাওয়ার প্রবণতা হ্রাস পাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের পাঠকসংখ্যা ও বিজ্ঞাপননির্ভর আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে একটি “তিন ধাপের নির্ভরতা” কাজ করছে। প্রথমত, সংবাদকে প্রশিক্ষণ ডেটা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে; দ্বিতীয়ত, সেই তথ্য থেকে নতুন ভাষায় উত্তর তৈরি করা হচ্ছে; এবং তৃতীয়ত, সেটি সরাসরি ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় মূল সংবাদমাধ্যম প্রায় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। ফলে যে সাংবাদিকতা এআইকে তথ্য দিয়ে শক্তিশালী করছে, তার অর্থনৈতিক ভিত্তিই ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে কানাডার সরকারও বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করছে। ব্যান্ফে অনুষ্ঠিত এক জাতীয় আলোচনায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী স্বত্বাধিকার, ন্যায্য পারিশ্রমিক এবং এআই-নির্ভর কনটেন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্পষ্ট নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রীও স্বীকার করেছেন, সৃজনশীল খাতের মানুষেরা চান এআই প্রযুক্তির বিকাশ যেন নিয়ন্ত্রিত ও স্বচ্ছ কাঠামোর মধ্যে হয়।
অন্যদিকে, দেশের বড় বড় সংবাদমাধ্যম ইতোমধ্যেই আইনি পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। তাদের অভিযোগ, অনুমতি ছাড়াই সংবাদভিত্তিক উপাদান ব্যবহার করে এআই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বাণিজ্যিক লাভ অর্জন করছে। বিষয়টি বর্তমানে আদালতের বিবেচনায় রয়েছে।
কানাডা সরকার কয়েক বছর আগে অনলাইন সংবাদ আইন চালু করে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর সংবাদমাধ্যমের প্রতি আর্থিক দায়বদ্ধতা আরোপের চেষ্টা করেছিল। তবে এর ফলাফল মিশ্র হয়েছে কিছু প্রতিষ্ঠান সংবাদ কনটেন্ট সরিয়ে নিয়েছে, আবার কেউ কেউ নির্দিষ্ট চুক্তির আওতায় অর্থ প্রদান শুরু করেছে।
গবেষকদের মতে, একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন মানুষের মনোযোগ সংবাদ থেকে সরিয়ে নিয়েছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই প্রক্রিয়াকে আরও গভীর স্তরে নিয়ে যাচ্ছে। এখন শুধু পাঠক হারানোর প্রশ্ন নয় সংবাদমাধ্যমের অস্তিত্বই দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এই বাস্তবতায়, সাংবাদিকতা ও প্রযুক্তির মধ্যে একটি ন্যায্য ও টেকসই সম্পর্ক গড়ে তোলার দাবি জোরালো হচ্ছে যেখানে তথ্যের উৎসকে সম্মান দেওয়া হবে এবং সৃজনশীল শ্রমের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করা হবে।

