
নদীর হাত থেকে পান নিয়ে শামসু মিয়া উলটে পালটে দেখে। না চাইতেই আজ পান কেন? একবার ভেবেছিল নদীর হাতটা কিছুক্ষণ আলতো করে ধরে রাখবে অথবা নিজের একটা হাত রেখে দেবে নদীর কোলের ওপর। কিন্তু শামসু মিয়া সাহস পায় না
এসব করতে যে সাহস লাগে সেটা তার নাই। শরীর ভাল হলে শরীরে শরীরে বন্ধুত্ব হতো। যে জিনিষ দেবার মত নয় সেটা উপহার দেবে কি করে। তাই নিজের কাছেই বর্গা রাখে নিজের শরীর।
যতটুকু সম্ভব কর্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। পেশায় সে একজন বর্গা চাষি। নরম মাটিতে হাত গুঁজে বীজ বুনে। তারপর সেই বীজ থেকে চিকন পাতার ধান বেরিয়ে আসে। নদীর কাছে সে ধান চায়। সবুজ চিকন ধান। অথচ তার জমি আছে বলে দাবি করতে পারে না সে।
ছোট্ট একটি বরযাত্রীর দল নিয়ে একদিন শামসু মিয়ার মা গিয়েছিল ছেলের বিয়ে করাতে। কন্যার নাম লতা। লতার সাথে বিয়ে হলে নদীকে কখনো পেত না শামসু মিয়া। লতার ডান পা ছিল একটু খাটো। ব্যাপারটা আগে চেপে রাখা গেলেও বিয়ের দিন ধরা পরে যায়। পায়ে গলদ এমন মেয়ের সাথে বংশের বড় ছেলের বিয়ে দেওয়া যায় না। তাই লতার সাথে বিয়ে হয় না শামসু মিয়ার।
বিয়ে ভেঙ্গে চলে যাবার পথে নদীকে দেখে ফেলে শামসু মিয়ার মা। সামান্য আলাপ-আলোচনার পর বিয়ের পুরো অনুষ্ঠান চলে আসে নদীদের বাড়ি। চাচাতো বোনের বদলে পাল্কীতে হেলে-দুলে নদী এলো শামসু মিয়ার বউ হয়ে।
প্রথম প্রথম ব্যাপারটা নদীকে অবাক করতো, খেলার সময় খেলা বলে কিছু ছিল না, শুধু ঘোমটা দিয়ে বসে থাকা। আম গাছটা দেখে লোভ হত, অথচ গাছে ওঠা ছিল বারণ। পুকুরে যেত হতো শাশুড়ি পেছন পেছন। বিয়ের পর একগাদা নিষেধের জালে আটকে যায় নদী।
শামসু মিয়া কালিজিরা বাটা দিয়ে ভাত খায়। রসুন কুচি সরিষার তেলে ডুবিয়ে বুকে মালিশ করে। তার গায়ে সারাক্ষণ ধান-দুব্বার গন্ধ। প্রায়ই অসুস্থ থাকে। শ্বাস নেয় টেনে টেনে। বয়স যত তার থেকেও বেশি মনে হয়। কোথাও একটুখানি বসতে পারা মানে যেন বিরাট বিশ্রাম।
এক বিকেলে এমনি করে নিজ ঘরে বসে শামসু মিয়া বিশ্রাম নিচ্ছিল। নদী ভেবেছিল সুযোগ পেলে বাপের বাড়ি যাবার কথা বলবে। এই বাড়িতে শুধু শাকপাতা আর ছোট ছোট মাছ খেতে হয়। গরীব হলেও নদীর মা মাঝেমধ্যে মুরগি রান্না করতো। কাঁচামরিচ দিয়ে রান্নাকরা মুরগীর ঝোল আর চালের রুটি খেতে ইচ্ছে করে তার। বন্ধুদের বাড়ি গিয়ে পা ঝুলিয়ে গল্প করতে মন চায়। কবে যাবে মায়ের বাড়ি ভাবতে ভাবতে একটা সাজানো পান তুলে দেয় স্বামীর হাতে। তা হটাৎ ‘শামসু মিয়া’ এই ডাক শুনতেই নদীর স্বামী জবাব দেয় ‘আসছি আব্বা’।
অনেকক্ষণ পান হাতে বসে থাকে নদী। সে জানতে চেষ্টা করে কিসের এত কথা, কাকে নিয়ে কথা। উঠানে কাউকে দেখা যায় না। ঐদিকে বড় ঘরের দরজা বন্ধ। নদীর ননদ বাইরে বসে ভেতরের মানুষদের পাহাড় দিচ্ছে।
একটু পর পুলিশ এলো বাড়িতে। বাড়ির কুকুরটিও এলো পুলিশের পিছে। দেখে মনে হল, হটাৎ পুলিশ আসার কী কারণ সেটা জানার আগ্রহ ‘পাঠান’ নামের এই কুকুরটির সবচেয়ে বেশি। সবার দিকে সে মুখ উঁচিয়ে চেয়ে থাকে। শামসু মিয়া পাঠানের দিকে তাকাবার সময় পেল না। নদীর কাছ থেকে বিদায় নিতে ঘরের ঢুকে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো। এই বিদায়ের কোন মানে বুঝতে পারে না নদী। একটা পাঞ্জাবী আর লুঙ্গি তারের উপর ঝুলানো ছিল সেগুলো টেনে নিয়ে শামসু মিয়া ঘরের বাইরে বের হতেই হাতকড়া পরিয়ে দেয় পুলিশ।
তিনদিন পর নদীর শ্বশুর এলো মাথা নিচু করে। পাঠানও এলো পিছে পিছে। নদীর শ্বশুরকে দেখে বোঝা গেল সারাদিন বেশ খাটাখাটি গেছে, হয়তো খাওয়া হয়নি কিছু। নদী একটা গামছা এগিয়ে দিল। গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে নদীর শ্বশুর বলল; ওরে চালান দিয়া দিছে।
চালান কি জিনিষ সেটা নদীর বোঝার কথা নয়। স্বভাবতই তার আগ্রহ বাকি কথা শোনার। শ্বশুরকে প্রশ্ন করায় ধমক খায় সে। তাকে ঘরের গিয়ে বসতে বলে শাশুড়ি।
নদীর ঘরে বসে ছিল তার ননদ পারুল। মাকে ঢুকতে দেখে পারুল চলে গেল বাবাকে অজুর পানি দিতে। দরজার খিল এঁটে নদীর শাশুড়ি বলল শোন বউ; যে কথা বলবো কাকপক্ষীও যেন টের না পায়। কেউ জানতে পারলে গলা টিপা মাইরা আম গাছের সাথে ঝুলাইয়া রাখবো। আমার ছোট ছেলে মজনু এখনো বিয়াশাদী করে নাই। ওর এমন কি বয়স! সংসারের আয় রোজগার এখন তার হাতে। রাগের মাথায় একটা খুন কইরা ফেলাইছে। এখন কি তারে জেলে গিয়া মরতে কও?
তোমার স্বামী এমনিতে ব্যারাইম্মা মানুষ। শ্বাসের রোগী। তাই মজনুর বদলী শাস্তি খাটনের লিগা শামসু মিয়ারে আমরা রাজী করাইছি। ছোট ভাইয়ের বিপদে বড় ভাই আগাইয়া আসবে এইটাই স্বাভাবিক। মেম্বর কইছে সে নিজে সাক্ষী দিয়া কইবো শামসু রাগ সামলাইতে না পাইরা উত্তরপাড়ার মোশারফের মাথায় দুই-চারটা বাড়ি দিছে। মজনু এই ঘটনার কিছুই জানে না খুন করছে শামসু।
নদী বলল, আম্মা আপনার বড় ছেলের তো কোন রাগ নাই।
শাশুড়ি বলল চুপ কর। যা কই মন দিয়ে শুন। মজনু ঘটনা স্থানে ছিল না, সেখানে ছিল তোমার স্বামী। এই কথা পুলিশে লিখা নিছে। চেয়ারম্যান মজনুরে দিয়া খুন করাইলে কি হইবো, এখন সেও চেষ্টা করতাছে ছাড়াইয়া আনতে। পারলে ভাল, না হইলে দশ বারো বছরের বেশি সাজা হইবো না। ততদিন বাইচা থাকলে আবার তোমাগো স্বামী স্ত্রীর দেখা হইব। বাকি আল্লাহর ইচ্ছা। এই বদলী আসামীর কথা কিন্তু কাউরে কইবা না। তোমার বাপের বাড়ির কেউ যেন না জানে।
ঘাটের মত আর হাটের মত বদলাতে থাকে নদীর জীবন। একে একে সংসারের সব দায়িত্ব এসে নদীর উপর পড়তে থাকে। শ্বশুর হার্ট এট্যাকের পর বিছানা নেয়। শাশুড়ির হয় বাতের টান। মজনু বিয়ে শাদী করে না। চেয়ারম্যানের দেয়া টাকায় বাজারে চায়ের দোকান দিয়ে ব্যবসা চালায়। বড় ভাইয়ের স্ত্রীর জন্য তার খুব মায়া। কিছুটা ঘরকুনো হয়ে যায় মজনু। দোকান আর বাড়ি ছাড়া অন্যকিছু বুঝে না। আগে যেমন জামার বোতাম খুলে গ্রামের মধ্যে ঘুরে বেড়াতো এখন হয়েছে তার উল্টো।
পারুলের বিয়ে হয় অ্যামেরিকা প্রবাসী ছেলের সাথে। সে চলে যাবার পর নদীর সাথে কথা বলার লোক থাকে না। ধীরে ধীরে পুরাদস্তুর গৃহিণী হয়ে যায় সে। ঘরকর্তা নেই তবু বাড়ির বড় বউ। মজনু দু’চারটা কথা বলে তাই মুখবোজা হয়ে বসে থাকতে হয় না। মাঝে মাঝে হাসির গল্পও করে মজনু। একবার বলেছিল চল আজ নদীর পার থেকে ঘুরে আসি, হেঁটে গেলে বিশ মিনিট। অনেকক্ষণ চুপ থেকে নদী বলেছিল, যদি যাই সমুদ্রে যাব। ঢেউ ভাঙা দেখবো।
নদীর বাবা কয়েকবার এসেছিল নদীর সাথে দেখা করতে। একবার ওর মাকেও সাথে করে এনেছিল। তবে নদীর পক্ষে আর নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়া হয় নি। ওর চাচাতো বোন লতার বিয়ে হয়েছিল নিজ গ্রামের একজনের সাথে। কিন্তু সন্তান জন্ম নেবার পর তালাক চক্রে এখন বাপের বাড়ি এসে থাকছে। চার বছরের মেয়েটিও থাকে লতার সাথে।
শাশুড়ির পায়ে গরম তেল মেখে নদী যায় শ্বশুরের কাছে। চিলমচি এগিয়ে দিয়ে আঁচল টেনে দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রতিদিন করল্লার ঝোল রান্না করে খাওয়াতে হয় শ্বশুরকে। প্রস্রাবের সাথে করল্লার গন্ধ ছড়িয়ে পরে চিলমচির ভেতর। এই হল বড় বউয়ের সংসার। একমাত্র মজনুর হাত দিয়েই ভালোলাগা, ভাল থাকার টুকটাক স্বপ্ন পূরণ হয়। মাঝে মাঝে নতুন শাড়ি চুড়িও পায়। কখনো কখনো বাদামের খোসা পড়ে থাকে ঘরের মেঝেতে।
শামসু মিয়া খালাস পাবে কি না কেউ বলতে পারে না। হয়তো আরো দু’বছর লেগে যেতে পারে, তাও ঠিক নেই। এরই মধ্যে তাকে একবার জেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সে সময় নদীকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল স্বামীর কাছে। স্বামীর চেহারা তার মনে পড়ে না। অনেক বদলে গেছে শামসু মিয়া। বিয়ের পর ছিল একরকম, তখনো খুব বেশি দেখেছে বলে মনে হয় না। বেশির ভাগ দেখা হতো রাতে রাতে। দূরদূরান্তে গিয়ে ধান কাটার বায়না নিতো বলে কখনো সপ্তাহ পেরিয়ে বাড়ি আসতো।
নদীর ননদ আমেরিকা থেকে এক বান্ধবীর ছবি পাঠিয়েছিল। বান্ধবীর বয়স ছিল ত্রিশ বছর অথচ তখনো বিয়ে করে নি মেয়েটা। বিয়ের বয়স কত’তে শুরু কত’তে শেষ সে কথা জানে না নদী। সে তার নিজের বয়সও মনে করতে পারে না। বাড়িতে শাশুড়ি ছাড়া আর কোন মহিলা নেই। ঘর বন্ধ করে কাপড় সরিয়ে সে নিজের বয়স আন্দাজ করতে চেষ্টা করে। মজনু বিয়ে করে বউ নিয়ে এলে কথা বলার একটা লোক পাওয়া যেত। তবুও মজনুর বিয়ে নিয়ে কোন উৎসাহ দেখায় না নদী।
দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর চলে গেল। যেদিন পুলিশ নদীর স্বামীকে ধরে নিয়ে যায় যত দূর যাওয়া সম্ভব পাঠানই গিয়েছিল পুলিশের পেছন পেছন। শামসু মিয়া তাকে বলেছিল নদীরে দেইখা রাখিস পাঠান। সেদিন থেকে রাত হলেই পাঠান কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে থাকে নদীর ঘরের সামনে। খাওয়া দাওয়া কোথায় করে কেউ জানে না। দিনদিন ওর স্বাস্থ্যও শামসু মিয়ার মত হয়ে যাচ্ছে, শ্বাস নেয় টেনেটেনে।
নদীর শাশুড়ি আগে বারান্দায় ঘুমত এখন ঘুমায় ভেতর ঘরে। অসুস্থ স্বামীর করল্লার গন্ধ সে মেনে নিয়েছে তাতে উঠান দিয়ে কে কখন কার ঘরে ঢুকে সেগুলো দেখতে হয় না। আগে খুব শক্ত মহিলা ছিল তবে এখন বেশ কান্নাকাটি করে। বিশেষ করে যেদিন নদীর ঘরে থেকে সুবাসি তেলের গন্ধ ভেসে আসে। নিজ মনে কাঁদতে থাকে বলেই কান্নার মাঝে পাপ প্রায়শ্চিত্তের কথাগুলোও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ও বাবা মজনু তুই বিয়াশাদী করবি নারে বাপ, এই বলে সে ডাকতে থাকে মজনু ও মজনুরে… মজনুর মায়ের কান্না ঘরের ভেতর আটকে ঘুরতে থাকে। কেউ সে কথার পাত্তা দেয় না।
এমনিতেই রাত দশটার পর বাড়িতে কেউ জেগে থাকে না। রাত দশটা মানে মজনুদের গ্রামে মধ্য রাত। আজ প্রচণ্ড ভ্যাপসা গরম পড়েছে। বন জঙ্গলের ফুলগুলো সব ঘেমে উঠেছে। আজ গাছের সাথে গাছ দেখা করবে। পানির কাছে ভেঙ্গে পড়বে পানি। মানুষে মানুষে হবে টানাটানি। নিঝুম রাতে নদীর ঘর থেকে সুগন্ধি তেলের ঘ্রাণ ভেসে আসে। পাশ দিয়ে চলে গেল যে ন্যাড়া কুকুরটা আসলে সে বিড়াল। বিড়াল দেখে সময় নষ্ট করার সময় নেই পাঠানের। পাঠান বুঝতে পেরেছে নদী আজ নতুন শাড়ি পড়বে। একটা শাড়ি রাখা আছে বিছানার উপর। নতুন শাড়ি থেকে মাড়ের গন্ধ এসে লাগে পাঠানের নাকে। তার পেটে মোচড় দিয়ে ওঠে সেই গন্ধ। তবুও সে চার পায়ের ওপর উঠে দাঁড়ায় না। শুঁকনো মাড়ের গন্ধ আর খাবারের মধ্যে পার্থক্য সে বোঝে।
চুলে তেল দেয়া শেষ করে নদী নতুন শাড়ি হাতে তুলে নেয়। শাড়ি পরতে পরতে বাইরে তাকিয়ে দেখে উঠান ভরা জ্যোৎস্না। ঘরের দরজা সামান্য খোলা থাকে। যতটুকু জ্যোৎস্না ঢোকা সম্ভব ততোটুক সে ঢুকতে দেয়। বাকিটুকু থাকে ঘরের বাইরে। ধীরে ধীরে রাত বাড়তে থাকে। জ্যোৎস্নাও বাঁক নিয়ে লুকাতে থাকে গাছের ছায়ায়, লতায় পাতায়। এক সময় নদী ভাঙে সমুদ্রের কাছে। গর্জন গর্জন তারপর নীরবে নেমে যায় সমুদ্র সফেন। নদী বিলীন হয় সমুদ্রে।
ক্লান্ত পাঠানের চোখ বুজে আসে। প্রতিদিনের মত ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সে দৌড়াতে থাকে পুলিশের পেছন। শামসু মিয়া তাকে ধরতে চায়। দুই হাতে হাতকড়া তাই শামসু মিয়া পাঠানকে ছুঁতে পারে না। যতোটা সম্ভব পাঠানই গলা বাড়িয়ে দেয়। অস্থির পাঠান পুলিশ ভ্যানের সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্ত হয়ে পরে। আসলে পুলিশের ভ্যান, শামসু মিয়া পুরোটাই স্বপ্ন। পাঠান তখন গায়ে জ্যোৎস্না মেখে গভীর ঘুমে মগ্ন। ঘুমে অচেতন তবুও সুগন্ধি তেল তাকে ভালো লাগার অনুভূতি দেয়।
জ্যোৎস্নার এমনই শক্তি সে বদলে দিতে পারে সবকিছু। একজন খুনিও জ্যোৎস্না রাতে মানুষ হতে পারে।
স্কারবোরো, কানাডা

