‘৬০ দিনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ফিরছে’ দাবিতে ভাইরাল ভিডিও সম্পাদিত

‘৬০ দিনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ফিরছে’ দাবিতে ভাইরাল ভিডিও সম্পাদিত - the Bengali Times
৬০ দিনের মধ্যে ফিরছে আওয়ামী লীগ দাবিতে পোস্ট ছবি স্ক্রিনশট

অবশেষে একটা সুখবর পেলো আওয়ামী লীগ, ৬০ দিনের মধ্যে ফিরতে চলেছে আওয়ামী লীগ, ভারত ছেড়ে লন্ডন সফরে যাচ্ছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা— এমন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

এই দাবিতে পোস্ট আছে এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।

- Advertisement -

‘আওয়ামী লীগ পরিবার’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ২ এপ্রিল ১টা ১২ মিনিটে আলোচিত দাবিতে একটি পোস্ট শেয়ার করা হয়েছে। পোস্ট করা ওই ভিডিওটি আজ দুপুর ২টা ২৬ মিনিট পর্যন্ত ৭২ হাজার বার দেখা হয়েছে। ভিডিওটিতে ৪ হাজার ২০০ রিয়েকশন ও ৫১ কমেন্ট রয়েছে। এ ছাড়া ভিডিওটি ২২৫ বার শেয়ার হয়েছে। ভিডিওতে ব্যবহারকারীদের কমেন্টে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ বিশ্বাস করে লিখেছেন ‘আলহামদুলিল্লাহ’, আবার কেউ কমেন্ট করেছেন ‘ভুয়া নিউজ’।

অনুসন্ধানে প্রথমেই আলোচিত দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, একজন সংবাদ পাঠিকাকে বলতে শোনা যায়, ‘এদিকে ভারত ছেড়ে লন্ডন যাচ্ছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। খেলা শুরু হয়ে গেছে আওয়ামী লীগের। অবশেষে ৬০ দিনের মধ্যেই আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে জাতিসংঘের চিঠি। ভারতের চাপে ক্ষমতা হারাবেন তারেক রহমান।’

ভিডিওর ১৩ সেকেন্ড থেকে আরেকজন উপস্থাপিকাকে বলতে শোনা যায়, ‘বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেশটির সরকারকে চিঠি দিয়েছে জাতিসংঘ। চিঠিতে রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের ওপর বলবৎ নিষেধাজ্ঞা কেন প্রত্যাহার করা হবে না, তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।’

ভিডিওটি পর্যবেক্ষণেও অসঙ্গতি দেখা যায়। এতে ব্যবহৃত বক্তব্যগুলো আলাদা উৎস থেকে কেটে জোড়া লাগানো হয়েছে বলে ধারণা পাওয়া যায়, যা সন্দেহ তৈরি করে। এ ছাড়া ভিডিওর শুরুতে সংবাদ উপস্থাপকের ঠোঁটের নড়াচড়া ও কথার মধ্যে স্পষ্ট অসামঞ্জস্য দেখা যায়।

ভাইরাল ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কি-ওয়ার্ড ব্যবহার করে অনুসন্ধান করা হয়। এ ছাড়া আলোচিত দাবিগুলোর বিষয়ে দেশীয় বা আন্তর্জাতিক কোনো গণমাধ্যমে কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এমন কোনো তথ্য মেলেনি।

বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের ওয়েবসাইটে ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি চিঠি পাওয়া যায়। ওই চিঠিতে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়, এমন সিদ্ধান্ত সংগঠনের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের অধিকারের ওপর অপ্রয়োজনীয় ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার বিষয়েও জোর দেওয়া হয়।

তবে ওই চিঠিতে কোথাও ‘৬০ দিনের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া’ বা এমন কোনো সময়সীমা নির্ধারণের কথা বলা হয়নি। বরং ১৮ পৃষ্ঠার চিঠিটির ৯ পৃষ্ঠার শেষ প্যারায় জানানো হয়েছে, এই যোগাযোগ এবং সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত যেকোনো প্রতিক্রিয়া ৬০ দিনের মধ্যে যোগাযোগ প্রতিবেদন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে। পরবর্তীকালে মানবাধিকার পরিষদে উপস্থাপিতব্য নিয়মিত প্রতিবেদনেও এগুলো উল্লেখ করা হবে।

চিঠিতে শেখ হাসিনার ভারত ছেড়ে লন্ডন সফরের বিষয়ে চিঠি কিংবা গণমাধ্যমে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে ‘আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে সরকারকে জাতিসংঘের বার্তা! অন্তর্বর্তীর পর বিএনপিকেও একই বার্তা’ শিরোনামে ‘News Analysis by Kazi Runa’ নামের ইউটিউব চ্যানেলে ৯ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পাওয়া যায়। গত ২৬ মার্চ ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ওই ভিডিওর ডেসক্রিপশনে লেখা হয়েছে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেশটির সরকারকে চিঠি দিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রচার ও সুরক্ষা বিষয়ক বিশেষ দূত বেন সৌল, নির্বিচার আটক সম্পর্কিত ওয়ার্কিং গ্রুপের যোগাযোগের ভাইস-চেয়ারম্যান ম্যাথিউ জিলেট, বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা সম্পর্কিত বিশেষ দূত মার্গারেট স্যাটার্থওয়েট যৌথভাবে এই চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি আওয়ামী লিগের ওপর নিষেধাজ্ঞা কেন প্রত্যাহার করা হবে না তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

ডেসক্রিপশন আরও বলা হয়েছে, সূত্রগুলো বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত ডিসেম্বরের শেষ ভাগে জাতিসংঘের এই তিন বিশেষ দূত চিঠি দিয়েছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারকে একাধিকবার চিঠির জবাবের জন্য তাঁরা তাগাদাও দিয়েছিলেন। নির্বাচনের পর বাংলাদেশের বিএনপি সরকারের কাছে ওই চিঠির জবাব চেয়েও বার্তা দেওয়া হয়েছে। সবশেষ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গত ২৬ মার্চ জাতিসংঘ মহাসচিবের বৈঠকে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের ওই নিষেধাজ্ঞা কতদিন বলবৎ থাকবে সেটিও জানতে চাওয়া হয়েছে। চিঠিতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে দশটি বিস্তারিত প্রশ্ন তুলে ধরে জানতে চাওয়া হয়েছে— অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে আওয়ামী লিগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য যেসব আশঙ্কা বা ঝুঁকি থাকার কথা বলা হয়েছে সেগুলোর পেছনে সুনির্দিষ্ট যুক্তি কী কী। সূত্রগুলো বলছে, জাতিসংঘের দূতদের এই চিঠি বিভিন্ন দেশ ও দাতাগোষ্ঠীর কাছেও পাঠানো হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এই প্রথম দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles