ইরান ইস্যুতে নিজের ফাঁদে নিজেই ধরা ট্রাম্প!

ইরান ইস্যুতে নিজের ফাঁদে নিজেই ধরা ট্রাম্প! - the Bengali Times
ডোনাল্ড ট্রাম্প ছবি সংগৃহীত

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যে সৃষ্টি করেছে এক নজিরবিহীন উত্তেজনার। এই সংঘাতের প্রভাব এখন শুধু ওই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বব্যাপী। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ক্রমাগত চাপ ও উসকানির জেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। তবে এই কঠোর সিদ্ধান্ত তাকে নানা ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এই পদক্ষেপের যৌক্তিকতা নিয়ে উঠতে শুরু করেছে প্রশ্ন! অনেকেই ভাবছেন, এই হামলার কি আদৌ প্রয়োজন ছিল এবং এর দীর্ঘমেয়াদী ফল কী হতে পারে। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় কোনো সাফল্য বয়ে আনবে কি না, তা এখন স্পষ্ট নয়।

- Advertisement -

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শক্তিশালী এই হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। জল, স্থল ও আকাশপথে ইরানি সামরিক স্থাপনাগুলোতে একযোগে আঘাত হেনেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর ফলে সংকটটি দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, পরিস্থিতি ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

হোয়াইট হাউসে দুই মেয়াদে থাকা ট্রাম্প অতীতে সাধারণত বড় ধরনের সংঘাত এড়িয়ে গেছেন। তিনি সবসময় দ্রুত ও সীমিত পরিসরের সামরিক অভিযানকে প্রাধান্য দিয়েছেন। চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় আকস্মিক অভিযান বা জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা তার সেই কৌশলেরই প্রতিফলন ছিল।

জনস হপকিন্স স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক লরা ব্লুমেনফেল্ড বলেন, ইরানে আক্রমণ অত্যন্ত জটিল এবং সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি একটি সামরিক অভিযান। এর মাধ্যমে ট্রাম্প বৈশ্বিক অর্থনীতি, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ নিয়ে বাজি ধরেছেন।

উল্লেখ্য, ক্ষমতায় এসে ‘অর্থহীন’ যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু তিনি এখন এমন এক যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যাকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উন্মুক্ত যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইরানের তেমন কোনো আসন্ন হুমকি না থাকলেও এই অভিযান শুরু করা হয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট ও তার সহযোগীদের মত অবশ্য ভিন্ন।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-এর উদ্দেশ্য ও শেষপর্যায়ের পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হিমশিম খাচ্ছেন ট্রাম্প। যুদ্ধের যৌক্তিকতা এবং এই যুদ্ধে ‘জয়’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, তা নিয়ে তার বক্তব্যে অসংগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর এটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি এসব সমালোচনা নাকচ করে দিয়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার লক্ষ্য স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও উৎপাদন সক্ষমতা ধ্বংস করা, তাদের নৌবাহিনীকে অকার্যকর করে দেওয়া, প্রক্সি বাহিনীকে অস্ত্র দেওয়ার সক্ষমতা বন্ধ করা এবং ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়া-এগুলোর মধ্যেই তার পরিকল্পনা সীমাবদ্ধ।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে, যুক্তরাষ্ট্রের হতাহতের সংখ্যা বাড়লে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়ে অর্থনৈতি ক্ষতি আরও বাড়লে, ট্রাম্পের এই বড় পররাষ্ট্রনীতির জুয়া রিপাবলিকান পার্টির জন্য মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনবে।

ইরান ইস্যুতে সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়লেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার মূল ভোটসমর্থকদের একটা বড় অংশের আস্থা এখনো ধরে রেখেছেন। তার রাজনৈতিক আন্দোলন ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’-এর অনেক সদস্যই আপাতত তাকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

তবে এই সমর্থন যদি কোনোভাবে দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কা তৈরি হবে। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে স্বতন্ত্র ভোটাররা, এই যুদ্ধের বিরোধী।

রিপাবলিকান কৌশলবিদ ব্রায়ান ডার্লিং বলেন, আমেরিকানরা ইরাক ও আফগানিস্তানের ভুল ইতিহাস পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না। এমনকি এমএজিএ সমর্থকদের মধ্যেও এ নিয়ে দ্বিধাবিভক্তি দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ ট্রাম্পের দেওয়া ‘নতুন যুদ্ধ না করার’ প্রতিশ্রুতির ওপর ভরসা করেছিলেন, আবার কেউ কেউ তার যেকোনো সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত।

বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ট্রাম্প প্রশাসনের বার্তায় অসামঞ্জস্যতা, বিশেষ করে ইরানে ‘শাসন পরিবর্তন’ ইস্যুতে। সংঘাতের শুরুর দিকে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানের শাসকদের উৎখাত করাও একটি লক্ষ্য হতে পারে। কিন্তু দুই দিন পর তিনি সেই বিষয়টিকে আর অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেননি।

পরে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনে তিনি ভূমিকা রাখতে চান এবং ইরানি কুর্দি বিদ্রোহীদের হামলা চালাতে উৎসাহ দেন। এরপর শুক্রবার সামাজিক মাধ্যমে তিনি ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেন।

অন্যদিকে ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে ইসরায়েল ও প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর আঘাত হানছে। তাদের লক্ষ্য অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা তৈরি করা এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের জন্য যুদ্ধের খরচ বাড়িয়ে দেওয়া। এছাড়া ইরান তার মিত্র বা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করার ইঙ্গিত দিয়েছে। ইতোমধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ নতুন করে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে, ফলে যুদ্ধ আরেকটি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম। ছয় মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে আরও হতাহতের আশঙ্কা নিয়ে ট্রাম্প খুব একটা মাথা ঘামাতে নারাজ। এমনকি প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনাও তিনি পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ইরান-প্রণোদিত হামলার আশঙ্কা নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘হয়তো…যেমন বলেছি, কিছু মানুষ মারা যাবে।’

মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফ বলেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা তখনই বাড়বে, যখন আমেরিকানদের হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। কারণ ইরানও ঠিক সেটাই চাইছে।

অনেক বিশ্লেষকের মতে, দ্বিতীয় মেয়াদে সামরিক পদক্ষেপের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখানো ট্রাম্প হয়তো ধরে নিয়েছিলেন যে, ইরান অভিযানও এ বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় চালানো অভিযানের মতোই সহজ হবে। ওই অভিযানে মার্কিন বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে। এতে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ছাড়াই ট্রাম্প দেশটির বিশাল তেল সম্পদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন। কিন্তু ইরান অনেক বেশি শক্তিশালী ও সুসজ্জিত প্রতিপক্ষ, যেখানে রয়েছে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ও নিরাপত্তা কাঠামো।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles