
গত বছর ঠিক এই সময় সাধারণ কানাডিয়ানদের ভিড়ের মধ্যে মার্ক কার্নির মুখ আলাদা করে চিনে নেওয়া খুব একটা সহজ ছিল না। অথচ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তিনি হয়ে উঠেছেন কানাডার সবচেয়ে আলোচিত ও পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সেই স্বীকৃতিরই আনুষ্ঠানিক প্রতিফলন ঘটেছে দি কানাডিয়ান প্রেস ২০২৫ সালের জন্য তাকে ‘নিউজমেকার অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত করেছে।
কানাডার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের বার্তাকক্ষের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের ওপর পরিচালিত দি কানাডিয়ান প্রেসের বার্ষিক জরিপে বিপুল ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন মার্ক কার্নি। ভোট গণনা তখনও শেষ হয়নি, তার আগেই স্পষ্ট হয়ে যায় ফলাফল। মোট ৯৫ জন ভোটদাতার মধ্যে ৭২ জনই তাদের ভোট দিয়েছেন কার্নির পক্ষে, যা তার প্রভাব ও সংবাদমূল্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার সেচেল্ট থেকে প্রকাশিত দ্য কোস্ট রিপোর্টার-এর সম্পাদক ব্রোনিন বেয়ারস্টো বলেন, “এক বছর আগেও প্রায় সবাই ধরে নিয়েছিল যে কনজার্ভেটিভ নেতা পিয়েরে পয়লিয়েভরই হবেন কানাডার পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু মার্ক কার্নির উত্থান পুরো রাজনৈতিক দৃশ্যপটই পাল্টে দিয়েছে।” তার মতে, ২০২৫ সাল কানাডার রাজনীতিতে যে মোড় নিয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কার্নি।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর পদত্যাগের ঘোষণা রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি করে। সেই শূন্যতাই মার্ক কার্নির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পথে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ এনে দেয়। পরবর্তীতে লিবারেল পার্টির নেতৃত্ব নির্বাচনে কার্নির জয়লাভের পর থেকে কানাডার প্রধান কোনো সংবাদ প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া কঠিন, যেখানে কোনো না কোনোভাবে তার নাম জড়িয়ে নেই।
সিটিভি নিউজ ক্যালগেরির ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ডন ওয়াল্টন মনে করেন, পিয়েরে পয়লিয়েভর যেখানে ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানেই সাফল্যের ছাপ রেখেছেন মার্ক কার্নি। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কানাডা বিষয়ে আগ্রাসী অবস্থানকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে কার্নি সক্ষম হয়েছেন। ওয়াল্টনের ভাষায়, “ট্রাম্পের চাপকে তিনি কেবল মোকাবিলা করেননি, বরং সেটিকে নিজের রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করেছেন।”
দি কানাডিয়ান প্রেসের এই জরিপে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন টরন্টো ব্লু জেসের তারকা বেসবল খেলোয়াড় ভ্লাদিমির গুয়েরেরো জুনিয়র। তবে তার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল মাত্র আটটি, যা কার্নির সঙ্গে ব্যবধানকে আরও স্পষ্ট করে। তৃতীয় স্থানে রয়েছেন ধর্মঘটরত শ্রমিকরা। এয়ার কানাডার ফ্লাইট অ্যাটেন্ড্যান্ট, আলবার্টার শিক্ষক এবং পোস্টাল কর্মীদের ঘিরে দীর্ঘ এক বছর ধরে চলা শ্রম অসন্তোষ কানাডার সামাজিক ও অর্থনৈতিক আলোচনায় বড় জায়গা করে নেওয়ায় তারা এই অবস্থানে উঠে এসেছেন।
জরিপে চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছেন যথাক্রমে অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড এবং আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েলে স্মিথ।
সব মিলিয়ে দি কানাডিয়ান প্রেসের এই নির্বাচন শুধু একজন ব্যক্তিকে সম্মান জানানোর বিষয় নয়, বরং এটি ২০২৫ সালে কানাডার রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে কারা এবং কোন ঘটনাগুলো ছিল তারই একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। সেই চিত্রের মধ্যমণি হয়ে উঠেছেন মার্ক কার্নি, যিনি অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে দেশের রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

