-11.7 C
Toronto
বুধবার, জানুয়ারী ২৬, ২০২২

ছেলেটারে বেশি, না মেয়েটারে?

- Advertisement -
ছবি/ নাথান ডুমলাও, আনপ্লাশ

বিকালে বাসায় ফিরে দেখি চারদিক হরতালে পল্টন এলাকার মতো থমথমে অবস্থা। যেকোনো দিক থেকে জর্দার কৌটা উড়ে এসে চান্দি ফাটাতে পারে। মাঝে মধ্যে দু-একজন পথচারী চিন্তিত মুখে বারান্দা দিয়ে বাথরুমে ঢুকছে, বেরুচ্ছে। বিরোধী দলীয় নেত্রী তার কার্যালয় থেকে বের হয়ে এসে গম্ভীর মুখে আমার হাতে চা ধরিয়ে দিলো। পাশে বসে কাপে নিঃশব্দে চুমুক মেরে বলল- সংসারেও দলাদলি শুরু করছো?

– কী করছি?

- Advertisement -

– বাচ্চাকে কী শিখাচ্ছ? আমি না কি বিত্ত’কে পঁচাত্তর পার্সেন্ট আর দখিনা’কে পঁচিশ পার্সেন্ট ভালবাসি?

– এমনি ইয়ার্কি মারছি

– ভাবছো এইসব বললে দখিনা সারাদিন তোমার গলা ধরে ড্যাডি ড্যাডি করবে?

– মোটমাট হানড্রেড পার্সেন্ট ভালবাসা পুজলেই হলো..

– আচ্ছা, এখন আমি যদি বলি তুমি বিত্ত’কে কত পার্সেন্ট, আর দখিনা’কে কত পার্সেন্ট ভালবাসো; সহ্য করতে পারবা? আমার হিসাব না হয় বাদই দিলাম। সব কিছু নিয়ে মশকরা চলে না। কচি বাচ্চাদেরকে মিস ইনফর্ম করতেছো! ভালবাসা সম্পর্কে তোমার বিন্দুমাত্র ধারণা আছে?

– কেন থাকবে না! এই যেমন তোমার হাতের কাচ্চি!

– এটা ভাল লাগা, না ভালবাসা? ইদানিং আমার খুব সন্দেহ হয় তোমার ব্রেন আসলেই ভালবাসা জিনিসটা ক্যাচ করতে পারে কি না। তুমি মিসফিল্ডিং দিয়ে বারবার ক্যাচ মিস কর। ইতিহাস তো বলে..। তোমার মুখ থেকে খুব জানতে ইচ্ছে করে.. সময় পেলে বইলো তো?

 

ভয়ে ভয়ে চিশতীকে ফোন দিলাম। যদিও সে ভালোবাসা শব্দটা শুনলেই মারতে আসে। শিওর ছ্যাঁকা-ট্যাকা খাইছিলো। আজ মনে হচ্ছে তার মুড ভালো। বললাম- দোস্ত, ভালবাসা আর ভালো লাগার মধ্যে পার্থক্য কী রে?

– ঐ একই.. ভালো লাগা যখন খুব বেশি হয়ে এডিক্টশন পর্যায়ে চলে যায়; সেটাই তখন ভালবাসা

– মানে?

– এই ধর তুই শিশির বেকারিতে ঢুকছিস। অর্ডার দিছিস; মোগলাই ভাজার প্রস্তুতি চলছে। আটা ছানা হচ্ছে, কিমা, পিঁয়াজ আর বিটলবণ ছিটায়ে দুইটা ডিম্ দিয়ে ভাঁজ করে মেঝেতে মাদুর পারার মতো গরম তাওয়ার তেলে ওটা ছেড়ে দিলো। উল্টিয়ে পাল্টিয়ে ভাজার পর মোগলাইটা তেল নিংড়িয়ে নয় ভাগ করে তোর সামনে সার্ভ করলো; আরেক দফা বিটলবণ আর মিষ্টি শসা কুচি দিয়ে। তুই মুগ্ধ হয়ে দৃশ্যটা দেখছিলি। এই দেখার অনুভুতিটাই হলো ভাল লাগা। আর তুই যখন মোগলাইয়ের গরম বাষ্প নিঃশ্বাসে টেনে নিয়ে, আমড়ার টকে চুবায়ে চুবায়ে কাঁটা চামচ দিয়ে জিনিসটা মুখে পুড়ে চিবাবি, সেইটা হইলো ভালবাসা! তুই না মোগলাইয়ে আসক্ত?

– ফ্যান্টাস্টিক! আর প্রেম?

– প্রেম আলাদা। মাঠে বসে ফুচকা খাওয়া, ঘাস ছিড়া আর প্রেমিকার হাত দেখার নাম করে হাত দলাই-মলাই করা হলো প্রেম। সেক্সচুয়াল আকর্ষণ। ভেবে দেখ, চেনা নাই জানা নাই এক মেয়ের সাথে দেখা হলো, গায়ে টোকা লাগতেই প্রেম হয়ে গেলো? তাকে ছাড়া বাঁচবি না? এতো সস্তা? সারা রাত না ঘুমায়ে বালিশ ছেনবি, এপাশ ওপাশ করবি, সুচিত্রা সেনের মতো একা একাপাগলের মতো হাসবি..। এইটা কেন হয় জানিস?

– কেন?

– হরমোনের কারণে। কেমিক্যাল রিএকশন। তারপর এক দুই বছর যাক, বুঝবি ঠ্যালা। দেখবি প্রেম কারে কয়! কত ডালে কত বড়ি..। তুই তোর বাচ্চাদের ভালবাসিস?

– বাসি

– ছেলেটারে বেশি, না মেয়েটারে?

– সমান সমান

– হাসাইলি..। মা ছেলেরে বেশি ভালবাসে, না মেয়েকে?

– ছেলেকে

– তাইলে? কারণটা বুঝিস? ছেলে বিপরীত লিঙ্গের তাই। তাই বাপও বেশি ভালবাসে তার মেয়েকে

– বুঝছি

– আন্ডা বুঝছিস। দেখি তো কী শিখলি; উদাহরণ দে

– এই ধর, শাহীন বেকারিতে জিলাপি ভাজা হচ্ছে। কাঠি দিয়ে তুলে রসে চুবাচ্ছে। এই দৃশ্যটা হলো ভালো লাগা। আর গরম জিলাপি আর গরম কলিজার সিঙ্গারায় যখন কামড় দিয়ে মুখ পুড়ায়ে ফেলবো; সেইটা হলো ভালবাসা!

– হইছে। আচ্ছা রিপন, তুই আমাকে কেমন পছন্দ করিস?

– বেশি না

– গুড! সত্যি বললি শুনে ভালো লাগলো। ভালবাসিস?

– হু

– সাব্বাস! এইতো ক্লীয়ার। আমাকে তুই পছন্দ করিস না, অথচ ভালবাসিস। ভেরি ইন্টারেষ্টিং! এবার ফোন রাখ, আমার কাজ আছে।

 

আমার নরওয়েজিয়ান বন্ধুর ফোন- কাহা ক্যাম্বা আছো?

– আছি.. আল্লাহ’য় রাখছে। তোর খবর কী?

– আমি এই আছি এই নাই..

– আবার কী হইছে?

– মরতে নিছিলাম..

– মানে?

– প্যাটে গ্যাস কাহা.. ফুইলি এমুন চাপ মারেছে, কি আর কবো.. প্রিসার-মিশার ইউটি এক্কেরে শ্যাষ..

– কত উঠছিল?

– নিচিরডা একশো দশ, উপরিরডা একশো পঁয়ষট্টি

– বলিস কি রে! ওষুধ শুরু করছিস?

– এ দ্যাশের ডাক্তার.. কইছে আরও দেকপি। ইরা তু আর বাংলাদিশির ডাক্তার না, যে সর্দি লাগলি ভয়ে এন্টিবায়োটিক দিয়ি কবি, “রিস্ক নিয়ার দরকার নাই”। শালা.. মইরিও গেলো, মাইরিও গেলো। কী আর কবো। হাটাঁহাটি করছি, জীমে যাচ্ছি। জীমে যাওয়া ছাইরী দিবো কাহা..

– কেন!

– ভাল্লাগে না; ব্যায়াম করবো, না এদিক ওদিক দ্যাকপো?

– ওয়াস্তাগ ফিরুল্লাহ.. তা কী খাইছিলি?

– চানাচুর। বাংলাদেশ থিকি এক লোকরে দিয়া আনাইছিলাম আধ মন। দুইশ ইউরো খরচ কোইরি। তিন বেলা সাটাতাম। ইস্পিশাল ডবল বাদাম আর ঝাল দি অর্ডার করা। খালি পারি চোক-মুক-নাক দি ঝর্ণা পৈত্ব। বেশি স্বাদ ভালো না কাহা..। সঙ্কট এখনো যাইনি গো। ভুল কোইরি থাকলি মাপ দিও.. দোয়া ঠুইকি দিয়ো..

– মরার আগে তোর যত সব আবোল-তাবোল কথা.. তুই রেস্ট নে; আবার কথা হবে।

 

ফোন রেখে আমি একটা দাঁতাল হাসি হাসলাম কান পর্যন্ত।

উত্তর পেয়ে গেছি সেলুকাস!

ঘুমানোর আগে গিন্নির হাতে একটা ফার্স্ট ক্লাস চা ধরিয়ে দিয়ে বললাম, এই যে ধরো। তোমাকে চা দিলাম; খেলে ভালো লাগবে

– আর ভালবাসা

– ভালোবাসা হলো চানাচুর

– মানে?

– এই ধরো, টানা এক সপ্তাহ তিন বেলা স্পেশাল চানাচুর খেয়ে যাচ্ছি; ডবল বাদাম, ত্রিপল ঝাল দেওয়া। এডিকশন পর্যায়ে চলে গেছে। এইটা হলো ভালোবাসা

– তারপর?

– তারপর আর কি, শুরু হবে নিউটনের তৃতীয় সূত্র! রিএকশন! পেটে গ্যাস, বদহজম, হাই প্রেশার, অরুচী..। ভালোবাসা খুব খারাপ জিনিস!

খুব খারাপ!

ঠিক কিনা!

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles