মামা

মামা - the Bengali Times
নিজ বয়সের চাইতে সিনিয়র একজন বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার

নিজ বয়সের চাইতে সিনিয়র একজন বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। এমন সম্পর্ক হয় হাতে গোনা কয়েকজনের সাথে; কন্যার সাথে বাবার, মায়ের সাথে ছেলের বা মামা ভাগ্নের। অনেকের সারা জীবনেও জোটে না এমন মানুষ।

খুব খোলামেলা সিনিয়র বন্ধু যদি না থাকে, তবে মুরুব্বীদের চাহিদা, মনের কথা বুঝতে খুব বেগ পেতে হবে। তা হলে হয়তো উনার ঐ বয়সে পৌঁছুতে হবে।

- Advertisement -

মামা ছিলেন স্পেশাল।

বাংলাদেশে থাকা আমার নিজ পরিবারের চাইতেও বেশি যোগাযোগ হতো। শুরু হতো রসিকতা দিয়ে, এরই মধ্যে চলতো অনেক সিরিয়াস ব্যাপার, অনেক জটিল কথাবার্তা। যেগুলোর কিছু কিছু উনি তাঁর কাছের মানুষের সাথেও শেয়ার করতেন না। এমনটা মা-বাবার সাথেও হয়; দেখা যায় মা/বাবা তাঁর কোনো একটা সন্তানের সাথে “ঠিক আছে” বলে সায় দিলেও আরেক সন্তানের কাছে একই বিষয় নিয়ে ভিন্ন মত পোষন করেন।

মামা তিনবার কানাডা এসেছিলেন। শেষবার আর তাঁর দেশে ফেরা হলো না।

এদেশে আমার মা’কে আনতে পারিনি।

তাঁর শারীরিক কারনে এখন আর সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। আমি উপায় না পেয়ে মামার দারস্থ হয়েছিলাম। উনি মন প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন তাঁর সেজো বোনের জন্য কাগজপত্র গুছাতে, পারেননি। নুন্যতম সাহায্য না পেলে তাঁর একার পক্ষে সেটা অসম্ভব। মারাত্মক হতাশ হয়ে আমার কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। আমার মা’কে কাছে না পেলেও তাঁর আদরের ভাইকে পেয়েছিলাম।

উনার জীবনে আট-দশটা মানুষের মতো দুঃখ-কষ্টে ভরা ছিল। ভালোবাসা-প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি-ব্যার্থতা; সবকিছুই ছিল। কখনো হতাশ হতে দেখিনি। উনি ঈমানের সাথে বলতেন, “ভাগ্যে যা আছে, সেটাই হবে, সব পূর্ব নির্ধারিত। আল্লাহ যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন।”

ছিলেন খুব অভিমানি। কেও অপমান করলে বলতেন, “করুক, গেলাম না তার বাড়ি!”

.

যাকে ভালোবাসা যায়, তাকে শাসনও করা যায়। মামা’র সিগারেট খাওয়া নিয়ে কতো অপমান করতাম, কাজ হতো কিনা জানি না। তবে অসুখের কারনেই হোক, কমিয়ে এনেছিলেন শুন্যের পর্যায়ে।

এমন মানুষ জীবনে একবারই আসে।

নিজ পরিবার ছাড়া এতটা কাছের মানুষ আর পাইনি। যদিও অসুস্থ হবার পর কানাডায় উনার খেদমত করার সুযোগ পাইনি। তবুও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কয়েকদিন কাছে থাকতে পেরেছিলাম। হস্পিটালে একটা রাত থেকে দেখেছি কি তার কষ্ট! মহান আল্লাহ তায়ালা  তাঁকে নিয়ে গিয়ে ভালো করেছেন। তাঁর কষ্ট লাঘব হয়েছে।

কখনও বলবে না “তুমি আসলে অনেক ঘুরবো, টিম হর্টনস এর কফি খাবো, দোকানে যাবো।” মামার সেন্ট আর বডি স্প্রে’র ওপর ছিল আসক্তি। দোকানে গিয়ে আতরের শিশির বোতল খুলে হাতে মেখে পছন্দ হলে চেহারায় দারুণ অভিব্যক্তি ফুটে উঠতো।

তাঁকে গোসল করিয়ে  কাফনের কাপড়ে মোড়ানোর আগে মাখিয়ে দিয়ে এসেছিলাম সুগন্ধি। অনেক করে। তারপর প্রচন্ড ঠান্ডায়, সাদা বরফের ধুধু প্রান্তরের মাটির নিচে তাঁকে শুইয়ে দিয়ে আসলাম স্বার্থপরের মতো!

কি এক ধন হারালাম!

‘প্রত্যেক প্রাণিকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর কেয়ামতের দিন তোমাদের পরিপূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে। তারপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ধোঁকার বস্তু ছাড়া কিছুই নয়।’ (সুরা আল ইমরান, আয়াত : ১৮৫)

 

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles