
অন্টারিও প্রাদেশিক সংসদে সম্প্রতি পাস হওয়া একটি নতুন আইন এখন প্রদেশজুড়ে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। “রিডিউসিং গ্রিডলক, সেভিং ইউ টাইম অ্যাক্ট” নামের এই আইনটি কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে অন্টারিও সরকার এখন দ্রুতগতিতে হাইওয়ে ৪১৩ নির্মাণ প্রকল্প এগিয়ে নিতে পারবে—যেখানে আর পরিবেশগত পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন বা স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে বাধ্যতামূলক পরামর্শের প্রয়োজন হবে না। সরকারের দাবি, এই আইন ট্র্যাফিক জট কমিয়ে কর্মজীবী মানুষের সময় বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে পরিবেশবিদ, আদিবাসী সম্প্রদায় ও বিরোধী দলগুলোর মতে, এটি একদিকে যেমন পরিবেশের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে, তেমনি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারকে উপেক্ষা করছে।
হাইওয়ে ৪১৩ প্রকল্পটি অন্টারিও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত উন্নয়ন পরিকল্পনা। প্রস্তাবিত মহাসড়কটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৯ কিলোমিটার, যা ইয়র্ক, পিল এবং হাল্টন অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাবে এবং হাইওয়ে ৪০১ ও ৪০০-কে সংযুক্ত করবে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহার করবে প্রায় ৩ লাখ যানবাহন, এবং নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার।
সরকারের বক্তব্য, মহাসড়কটি চালু হলে গড়ে প্রতিদিনের যাতায়াতে ৩০ মিনিট পর্যন্ত সময় বাঁচবে। ব্যবসায়িক পণ্য পরিবহন দ্রুত হবে, যা প্রদেশের অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করবে বলে তাদের আশা।
পরিবেশবিদরা এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, হাইওয়ে ৪১৩ নির্মিত হলে প্রায় ২০০০ হেক্টর কৃষিজমি হারিয়ে যাবে, যা স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনের জন্য একটি বড় ধাক্কা হবে।
এছাড়া প্রস্তাবিত মহাসড়কের পথে রয়েছে একাধিক জলাভূমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল, যেখানে শত শত প্রজাতির পাখি, মাছ ও প্রাণীর বসবাস। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই হাইওয়ে চালু হলে প্রতিবছর অতিরিক্ত ১.৭ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ ঘটবে যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় কানাডার জাতীয় প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী।
বেশ কয়েকজন পরিবেশবিদ বেঙ্গলি টাইমস এর কাছে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তারা বলেন, সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নামে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশ ধ্বংসের পথে হাঁটছে।
এই প্রকল্পে মিসিসাগা অব দ্য ক্রেডিট ফার্স্ট নেশন এবং হুরন–ওয়েনডাট সম্প্রদায় বিশেষ উদ্বেগ জানিয়েছে। হাইওয়ে ৪১৩ তাদের ঐতিহাসিক ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে যাবে, যা তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পূর্বপুরুষদের ভূমির প্রতি সরাসরি হুমকি সৃষ্টি করছে।
সাধারণত কানাডায় বড় অবকাঠামো প্রকল্পের আগে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পরামর্শ বাধ্যতামূলক। কিন্তু নতুন আইন পাস হওয়ার ফলে এই প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে সরকার এখন সরাসরি প্রকল্প বাস্তবায়নে যেতে পারবে। সমালোচকরা বলছেন, এটি আদিবাসী অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত এবং ‘রেকনসিলিয়েশন’-এর জাতীয় অঙ্গীকারের পরিপন্থী।
আইনটি পাস হওয়ার সময় অন্টারিও প্রাদেশিক সংসদে তীব্র বিতর্ক হয়। নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি) এবং লিবারেল পার্টি একযোগে এই আইনের বিরোধিতা করে। তাদের অভিযোগ, সরকার বড় বড় রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থে আইনটি চাপিয়ে দিচ্ছে।
এক বিরোধী সদস্য বলেন, “অন্টারিওবাসীর প্রয়োজন টেকসই পরিবহন ব্যবস্থা আরও বেশি গণপরিবহন, সাশ্রয়ী ভাড়া, সাইকেল লেন ও পরিবেশবান্ধব নীতি। কিন্তু সরকার উল্টো পথে হাঁটছে।”
অন্যদিকে প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড সংসদে আইন পাসের পর সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা আর সময় নষ্ট করতে চাই না। প্রতিদিন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকে। আমাদের লক্ষ্য মানুষের সময় বাঁচানো এবং প্রদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া হাইওয়ে ৪১৩ সেটাই করবে।”
স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গ্রেটার টরন্টো এলাকায় গড় দৈনিক যাতায়াত সময় ১ ঘণ্টা ৪২ মিনিট, যা পুরো কানাডার মধ্যে সর্বোচ্চ। এই যানজটের কারণে বছরে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের উৎপাদনশীলতা হ্রাস ঘটে এবং বাসিন্দাদের মানসিক চাপও বেড়ে যায়। সরকারের মতে, এই ক্ষতি রোধ করতে নতুন হাইওয়ে নির্মাণ এখন জরুরি।
তবে নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “ইনডিউসড ডিমান্ড” নামের এক প্রক্রিয়ার কারণে নতুন সড়ক নির্মাণের ফলে কিছু বছরের মধ্যেই আরও বেশি গাড়ি রাস্তায় নামে, ফলে আবারও জ্যাম তৈরি হয়। তারা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে সমাধান হতে পারে গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন। ইতিমধ্যে মেট্রোলিংকসের নতুন সাবওয়ে লাইন নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে শহরের ট্র্যাফিক সমস্যায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
“রিডিউসিং গ্রিডলক, সেভিং ইউ টাইম অ্যাক্ট” পাসের মাধ্যমে অন্টারিও সরকার একটি সাহসী কিন্তু বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছে। একদিকে এটি শহরের যানজট কমাতে সহায়ক হতে পারে, অন্যদিকে পরিবেশ, আদিবাসী অধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অন্টারিওর ভবিষ্যৎ পরিবহন ব্যবস্থার দিকনির্দেশ এখন অনেকাংশে নির্ভর করছে হাইওয়ে ৪১৩ প্রকল্পটি কীভাবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর। এটি হবে দ্রুত উন্নয়নের প্রতীক নাকি পরিবেশগত বিপর্যয়ের নতুন সূচনা, তা সময়ই বলে দেবে।

