
কবিতা মত প্রকাশের শৈল্পিক ক্ষেত্র; কবিতাকে বলা যায় ফ্রেমে বাঁধা নান্দনিক শব্দ চিত্র। কখনো কখনো কবিতাকে মনে হয় হৃদয়ের ডাকবাক্স। এমন সব বিচিত্র কথার মধ্যে দিয়ে কবিতাকে চেনার চেষ্টা করা যেতে পারে তবে একটি বিশেষ সংজ্ঞার মধ্যে কবিতাকে বন্দী রাখা দুষ্কর।
কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন ‘সকলেই কবি না। কেউ কেউ কবি’। তাঁর এই কথাকে মেনে নিয়েই বলতে চাই কবি খ্যাতি না পেলেও কবিতার বাস প্রতিটি বিবেকবান মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়। যিনি লেখাপড়া শেখেন নি কিংবা দু’কলম লিখতে পড়তে পারেন না এমন লোকও অনুভূতি দিয়ে দুচারটা পদ রচনা করেন নি তা কি সম্ভব? আবার ভাব প্রকাশে যার দ্বিধা কিংবা জ্ঞান বিজ্ঞান অথবা বুদ্ধির বাইরে গিয়ে অনুভূতির শৈল্পিক ব্যাখ্যা দিতে যিনি দু’কলম লিখতে চেষ্টা না করে লিখেছেন বড় পাতার বই, দলিল কিংবা কালের কণ্ঠ। তিনিও কিন্তু মনে মনে কবিতা রচনা করেন। এদের রচনা নীরবে নিভৃতে নিজস্ব গণ্ডিতে বাসা বাঁধে তাই দ্বিতীয় পক্ষ তৃতীয় পক্ষ তাদের কবিতার খোঁজ পায় না। এরা কল্পনা ও অনুভবকে ছন্দে (গদ্য অথবা পদ্য) বাঁধতে চেষ্টা করেন না বলেই কবিতা জন্ম পেলেও জীবন পায় না। বলতে পারেন মানব মনে যে কবিতা জন্ম নেয় তার বেশিরভাগই আলোর মুখ দেখে না। এসব কারণে আমরা বঞ্চিত হই বিশাল কবিতা ভাণ্ডার থেকে। কবিতা নিয়ে এটাই আমার সব চেয়ে বড় হতাশা।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘কবিতা প্রকাশ না করিলে কাহাকেও কবি বলা যায় না’। তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে কথাটি ব্যাখ্যা করেছেন; ‘আমার মনে আমার প্রেয়সীর ছবি আঁকা আছে বলিয়াই আমি কিছু চিত্রকর নই এবং ক্ষমতা থাকিলে আমার প্রেয়সীকে আঁকা যাইতে পারিত বলিয়া আমার প্রেয়সী একটি চিত্র নহেন’।
এ প্রসঙ্গে তাঁর আর একটি কথা হল, ‘আমি বলি, যে ভাব বিশেষ ভাষায় প্রকাশ হয় নাই তাহা কবিতা নহে ও যে ব্যক্তি ভাব বিশেষ ভাষায় প্রকাশ করে না, সেও কবি নহে।
আমি মনে করি পৃথিবীর স্থাবর অস্থাবর সব কিছুর ভেতরই একটা আত্মা থাকে। আত্মাই সুন্দর, আত্মাই শক্তি। সে আত্মাকে যিনি দেখতে পান তিনিই কবি। কানের দুল খোপার ফুল কিংবা দলছুট পিপীলিকা, এগুলো আমরা সাধারণ মানুষ দেখতে পাই কিন্তু দেখতে পাইনা তাদের ভেতর লুকায়িত শক্তি, যাকে আত্মা বলা যায়। ফুলের ভেতর লুকিয়ে থাকা দুষ্ট হাসি, পাথরের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অনাদিকালের ভক্তি কিংবা ঐ যে বললাম দলছুট হবার আনন্দ এগুলো যারা দেখতে পান তারাই কবি। কবি তার কল্পনা ও অনুভূতিকে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর চিন্তায়, কিছুটা আস্বাদ কিছুটা স্পন্দন ঢেলে বিশ্বাসী করে তুলতে পারেন বলেই আমরা সেই প্রয়াসকে বলি কবিতা।
‘আজ রাত্রে বালিশ ফেলে দাও, মাথা রাখো পরস্পরের বাহুতে, শোনো দূর সমুদ্রের স্বর, আর ঝাউবনে স্বপ্নের মতো নিস্বন, ঘুমিয়ে পড়ো না, কথা ব’লেও নষ্ট করো না এই রাত্রি – শুধু অনুভব করো অস্তিত্ব’ – বুদ্ধদেব বসু।
যিনি ভাল মানুষ, যিনি জ্ঞানী, সত্যিকারের অর্থে ধার্মিক কিংবা বুদ্ধিমান তাদের প্রয়াস বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দান সমাধান প্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষাতেই সমাপ্তি ঘটে। অথচ যদি অনুভূতি নিয়ে দু’কলম নিয়মসিদ্ধ রচনা লিখে যেতেন, তাহলে ভালমন্দ যাই হোক দু একটি গদ্য পদ্য কবিতা আমাদের হাতে আসতো। আমরা দুঃখ বেদনা বিড়ম্বনার মধ্যে দিয়ে প্রতিনিয়ত বেড়ে উঠছি। অথচ কত কি থেকে যায় আমাদের ভাবনা চিন্তার বাইরে। লিখতে পারলে হয়তো সেগুলো চমৎকার কবিতা হতো। রবীন্দ্রনাথের মতে, ‘এখানে বিষয় লইয়া কথা নহে, প্রকাশ লইয়া কথা। জুঁইফুল সুন্দর এ কথা বড়ো কবিও জানে ছোট কবিও জানে, অকবিও জানে – কিন্তু যে যত ভালো করিয়া প্রকাশ করে জুঁইফুলকে সে তত অধিক করিয়া আমার হাতে আনিয়া দেয়’।
কবি এবং কবিতার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকি বটে তবে, যারা বুদ্ধি দিয়ে সব কিছুকে দেখতে চেষ্টা করেন, নতুন সাক্ষাতে বিচার করেন ভাল মন্দ। তারা যদি সৎ না হন কিংবা সত্যে সন্ধানী না হন তাহলে তাদের কবিতা আমরা চাই না। যে ব্যক্তি সৎ নয়, সত্যকে মিথ্যা দিয়ে ঢেকে রাখতে ভালোবাসে, মানুষের ব্যথা বেদন অনুভূতিকে শিল্পিত রূপ দিতে পারলেও তার কবিতা না লেখাই ভাল। এটা এই জন্য যে, তারা প্রকৃত কবি না, তারা হলেন শিক্ষিত লেখক। সত্যের সলতে সব সময় তৈলাক্ত, মিথ্যের ভেতর সলতে বলতে কিছু নেই। কাজেই সত্যের পথে না থাকলে কারো পক্ষে আলো জ্বালানো সম্ভব নয়। কবিতার ভেতর লাভ ক্ষতির স্পষ্ট অস্পষ্ট গন্ধ পাওয়া গেলে কবিতা না হয়ে সেগুলো হয়ে যায় মোলায়েম বক্তৃতা। পৃথিবীর একটি মাত্র সত্য দিয়ে একশটি কবিতা লেখা সম্ভব কিন্তু একশোটি মিথ্যে দিয়ে একটিও কবিতা লেখা সম্ভব না। চাঁদ সত্য, তাই জ্যোৎস্নাও সত্য। এই একটি সত্যের উপর দাঁড়িয়েছে হাজারো কবিতা। কিন্তু কেউ যদি বলেন সুবিশাল অট্টালিকা বানিয়ে কোটিপতি এক ব্যবসায়ী তার বাড়ির ছাদে ইলিশ মাছ চাষ করছে। এই বিষয়টি নিয়ে কে কবিতা লিখবে বলুন? এক পেয়ালা চায়ের দাম যদি হয় এক লক্ষ টাকা, তাহলে তাকে কবিতাতে না আনাই ভাল। থাকুক এমন খবর ধনীদের বায়োগ্রাফিতে মাদুর বিছিয়ে। ‘এক পেয়ালা চায়ের মত শরত ফুঁড়িয়ে যাবে, বঁধু তবু তুমি আমারই রবে’ এমন ছত্র কোটি টাকার চায়ের পেয়ালা দেখে কোনদিনও লেখা সম্ভব হবে না। কবিতা লিখতে গেলে প্রথমে আত্মার সন্ধান করতে হবে। যেখান থেকে আসবে বেগ, আসবে শক্তি। যিনি আত্মাকে না খুঁজে শুধু রূপ দেখে বলেন ‘সুন্দর’, তিনি বুঝবেন না কবির এই বাণী।
‘তুমি দেখিতে যদি গো আপন রূপের আলো, আমারে ভুলিয়া নিজেরে বাসিতে ভালো’ – কাজী নজরুল ইসলাম।
এখানেই সকলেই কবি না কথাটা উঁকি দেয়। যিনি কবি তিনি নদীকূলে দাঁড়িয়ে দেখেন সমুদ্রতট। মরুভূমিতে হারিয়ে খোঁজেন নারকেল ছায়া। নৈর্ব্যক্তিক কিংবা মানবপ্রকৃতি কোথাও নেই তার চলাচলে বাঁধা। যিনি কবি তিনি বর্ণ বৈষম্য মানেন না। ধর্মের কাছিতে বেঁধে রাখেন না নিজেকে। বাঁধা নিষেধের পাঠশালা থেকে বেরিয়ে তিনি হয়ে যান বাঁধনহারা। কবির মনোদৃষ্টি ইহকালে দাঁড়িয়ে দেখে চিরকালের ছায়া আবার মহাকাল থেকে নিয়ে আসেন চেনা অজানা তিলোত্তমা। একজন কবি যা কল্পনা করেন তা নিয়ে তৃপ্ত থাকেন বলেই বিশ্বাসে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন। এই বিশ্বাস না থাকলে ষোল আনাই বৃথা। কবি হয়তো কবিতার পাতায় ভূগোলের কথা লিখবেন না তবুও গোলের সাথে থাকবে তার গড়াগড়ি। তিনি হয়তো ইতিহাসের গায়ে দেবেন না সুইফোটা তবুও এঁকে যাবেন অনাদিকালের ইতিবৃত্ত। আজকাল বিশ্বাসের বড় অভাব, তাই হয়তো কবিদের এত আকাল। লেখেন তো অনেকে তবুও ‘সকলেই কবি না। কেউ কেউ কবি’।
কবিতা আকাশের নিচে আর একটি বহমান আকাশ। হৃদয়ের ভেতর ডুবে যাওয়া হৃদয়। কবিতাই মানুষ, মানুষ মানেই কবিতা।

