
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে কানাডার অবস্থান নিয়ে দেশটির সংসদে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য বা চলমান সংঘাতে কানাডা কোনোভাবেই জড়িত নয় এবং ভবিষ্যতেও এতে অংশ নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। মঙ্গলবার হাউজ অব কমন্সে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি এই অবস্থান তুলে ধরেন।
ইরান ইস্যুতে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার না করার অভিযোগে বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন কার্নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি নিজের নির্ধারিত সূচি পরিবর্তন করে সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে উপস্থিত হন। এদিন বিরোধী কনজারভেটিভ সদস্যরা মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বিশেষ করে জননিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি এবং নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে আন্তর্জাতিক ইস্যু হিসেবে ইরান প্রসঙ্গটি জোরালোভাবে সামনে আনেন ব্লক কুইবেকোয়িসের নেতা ইভস-ফ্রাসোয়াঁ ব্লাশে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিদেশ সফর নিয়েও সমালোচনা করেন এবং মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে কানাডার কৌশলগত লক্ষ্য কী তা স্পষ্ট করার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী কার্নি ফরাসি ভাষায় দেওয়া জবাবে বলেন, কানাডার অবস্থান “সম্পূর্ণ পরিষ্কার”। তিনি উল্লেখ করেন, কানাডা ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি ও সন্ত্রাসবাদে সম্পৃক্ততা থেকে বিরত রাখতে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সামরিক পদক্ষেপ নয়, বরং কূটনৈতিক ও বহুপাক্ষিক উদ্যোগই কানাডার অগ্রাধিকার। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যেকোনো সামরিক অভিযানে কানাডা অংশ নিচ্ছে না এবং ভবিষ্যতেও এমন কোনো পদক্ষেপের পরিকল্পনা নেই। এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে একটি “সতর্ক দূরত্ব” বজায় রাখার ইঙ্গিত দেন।
ব্লাশে পরে জানতে চান, ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে ইরান ইস্যুতে কোনো অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছানো গেছে কি না। উত্তরে কার্নি জানান, তিনি জি৭ দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। এ তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও রয়েছেন। কার্নির ভাষ্য অনুযায়ী, জি৭ জোটের মধ্যে একটি সমন্বিত কৌশল গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে, যার মূল লক্ষ্য হবে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত এড়ানো।
কানাডার এই অবস্থানকে অনেক বিশ্লেষক “ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি” হিসেবে দেখছেন। একদিকে, পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা অন্যদিকে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়ানো থেকে বিরত থাকা এই দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম সমন্বয় করার চেষ্টা করছে দেশটি।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো সংঘাত দ্রুত বৃহত্তর আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। সেই প্রেক্ষাপটে কানাডা কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়ে একটি মধ্যপন্থী অবস্থান নিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাদের শান্তিপ্রিয় ভাবমূর্তিকে আরও জোরদার করতে পারে। সব মিলিয়ে, কার্নির বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে কানাডা ইরান ইস্যুতে নীতিগত অবস্থান বজায় রাখলেও সরাসরি যুদ্ধের পথে হাঁটতে প্রস্তুত নয়। বরং আলোচনাই হবে তাদের প্রধান হাতিয়ার।

