17.1 C
Toronto
বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৫, ২০২৪

কানাডায় গরুর হাট

কানাডায় গরুর হাট
কসাইগুলা স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে বাড়ির পিছনে গরু ছাগল বানাবে গাছের গুঁড়ির উপর মাংস সাইজ করবে

আমার নাম্বার তার মোবাইলে সেভ করা আছে, তবুও ফোন রিসিভ করে বিরক্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো- কে?

– দোস্ত আমি, একটা কথা ছিল..

- Advertisement -

– বল

– কানাডায় এখন অনেক গরীব মানুষ। দিনদিন আরও বাড়বে..

– তো?

– কতো মানুষ না খায়ে থাকে! লক্ষ মানুষের ভরসা ফুড ব্যাঙ্ক। দুই বেলা খায়। তাও আবার ড্রাই, প্রসেস্ড ফুড..

– ঢং না করে বলে ফেল..

– সরকার জামাই আদর দিয়ে নিয়ে আসে, কিন্তু আসার পর সতীনের মতো আচরণ করে। দেশে থাকতে ঈদ বোনাস, ছুটি পাইতাম; আর এখানে ম্যানেজারকে বলে ছুটি নিতে হয়। কোরবানি দিতে হয় ফার্মে

– তোর আজাইড়া প্যাঁচাল শোনার সময় নাই, তাড়াতাড়ি ক, বাজারে যাই

– থাকি বারো হাজার কিলোমিটার দূরে। বাথরুম করতে হয় ইংলিশ কমোডে, ছয় মাস ঠান্ডা। পকেটে পয়সা নাই। মাংসের দোকানে সব ফ্রোজেন। গোস্ত খায়ে স্বাদ পাই না.. ..

– আল্লাহর কিড়া রিপন, আমি লাইন কাইটে দিবো কিন্তু!.. তোর এতো রহস্য আমার ঘিন্না লাগে!

– বলছিলাম.. সরকার একটা দিন বাসায় কোরবানি করার সুযোগ দিলে এমন কী ক্ষতি হইতো? সবাই মিলে যদি সরকারের কাছে দরখাস্ত করি..

– বাঙালি ম্যানেজ করতে পারবে?

– স্কিল্ড কসাই, বুয়া, হুজুর আনবো। হুজুর তলোওয়ার হাতে বাড়ি বাড়ি কোরবানি দিবে, মানুষ হাদিয়া দিলে নিবে

– বুয়ারা কী করবে?

– ভুরি সাফ, ট্যানারিতে কাজ করবে

– তারপর?

– কসাইগুলা স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে বাড়ির পিছনে গরু ছাগল বানাবে। গাছের গুঁড়ির উপর মাংস সাইজ করবে। বড় এব্জরবেন্ট পাতা হবে, রক্ত শুষে নিবে। সিটির নির্দেশ মতো জায়গায় সব ফেলা হবে

– যদি লোকজন এসব নিয়ম না মানে?

– দশ হাজার ডলার ফাইন। যারা কোরবানি করবে, তাদের সবাইকে রেজিস্ট্রি করতে হবে, পঞ্চাশ ডলার করে সার্ভিস চার্জ দিবে। যে টাকা উঠবে তা দিয়ে পঞ্চাশজন ভলান্টিয়ার ইন্সপেক্টর নিয়োগ দেয়া হবে। এদের কাজ ইন্সপেকশন করা। ঈদের আগে পোস্টার মারা হবে। যারা মাংস চায়, যেন বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিয়ে আসে

– কোন বাড়িতে কোরবানি, বুঝবে কেমনে?

– ওয়েবসাইট বানানো হবে। বাড়ির এড্রেস দেয়া থাকবে। বাড়ির সামনে ডিজিটাল স্ক্রিনে আপডেট করা হবে; আর কতোজন কে দেয়া যাবে, সব কিছু

– তুই তো দেখি কামিল আদমি রে!

– দোস্ত, পঞ্চাশ হাজারের বেশি বাঙালি শুধু টরন্টোর আশপাশেই আছে। শ’খানেক কাজের বুয়া আনলে তারাও ফিনান্সিয়ালী ভালো থাকতো, আর কানাডা দেশটাও দেখতো। দেশে টাকা পাঠাবে, রেমিট্যান্স বাড়বে হু হু করে!

– গরু কিনবে কোত্থেকে?

– হাট বসবে। অনুমুতি নিয়ে মাইকিং করা হবে- বিরাট গরুর হাট!

– বাসায় আনবি কেমনে?

– হাঁটায়?

– রাস্তায় হাগলে?

– স্পেশাল ডায়াপার পরানো হবে। ড্যানফোর্থ হবে উত্তর আমেরিকার ফার্স্ট গরুর হাট। ফিরিঙ্গিরা চোখ বড় বড় করে দেখবে রাস্তায় মালা পরানো গরু নিয়ে যাওয়া। কত প্রশ্ন করবে! জাতীয় নিউজে আসবে কোরবানির উৎসব, এর কারণ, উদ্দেশ্য। সাংবাদিকরা হুমড়ি খায়ে পরে নিউজ করবে! মেলা বসবে। লোকজন জিজ্ঞেস করবে, “কত নিলো ভাই?” “দুই হাজার” “জিতছেন ভাই” আর কেউ কেউ বিশ হাজার ডলারের গরু কিনে দম্ভের সাথে হাঁটবে..

– কয়েক বছর পর যখন শীতের মধ্যে কোরবানি হবে? মাইনাস তিরিশে কী করবি?

– গরুর স্পেশাল জ্যাকেট বানানো হবে। গলায় রং-বেরঙের মালা পরায়ে নিয়ে আসবে। হাট মনিটরিং করা হবে। মেলায় পুরি, সিঙ্গাড়া ভাজা হবে, মশলার বাজার বসবে; সেমাই, ছানা, দই, মিষ্টি..

– এইতো, আসল ঘটনা হলো তোর খাওয়ার মেলা

– মজা হবে গরু বাঁধা নিয়ে। গরু বেঁধে টানাটানি করবে, তখন শুরু হবে আসল ঈদ। এসব কঠিন কাজ পরিবারের সবাই একসাথে মিলে করলে বন্ধন বাড়বে, গরু স্যাক্রিফাইস এর আসল ব্যাপারটা মাথায় ঢুকবে। কোরবানির উদ্দেশ্য সফল হবে। গরুর কষ্ট, নিজের ভেতরের পশুত্বকে বিসর্জন করার চেতনা জাগবে। আর আমাদের পরের জেনারেশনের মধ্যেও কোরবানি করার ইচ্ছে জাগবে। আমরা যদি ওদের না শেখাই, তারা কোত্থেকে শিখবে? আমরা মজা করে গোস্ত খাই, কিন্তু সেটা যে কত কষ্টের ফসল, এখাকার মানুষ বুঝবে। খাবারের অপব্যয় কমবে

– সাব্বাস! মাঝে মাঝে তুই যা বলিস!

– মেলায় নাগরদোলা আসবে, মানুষ মেহেদী দিবে হাতে। গরু নিয়ে কতো কীর্তি যে হবে.. দড়ি ছিঁড়ে পালাবে, মানুষকে ছ্যাঁচড়ায়ে নিয়ে যাবে, লাথি দিবে, গুঁতা দিবে, ভিডিও হবে, ফেইসবুকে রিল্স আসবে..

– দেশী গরু আনার ব্যাবস্থা করিস। ফিরিংগি গরুর টেস্ট নাই

– জাহাজ ভর্তি দেশী গরু আসবে। আর সিরাজগঞ্জের ছাগল। লোকজন একে অপরকে জিজ্ঞেস করবে, ভাই আপনি গরু না ছাগল? আরও প্ল্যান আছে!

– কী?

– ভ্যান আর রিক্সা ইম্পোর্ট করবো। লোকজন পাঞ্জাবি, শাড়ি পরে রিকশায় ঘুরবে, ভ্যানে পা দুলায়ে সারা ড্যানফোর্থ ঘুরবে! কালচার কাকে বলে কানাডিয়ানদের হাঁড়ে হাঁড়ে শিখাবো! মেয়র গরুর হাটের উদ্বোধন করবে। জাস্টিন ট্রুডো আসবে। পুরা পলিটিক্যাল প্যাচে ঢুকায়ে দিতে হবে। প্রাইম মিনিস্টার বলবে, হাটের জন্য যা যা লাগে, সরকার থেকে সব ধরণের সহযোগিতা করা হবে..

– রিপন রে, আমার এখনই উত্তেজনায় রক্ত নাচা শুরু করছে। বিজনেসটা সত্যি যদি ধরা যায়, কেল্লা ফতে। মেইন ইনকাম কোত্থেকে আসবে বল তো?

– গরু ইমপোর্ট?

– ধুর বোকা.. হাটের ইজারা থেকে। প্রতি গরু থেকে ১০% সার্ভিস চার্জ নিবো। আর এই কোরবানি শুধু ঈদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কানাডিয়ানরাও দেখবি বাঙালিদের মতো টাটকা গরুর মজা পায়ে যাবে

– দোস্ত, এইবার আমি কিন্তু ভালো পোস্ট নিবো। আমি সিইও হবো

– তুই যতটা সহজ ভাবছিস, ততোটা না। এসব নিয়ে সাংবাদিকদের সামনে ব্রিফিং করা, লোকাল গভমেন্টের সাথে ডিল করা; এসব তুই পারবি? তোর ইংরেজির যা অবস্থা.. তুই আগে এডাল্ট ইএসএল এ ভর্তি হ, ইংরেজি ভালোমতো শেখ, তারপর দেখা যাবে। এখন পর্যন্ত ‘জি’ ড্রাইভার্স লাইসেন্সটা পর্যন্ত নিতে পারিসনি! তাছাড়া আমার পোস্ট সিইও হলে সবাই গুরুত্ব দিবে। তুই হোস ম্যানেজার..

চিশতী প্রতিবার ভালো পোস্ট নিয়ে আমাকে ঠকায়। আমাকে দেয় ম্যানেজারের পোস্ট। নিজে কিছু করবে না, নাকে তেল দিয়ে ঘুরবে। সব ফিজিক্যাল কাজ করবে আমাকে দিয়ে। আমি এবারও কিছুটা মন খারাপ করে বসে ছিলাম। গিন্নি ডাক দিয়ে আমার রঙিন স্বপ্নে বাধা দিয়ে বলল- চান্দু, তোমার পাঞ্জাবি রেডি। টুপি তো দেখতেছি না। রোজার ঈদে টুপি কই রাখছিলা?

– দেখি খুঁজে

– সকালে কোন মসজিদে নামাজ পড়বা দেখছো?

– দেখবো

– গতবারের মতো নামাজ মিস কইরো না। দয়া করে পাঞ্জাবিটা ইস্ত্রি করে রাখো। সকালে তোমার ঐতিহ্যবাহী তাড়াহুড়া শুরু হয়ে যাবে..

আমি টুপি খুঁজতে বের হই।

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles