জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে রবীন্দ্রনাথের জন্ম

জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে রবীন্দ্রনাথের জন্ম - the Bengali Times
কর্মক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ বহুজনের সংস্পর্শে এসেছিলেন বিশেষত ১৯১৩ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভের পর তিনি যখন খ্যাতির উত্তুঙ্গে আরোহণ করেন তখন পরিচিত ভক্ত অনুরাগীর ও বন্ধুর সংখ্যা অগণিতভাবে বৃদ্ধি পায়

আমাকে যদি কেউ বলে,সাগরের গভীরতা কিংবা আকাশের অসীমতা নির্ণয় কর, আমি কী বলবো? আমার পক্ষে কি সম্ভব তা নির্ণয় করা? আজকে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখতে বসে আমার ভেতর সে ধরনের একটি অনুভূতি কাজ করছে। এই লেখার স্বল্পপরিসরে আমি কী করে রবীন্দ্রনাথকে তুলে ধরবো?

 

- Advertisement -

১৮৬১ সালের ৬ই মে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে রবীন্দ্রনাথের জন্ম। বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মা সারদা দেবীর ১৪ জন সন্তানের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ৯ম সন্তান। তাঁর জীবন কেটেছে স্কুল শাসনের বাইরে। বহু স্কুল পরিবর্তনের পর রবীন্দ্রনাথ যখন কোনো স্কুলে টিকতে পারলেন না তখন রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরমা পরিবারের সবাইকে নিয়ে সভা করেন। কী করা যায় রবিকে নিয়ে, তখন পরিবারের সবার সিদ্ধান্তে সিদ্ধন্ত নেয়া হলো রবীন্দ্রনাথ বাড়িতেই পড়াশুনা করবেন। তাঁর জন্য বাড়িতে আসবে বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক। একটা বশিাল অট্টালিকার কোণের এক ঘরে নিজেকে বন্দি রেখে তিনি চালিয়ে যান তাঁর সাহিত্য চর্চা। তাঁর রচিত জীবনস্মৃতি, ছেলেবেলা ইত্যাদি গ্রন্থে তিনি এই বন্দিত্বের বিস্তারিত বিবরণ দান করেছেন। নিজের ভাষায় তিনি নিজেকে বলেছেন কুনো, একলা, একঘরে, সমাজের নিয়ন্ত্রণের অতীত, স্কুল শাসনের বাইরে। তাঁর দিন কেটেছে শহরের মধ্যে কিন্তু শহরবাসীর মধ্যে ঘুরে বেড়াবার যে স্বাধীনতা থাকে তাঁর তা ছিল না।

 

কর্মক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ বহুজনের সংস্পর্শে এসেছিলেন। বিশেষত ১৯১৩ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভের পর তিনি যখন খ্যাতির উত্তুঙ্গে আরোহণ করেন, তখন পরিচিত, ভক্ত, অনুরাগীর ও বন্ধুর সংখ্যা অগণিতভাবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু তা সত্তে¡ও সাধারণ মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠতার অভাব তাঁকে ব্যথিত করেছে। পরিণত বয়সে তাই তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘জন্মকাল থেকে আমাকে একখানা নির্জন নিঃসঙ্গতার ভেলার মধ্যে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। তীরে দেখতে পারছি লোকালয়ের আলো, জনতার কোলাহল, ক্ষণে ক্ষণে ঘাটেও নামতে হয়েছে, কিন্তু কোথাও জমিয়ে বসতে পারিনি। রশি যতবার ডাঙার খোঁটায় বেঁধেছি টান মেরে ছিড়ে দিয়েছে ।  বাইরের পৃথিবীর জন্যে, বিপুল সুদূরের জন্য, তাঁর মনে ছিল সীমাহীন ব্যকুলতা। রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘ পয়ষট্টি বছর ধরে সাহিত্য সাধনার কালে তিনি মোট গান রচনা করেছেন ২২৩০টি। তার মাঝে রয়েছে, প্রেম, পূজা, প্রকৃতি ও স্বদেশ পর্যায়ের গান। পরবর্তী সময়ে তাঁর অনেক কবিতাও গানে পরিণত হয়। সতের বছর থেকে উনিশ বছর বয়সে তিনি প্রচুর প্রেমের গান রচনা করেন। তার মধ্যে, ‘সখী ভাবনা কাহারে বলে, সখী যাতনা কাহারে বলে, ভালোবেসে যদি সুখ নাহি’। এ সমস্ত গানের মাঝে তিনি প্রেমের বিভিন্ন ধারাকে তুলে ধরেছেন। মাত্র উনিশ বছর বয়েসে তিনি ‘মায়ার খেলা’ গীত নাট্যটি রচনা করেন। মায়ার খেলা গীতি নাট্যতে ‘না বুঝে কারে তুমি ভাসালে আঁখির জলে’, এটিও একটি ব্যর্থ প্রেমের গান। মাত্র সতেরো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের প্রথম কবিতা গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। ১৮৯৩ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত তিনি সাতটি কবিতার বই লেখেন। তার মধ্যে ‘সোনারতরী’ এবং ‘ক্ষণিকা’ বই দুটোও রয়েছে। এই সাতটি বই প্রকাশের পর তাঁকে বলা হতো বাঙালি শেলী। ১৯০১ সালে তিনি বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯২১ সালে তা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়। বিচিত্র ধরনের রচনার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বলোকের সৌন্দর্য, শিশুর প্রতি ভালোবাসা, ঔপনিষদিক পরম অরুপ ও ঈশ্বরের উপস্থিতি প্রকাশ করেছেন এবং পশ্চিমের কাছে এদেশ ও মানুষকে উপস্থাপন করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মরমী কাব্য গীতাঞ্জলি প্রকাশের পর ইউরোপ ও আমেরিকায় তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। কবি ইয়েটস গীতাঞ্জলি কাব্যটির ভ‚মিকা লিখে তা প্রকাশ করেন। গীতাঞ্জলি লিখে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেন। নোবেল পুরষ্কারের টাকা দিয়ে তিনি তার বিকল্প শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন, যার নাম ‘শান্তিনিকেতন’। কলকাতা থেকে নব্বই মাইল দূরে। তাঁর বিভিন্ন গানে ও কবিতায়ও স্বদেশপ্রেম সুদৃঢ়ভাবে জেগে আছে। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডরে পরে বৃটিশদের দেয়া ‘নাইট’ উপাধি তিনি প্রত্যাখান করেন। তারপর তিনি রচনা ক

রেন ‘চিত্ত যেথা ভয় শূন্য, উচ্চ সেথা শির’ এবং ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলরে।’

 

১৮৮৩ সালে রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করেন মৃণালিনী দেবী রায়চৌধুরীকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বৌদি কাদম্বিনী দেবী যাকে তিনি নতুন বৌঠান বলে ডাকতেন। তিনি ছিলেন তাঁর কবিতা ও গানের একনিষ্ঠ শ্রোতা ও সাথী। নতুন বৌঠানকে সামনে বসিয়ে রবীন্দ্রনাথ অনেক কবিতা ও গান রচনা করেছেন। রচনা শেষে তিনি তাঁর বৌঠান কাদম্বিনী দেবীকে তা পড়ে শুনাতেন। ১৮৮৪ সালে ১৯শে এপ্রিল মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে কাদম্বিনী আত্মহত্যা করেন। বৌদি কাদম্বিনীর মৃত্যুর পর তিনি রচনা করেন ‘আমার প্রাণের পরে চলে গেল কে বসন্তের বাতাসগুলির মত’ এই গানটি। রবীন্দ্রনাথ যখন কবিতা ও গান লিখেছেন সে গান ও কবিতা মাতিয়ে দিয়েছে এপার বাংলা ও ওপার বাংলার মানুষকে। বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব স্বাধীনতা লাভে অনুপ্রাণিত করেছে এবং তাঁর রোমান্টিকতা, দেশের ভালোবাসায় জাগ্রত থাকার গানগুলো এখনো বাংলাদেশের মানুষের মনোলোকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত। রবীন্দ্রনাথের প্রভাব দুই বাংলায় তার জীবদ্দশাতেই বিপুল ছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নিজেকে কখনো গুরুদেব মনে করেননি। কিন্তু বাঙালির মন রবীন্দ্রনাথকে সন্ত পুরুষ ও গুরুদেব বানিয়ে তোলে। ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ ইহলোক ত্যাগ করেন ৮০ বছর বয়সে, পেছনে রেখে যান তার হাজারো গান ও কবিতা ও অসংখ্য বিভিন্ন রচনা যা বাঙ্গালী জাতিকে বাঙলা সাহিত্যকে চিরজীবিত রাখবে। যতদিন পৃথিবীতে বাঙালি বেঁচে থাকবে, ততদিন রবীন্দ্রনাথ থাকবেন তাদের প্রাণে, মননে ও সাহিত্যে।

 

ম্যাল্টন, কানাডা

- Advertisement -
পূর্ববর্তী খবর
পরবর্তী খবর

Related Articles

Latest Articles