‘দায়িত্ব পালনে আমি মায়ের আদর্শে অবিচল’, টাইম ম্যাগাজিনকে তারেক রহমান

‘দায়িত্ব পালনে আমি মায়ের আদর্শে অবিচল’, টাইম ম্যাগাজিনকে তারেক রহমান - the Bengali Times
সংগৃহীত ছবি

দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে ফেরার পর তার প্রথম পরিবর্তনটি দৃশ্যমান হয়েছে শারীরিকভাবে—তিনি তার কণ্ঠস্বর হারিয়েছেন। অতিরিক্ত কথা বলা বা আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে তার গলা বসে গেছে। ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশ বাংলাদেশের আগামী দিনের সম্ভাব্য নেতার জন্য এটি হয়তো আদর্শ পরিস্থিতি নয়, তবে বিষয়টিতে রয়েছে এক অদ্ভুত বিদ্রূপ। কারণ, গত এক দশক ধরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে স্থানীয় গণমাধ্যমে তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার ও প্রকাশ নিষিদ্ধ ছিল।

টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, ‘আমার শরীর স্থানীয় আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। সত্যি বলতে, আমি এখন খুব একটা ভালো কথা বলতে পারছি না। তবে আমাকে কিছু করতে বলা হলে আমি আমার সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করি।’

- Advertisement -

জামায়াত আমিরের সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎজামায়াত আমিরের সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ
গত কয়েক সপ্তাহ তারেক রহমানের ওপর দিয়ে ঝড়ের মতো বয়ে গেছে। গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি যখন বাংলাদেশে পৌঁছান, তখন ঢাকা বিমানবন্দরে হাজার হাজার উচ্ছ্বসিত সমর্থক সারারাত অপেক্ষা করে তাকে অভ্যর্থনা জানায়। এর মাত্র ৫ দিন পর, দীর্ঘ অসুস্থতার শেষে তার মা বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে জনসমুদ্রে পরিণত হয় রাজধানী। চোখ ছলছল অবস্থায় তারেক বলেন, ‘আমার হৃদয়ে এটি এক বিশাল ক্ষত। কিন্তু তার কাছ থেকে আমি যে শিক্ষা পেয়েছি তা হলো—যখন আপনার কাঁধে কোনো দায়িত্ব আসবে, আপনাকে অবশ্যই তা পালন করতে হবে।’

সেই দায়িত্ব হতে পারে মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারেক রহমান স্পষ্টভাবেই অগ্রগামী। ১৮ মাস আগে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন এক গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার পতনের পর এই নির্বাচনের ডাক দেওয়া হয়। তারেক রহমান নিজেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক আভিজাত্য এবং তরুণ বিপ্লবীদের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হিসেবে উপস্থাপন করছেন।

বর্তমানে অনেক সমস্যাই দ্রুত সমাধানের দাবি রাখে। বাংলাদেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং টাকার মান কমে যাওয়ার সংকটে ভুগছে, যা সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দিচ্ছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করতে হয়েছে, যা উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহকে ব্যাহত করছে। এসব প্রতিকূলতা পোশাক রপ্তানি এবং প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল জাতীয় অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। ১৩.৫ শতাংশ যুব বেকারত্ব এবং প্রতি বছর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করা ২০ লাখ তরুণের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা এখন সময়ের বড় দাবি।

সমর্থকদের কাছে তারেক রহমান একজন নির্যাতিত ত্রাণকর্তা, যিনি তার বিপর্যস্ত দেশকে বাঁচাতে ফিরে এসেছেন। অন্যদিকে সমালোচকদের কাছে তিনি এক ‘অন্ধকার রাজপুত্র’, যার নেতৃত্বের একমাত্র যোগ্যতা জন্মগত পরিচয়। তবে তারেক রহমানের দাবি, বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তিনিই সঠিক ব্যক্তি। তিনি বলেন, ‘আমি আমার বাবা-মায়ের সন্তান বলে এখানে নেই। আমার দলের নেতা-কর্মীরাই আজ আমার এখানে থাকার মূল কারণ।’

অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালেও সামনে বড় চ্যালেঞ্জঅর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালেও সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশিরাও তাকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে বলে মনে হচ্ছে। ডিসেম্বরের শেষের দিকে এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, তার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সমর্থন প্রায় ৭০ শতাংশ। তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন ১৯ শতাংশ।

তা সত্ত্বেও উদ্বেগ রয়ে গেছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনকালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশকে টানা চার বছর বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সংস্কারপন্থীরা আশঙ্কা করছেন, হাসিনাকে হটাতে গিয়ে যে ১,৪০০ বিক্ষোভকারী প্রাণ দিয়েছেন, তাদের রক্ত যেন আবার কোনো আত্মস্বার্থমগ্ন বংশধরের উত্থানের কারণ না হয়।

তারেক রহমান সব দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার পূর্বের সাজাগুলো বাতিল করেছে। অভিযোগকারীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি।’ এটি সত্য যে, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ অনুগত সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো প্রচার করেছিল। তবে এটাও সত্য যে, জুলাই বিপ্লব যে বংশানুক্রমিক বিশেষাধিকারের বিরুদ্ধে ছিল, তারেক রহমান সেই একই ঐতিহ্যের অংশ।

দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির এই দেশ জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে এককভাবে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে এবং মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের সাথে মহড়ায় অংশ নেয়। জনবহুল এই দেশটি পার্শ্ববর্তী মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় উৎস এবং রপ্তানির প্রধান গন্তব্য। দেশটি এখন হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের দিকে ঝুঁকছে, যা স্যামসাংয়ের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চীন থেকে তাদের সাপ্লাই চেইন সরিয়ে আনার সুযোগ করে দিচ্ছে। অন্যদিকে বেইজিংও বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী, কারণ বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থান দক্ষিণ চীন সাগরে কোনো অবরোধের পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের সাহায্য করতে পারে।

আশা করা হচ্ছে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের শুরু করা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো স্বৈরতন্ত্রের দিকে ফিরে যাওয়া রোধ করতে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য রক্ষা করবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক বনবাসে থাকার সময় তারেক রহমান যে আত্মোপলব্ধি করেছেন, তা তাকে সত্যিকারের জননেতা হিসেবে গড়ে তুলবে।

তিনি বলেন, ‘যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের প্রতি আমাদের অনেক বড় দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে যেন মানুষ তাদের রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পায়।’

তারেক রহমানকে বিনয়ী ও অন্তর্মুখী মনে হয়; তিনি কথা বলার চেয়ে শুনতে বেশি পছন্দ করেন। লন্ডনে থাকার সময় তার প্রিয় কাজ ছিল রিচমন্ড পার্কে আনমনে ঘুরে বেড়ানো অথবা ইতিহাসের বই পড়া। তার প্রিয় সিনেমা ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’। তিনি রহস্য করে বলেন, ‘আমি সম্ভবত এটি আটবার দেখেছি!’

তারেক রহমানকে একজন নীতি-নির্ধারক হিসেবে মনে হয়, যার কাছে যেকোনো বিষয়ের তথ্য-উপাত্ত মুখস্থ। তিনি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখতে ১২ হাজার মাইল খাল খনন, ভূমি ক্ষয় রোধে বছরে ৫ কোটি গাছ লাগানো এবং ধোঁয়াশাচ্ছন্ন ঢাকার বাতাসের মান উন্নত করতে ৫০টি নতুন সবুজ এলাকা তৈরির পরিকল্পনা করছেন। এছাড়াও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, প্রবাসী শ্রমিকদের দক্ষ করতে কারিগরি কলেজের আধুনিকায়ন এবং সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চাপ কমাতে বেসরকারি হাসপাতালের সাথে অংশীদারিত্বের পরিকল্পনা রয়েছে তার।

তিনি বলেন, ‘আমি যদি আমার পরিকল্পনার মাত্র ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে আমি নিশ্চিত বাংলাদেশের মানুষ আমাকে সমর্থন করবে।’

তারেক রহমানের এই প্রযুক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি তার অতীত ভাবমূর্তি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি ঢাকায় জন্ম নেন, বিমান বাহিনীর স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং আশির দশকের মাঝামাঝি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে তার স্নাতক শেষ করা হয়নি, দ্বিতীয় বর্ষেই পড়াশোনা ছেড়ে দেন। পরবর্তীতে তিনি ব্যবসায় এবং ৯০-এর দশকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, হয়ে ওঠেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব। ক্ষমতার কেন্দ্রে তার ক্রমবর্ধমান প্রভাব তাকে দলের কৌশলে প্রধান চরিত্রে পরিণত করে, কিন্তু সমালোচকরা তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও শাসনে অযাচিত হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলেন।

২০০৭-২০০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় অর্থ আত্মসাৎ, মানি লন্ডারিং এবং গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনাসহ ৮৪টি অভিযোগে তারেক রহমান ১৮ মাস কারাবরণ করেন। কারাগারে নির্যাতনের শিকার হওয়ায় তার মেরুদণ্ডে সমস্যা দেখা দেয় যা এখনও তাকে ভোগায়। মূলত চিকিৎসার জন্যই তিনি যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘শীত বেশি হলে আমার পিঠে ব্যথা হয়। তবে আমি এটাকে জনগণের প্রতি আমার দায়িত্বের স্মারক হিসেবে দেখি। আমি আমার সেরাটা দিতে চাই যেন ভবিষ্যতে অন্য কাউকে এমন কষ্টের শিকার হতে না হয়।’ ২০১৮ সালে তার মা দুর্নীতির অভিযোগে কারাবরণ করলে তারেক রহমান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে বিদেশ থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দল পরিচালনা শুরু করেন।

এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে। এটি এশিয়া-প্যাসিফিকের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়, যেখানে ২০০৬ সালে জিডিপি ৭১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২২ সালে ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। কিন্তু একই সাথে আওয়ামী লীগ আরও দমনমূলক হয়ে ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকারের মতে, হাসিনার শেষ ১৫ বছরে প্রায় ৩,৫০০ মানুষ বিচারবহির্ভূতভাবে নিখোঁজ হয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছিল, যার ফলে সামরিক বাহিনী, আদালত এবং বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়। স্বাধীন সাংবাদিক ও সুশীল সমাজ নজরদারি ও হয়রানির অভিযোগ করে আসছিল।

সময়ের সাথে সাথে অর্থনৈতিক সূচকগুলো নেতিবাচক হতে শুরু করে—ব্যয় বৃদ্ধি, বৈষম্য এবং যুব বেকারত্ব আকাশচুম্বী হয়। জুলাই অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল কোটা সংস্কারের শান্তিপূর্ণ দাবির মাধ্যমে, কিন্তু হাসিনার কঠোর দমনপীড়ন মানুষের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। কিশোর থেকে বৃদ্ধ, শিক্ষক থেকে ভিক্ষুক—সবাই রাজপথে নেমে আসে।

বিক্ষোভকারীরা যখন ঢাকার গণভবনের দিকে এগিয়ে যায়, হাসিনা সামরিক হেলিকপ্টারে ভারতে পালিয়ে যান। বর্তমানে তিনি সেখানেই আছেন এবং তার দলকে নির্বাচনে বাইরে রাখার সমালোচনা করছেন। শেখ হাসিনা টাইম-কে বলেন, ‘ভোটারদের বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। সব বড় দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত গণতন্ত্রের কোনো আশা নেই।’

গণতন্ত্র নিয়ে হাসিনার এই আক্ষেপ তারেক রহমানের কাছে হাস্যকর মনে হয়, কারণ তার শাসনামলে ব্যাপক রক্তপাত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যে অপরাধ করবে, দেশের আইন অনুযায়ী তাকে শাস্তি পেতে হবে।’ নভেম্বরে একটি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায় দিয়েছে যে, হাসিনা দেশে ফিরলে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড।

তবে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে বাইরে রাখার সিদ্ধান্তটি বিতর্কিত। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সম্প্রতি রয়টার্সকে বলেছেন যে, তাদের অনুসারীদের ভোট বিঘ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগকে ছাড়া আমরা কোনো নির্বাচন হতে দেব না। আমাদের প্রতিবাদ আরও জোরালো হবে এবং সহিংসতা হওয়ার সম্ভাবনা আছে।’

এই অস্থিরতা ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে সহায়ক হবে না। সংখ্যালঘু আক্রমণের খবরগুলো আওয়ামী লীগ প্রচার করছে এই প্রমাণ হিসেবে যে, উগ্রপন্থীরা দেশ দখল করেছে। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে নিষেধাজ্ঞার জন্য লবিংও করা হয়েছে। সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন বাংলাদেশের ওপর ২০ শতাংশ ‘রেসিপ্রোকাল’ শুল্ক আরোপ করেছে, যা রপ্তানি খাতে আঘাত হেনেছে। তারেক রহমান জানান, তিনি বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বোয়িং বিমান এবং মার্কিন জ্বালানি অবকাঠামো কেনার মাধ্যমে এই সংকট সমাধানের চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দেশের স্বার্থ দেখবেন, আমি আমার দেশের স্বার্থ দেখব। তবে আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে পারি। আমি নিশ্চিত মিস্টার ট্রাম্প একজন যুক্তিবাদী মানুষ।’

ঢাকার দেয়ালে দেয়ালে এখনও জুলাই বিপ্লবের স্মৃতিচিহ্ন দেখা যায়। দেয়ালে আঁকা চিত্রে হাসিনাকে মাথায় শিং এবং লুটের বস্তা হাতে চিত্রিত করা হয়েছে। স্লোগান লেখা হয়েছে— ‘পুলিশের লজ্জা হওয়া উচিত’, ‘এটি জেন-জি’র নতুন বাংলাদেশ’।

ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘জুলাইয়ের পর মানুষ বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র ও পুলিশের স্বাধীনতা চায়।’ তারেক রহমান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তারেক রহমান বেশ ভালো করছেন। বিএনপির মতো দল চালানো কঠিন। এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় না হলেও এখন পর্যন্ত তিনি দারুণ কাজ করছেন।’

তবে সংস্কারের সাফল্য নিয়ে এখনও সংশয় আছে। জুলাইয়ের সেই আনন্দ এখন অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর বিভাজনে কিছুটা ম্লান। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে কোনো রাজনৈতিক দলকে রাখা হয়নি এবং ইউনূসেরও সরকার পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। আন্দোলনে নারীরা সামনের সারিতে থাকলেও সরকারে তাদের অংশগ্রহণ সীমিত। নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন গঠন করা হলেও ইসলামপন্থীদের আপত্তির মুখে তাদের অনেক প্রস্তাব স্থগিত রাখা হয়েছে।

কিছু সাফল্যও আছে; গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন ১,৯১৩টি অভিযোগ খতিয়ে দেখেছে এবং ১,৫৬৯ জনের নিখোঁজের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সামরিক বাহিনীর চাপ সত্ত্বেও সন্দেহভাজনদের বেসামরিক আদালতে বিচার করা হচ্ছে। মুক্ত আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অধ্যাপক মুবাশার হাসান, যিনি হাসিনার আমলে ৪৪ দিন নিখোঁজ ছিলেন, বলেন, ‘এখন আমি সেমিনারে অংশ নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারি, যা হাসিনার আমলে চিন্তাতীত ছিল।’

কিন্তু একই সাথে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হয়েছে। গণপিটুনি এবং নারীদের ওপর অনলাইনে হেনস্তা বেড়েছে। গত ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনী প্রার্থী শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। মানুষের ধারণা, পুলিশ ও সেনাবাহিনী জুলাইয়ের ঘটনার পর থেকে তাদের দায়িত্ব পালনে দ্বিধাগ্রস্ত।

তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হবে আইনের শাসন নিশ্চিত করা, যাতে মানুষ রাস্তায় ও ব্যবসা ক্ষেত্রে নিরাপদ বোধ করে।’

নির্বাচনের সময় বাংলাদেশিরা সাংবিধানিক সংস্কারের ওপর গণভোটে অংশ নেবে। যেখানে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সময়সীমা নির্ধারণের বিষয় রয়েছে। সংস্কার কমিশনের প্রধান আলী রিয়াজ বলেন, ‘জনগণ যদি এতে না ভোট দেয়, তবে দেশ আবার অতীতের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।’

আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করেন। হাসিনা বলেন, ‘সবচেয়ে পুরনো দলকে বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচনই অবাধ বা সুষ্ঠু হতে পারে না।’ তবে আলী রিয়াজ অটল; তিনি বলেন, ‘যে দল মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে এবং যার কোনো অনুশোচনা নেই, তারা বরং উসকানি দিচ্ছে।’

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা সঠিক কিনা তা নিয়ে তারেক রহমান সরাসরি কিছু না বললেও নীতিগতভাবে তিনি কোনো দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন। তিনি বলেন, ‘আজ যদি আপনি একটি দল নিষিদ্ধ করেন, তবে কাল যে আমাকে নিষিদ্ধ করবেন না তার নিশ্চয়তা কী? তবে অপরাধীকে অবশ্যই পরিণাম ভোগ করতে হবে।’

বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো ইসলামপন্থীদের উত্থান। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে, যেখানে ১০ শতাংশ সংখ্যালঘুও আছে। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা থাকলেও ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়েছিল। শেখ হাসিনা চরমপন্থা নিয়ন্ত্রণে কঠোর থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকার জামায়াতে ইসলামীর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে।

সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন বড় জয় পায়। এনসিপি-র সাথে জামায়াতের সখ্যতার প্রতিবাদে অনেক নারী নেত্রী পদত্যাগ করেছেন। ট্রান্সজেন্ডার অধিকার কর্মী হো চি মিন ইসলাম বলেন, ‘এটি নারী এবং সংখ্যালঘুদের জন্য খুবই উদ্বেগজনক।’

জামায়াতে ইসলামী তাদের সংবিধানে শরিয়াহ আইনের কথা বললেও বর্তমানে তারা নিজেদের ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী’ এবং ‘সমাজকল্যাণমূলক’ দল হিসেবে তুলে ধরছে। এমনকি তারা একজন হিন্দু প্রার্থীও দিয়েছে। সমালোচকরা একে কৌশল বললেও সাধারণ মানুষ তাদের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। তারেক রহমান অবশ্য চিন্তিত নন; তিনি মনে করেন মানুষ শুধু বাক-স্বাধীনতা আর গণতন্ত্র চায়।

যিনিই ক্ষমতায় আসুন, ভারতের সাথে সম্পর্ক মেরামত করা হবে বড় চ্যালেঞ্জ। ভারত বাংলাদেশের প্রধান আমদানিকারক ও ট্রানজিট রুট। তারেক রহমান বলেন, ‘জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে আমরা ভারতের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চাই।’

ভারতের প্রতি তরুণদের ক্ষোভের কারণ হলো হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া। আটলান্টিক কাউন্সিলের মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘তারেক রহমানের জন্য এখন দিল্লির সাথে সরাসরি হাত মেলানো রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।’

এটি প্রজন্মের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ১৯৭১ সালে জামায়াত স্বাধীনতার বিরোধিতা করলেও আজকের তরুণদের কাছে তারা ভারতের চেয়ে ভালো বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তারেক রহমান জানেন, শুধু বংশীয় পরিচয় দিয়ে এখন আর পার পাওয়া যাবে না। আজকের বাংলাদেশিরা এমন নেতা চায় যিনি তাদের কথা শুনবেন এবং বিনিয়োগের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করবেন।

তারেক রহমান কি ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন? গত মে মাসে তিনি নিজেকে বিদ্রূপ করে আঁকা একটি কার্টুন শেয়ার করে লিখেছিলেন যে, ভিন্নমতের সাংবাদিকতাকে সম্মান করা উচিত। খালেদা জিয়ার জানাজায় তিনি হাসিনাকে আক্রমণ না করে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। হাসিনার ‘লৌহমানবী’ ইমেজের বিপরীতে তারেক রহমান নিজেকে নম্র হিসেবে উপস্থাপন করছেন। এমনকি তার বিড়াল ‘জেবু’র ছবিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়েছে।

লন্ডনের জীবনের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি তার ‘স্বাধীনতা’ মিস করছেন। বাড়ির চারদিকের কাঁটাতারের বেড়া দেখে তিনি রুদ্ধশ্বাস অনুভব করেন। আগে তিনি একা দোকানে যেতেন বা গাড়ি চালিয়ে মেয়ের কাছে চলে যেতেন, যা এখন আর সম্ভব নয়।

তবে তারেক রহমান অভিযোগ করছেন না; বরং তিনি দেখাতে চান যে তিনি এক উদ্দেশ্য নিয়ে ফিরে এসেছেন। প্রিয় সিনেমার সংলাপ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশাল ক্ষমতার সাথে বিশাল দায়িত্বও আসে। আমি এটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি।’

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles