17.1 C
Toronto
বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৫, ২০২৪

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : ষোলো

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : ষোলো
মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো ষোলো

আমরা যখন কুয়েত ছিলাম সেখানকার অনেক বন্ধুরাই ইমিগ্রেসান নিয়ে ক্যানাডাতে চলে এসেছে এবং মোটামোটি সবাই টরোন্টতেই স্থায়ী হোলো । পুরানো মানুষদের পেয়ে আমাদের আনন্দের শেষ নেই। ততো দিনে আমার মেয়ে হাই স্কুলে এবং ছেলে মিডেল স্কুলে চলে গেছে। আমরা নানা অনুষ্ঠানে মিলিত হই। পহেলা বৈশাখ করি, বসন্ত উৎসব করি , ঈদের মেলা করি। নানা ভাবে নিজেকে ব্যস্ত করে ফেললাম সাথে বাইরের কাজ, লেখা লেখি, সংসার সব মিলিয়ে আমি মহা ব্যস্থ ।

আমার খুব ইচ্ছে হোল আম্মাকে ইমিগ্রেসান দিয়ে আমার কাছে নিয়ে আসি । তাহলে ইচ্ছেমতো আম্মা তিন ছেলেমেয়েদের বাড়ীতে বেড়াতে পারবে। ভালো না লাগলে চলে যাবে । এপলাই করলাম আম্মার জন্য ইমিগ্রেসানের। সব রকম আনুষ্ঠা্নিকতা , ইন্টারভিউ, মেডিক্যাল সব শেষ করে আসতে আসতে সাত থেকে আট মাস লেগে গেলো । অবশেষে আমার মা আমাদের কাছে পৌঁছালেন । সাথে আসলো আম্মার আইনজীবী মেয়ে। আম্মাকে নিয়ে আমরা অনেক জায়গাতে ঘুরলাম, বেড়ালাম , সবাই মিলে ভাইয়ের ওখানে বেড়াতে গেলাম। তারপর বড় বোনের ওখানে । আম্মার সাথে নিয়ে যে বোন এসেছিলেন, একমাস থেকে দেশে ফিরে গেলেন। আমার বন্ধুরা কেউ না কেউ রোজ আসে আম্মার সাথে গল্প করতে। আমার বন্ধুরা সবাই আম্মারও বন্ধু হয়ে গেলো । আমার মা এমন একটা মানুষ ছিলেন যে তাঁকে ভালোবাসে নাই এমন মানুষ খুব কমই ছিলো ।আম্মাও তাঁর আদর ভালোবাসা বিলিয়ে দিতেন সবাইকে। আমাদের সকল বন্ধুরাও ছিলো আমার মায়ের বন্ধু। যাই হোক টেনে টুনে আম্মাকে এক বছর রাখলাম। তারপর আম্মাকে কিছুতেই রাখা গেলো না। আম্মার বক্তব্য ছিলো ,” তোমরা সকালে সবাই কাজে চলে যাও, আর বাচ্চারা চলে যায় স্কুলে আর আমি ভুতের মতো এতো বড় বাড়ীটা আগলে বসে থাকি। দরজাতে খুট আওয়াজ হলে মনে হয় চোর এসেছে । তোমাদের এই বিরাট বাগানে বসে একশত পাখি যখন একসাথে কিচির মিচির করতে শুরু করে আমার তখন গা ঝমঝম করে”। আরো কতো শত অভিযোগ , অনুযোগ ছিলো আমার মায়ের।

- Advertisement -

আবশেষে আমিও বুঝতে পেরেছিলাম আম্মা কেনো থাকবেন আমাদের বিদেশের বাড়ীতে? আম্মার নিজেরই বিশাল বাড়ী নিজের দেশে। গাড়ী , ড্রাইভার , বাবুর্চি , বাড়ী ভর্তি কাজের লোকজন ।আম্মার বাড়ীতে আম্মা রাজরানী । আমি কখনো ভাবিওনি আম্মা এসে জীবন ভর আমাদের ভাই বোনদের কাছে থেকে যাবেন । ভেবেছিলাম বছরে একবার এসে নাহয় বিদেশী ছেলে মেয়েদের কাছে ঘুরে যাবে। তাছাড়া আম্মার আরো দুই মেয়ে এক ছেলে দেশে আছে। আম্মা কোন দুঃখে থাকতে যাবেন বিদেশী ছেলে মেয়েদের কাছে। আম্মা আর কোন দিনই এলেন না আমাদের দেখতে। যার ফলে ইমিগ্রেসানও ক্যানসেল হয়ে গেলো । আমাদেরই দায়িত্ব হয়ে গেলো প্রতিবছর আম্মাকে দেখতে যাওয়া ।এখানেই আমার মায়ের আমেরিকা, ক্যানাডায় আসার পর্বের সমাপ্তি ।

ততদিনে আমার মেয়ে হাই স্কুল শেষ করে ইউনিভার্সসিটি শুরু করে দিয়েছে। ওরা বড় হচ্ছে সাথে সাথে আমরাও বড় হচ্ছি । জীবন বয়ে চললো বহমান নদীর মতো । ছেলের হাই স্কুল ও মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু হওয়ার আগে ওদের ফ্লোরিডাতে “ ডিজনী ওয়ার্ল্ড “ ও আশেপাশের নানা জায়গাতে ঘুরিয়ে এনেছিলাম। পড়া শুনার চাপ বেড়ে গেলে হয়তো এভাবে চিন্তাহীন মাথায় ঘুরে বেড়াতে পারবে না সেই ভেবে।

ছেলে মেয়েরা বড় হয়ে গেছে। ওরা ব্যস্থ পড়াশুনা বন্ধু বান্ধব নিয়ে। এদিকে আমার স্বামীর কাজ থেকে একটা কনফারেন্সে যেতে হবে লস এঞ্জেলেজ । চার দিনের কনফারেন্স । ও চাইলো আমিও যাই ওর সাথে। অনেক দিন আমাদের কোথাও ঘুরতে যাওয়া হচ্ছে না। আমার স্বামীরও সেমিস্টার শেষে কিছুদিন ছুটি আছে। আমরা সিধান্ত নিলাম লস এঞ্জেলেসের কনফারেন্স শেষ আমরা হাওয়াই থেকে ঘুরে আসবো দিন দশেক। ছেলে মেয়েরা বড় হয়েছে দুই ভাই বোন থাকতে পারবে নিজেরাই সমস্যা নেই। মেয়ে ড্রাইভ করে গাড়ী তো থাকলোই । ওদের খাবার দাবার ও অন্যান্য সব কিছুর ব্যবস্থা করে রেখে , আমাদের বন্ধুদের ছেলে মেয়েদের খোঁজ খবর রাখার দায়িত্ব দিয়ে নির্দিষ্ট দিনে আমরা রওয়ানা হয়ে গেলাম।

আমার স্বামীর কাজ শেষ হলে আমরা ঘুরে বেড়িয়েছি ডিজনি ল্যান্ডে । বাচ্চাদের মতো ডিজনি ল্যান্ডের মিকি, মিনি গুফি সবার সাথে ছবি তুলে বিভিন্ন রাইড নিলাম অনেক আনন্দ করলাম সব দেখে আনন্দ করে। এখন আমরা ছেলে মেয়েদের সাথে না , তাই ওদের পছন্দ আমাদের কিছু করতে হচ্ছে না। আমাদের যা ভালো লাগছে তাই করছি, এ যেনো এক অন্য রকম আনন্দ। আমার স্বামীর এখানকার কাজ শেষ হলে আমরা রওয়ানা হলাম হাওয়াইর” মাওয়াই দ্বীপে” ।হাওয়াইতে কয়েকটি দ্বীপ আছে আমাদের খুজ খবর নিয়ে মনে হোল এটাই সব চাইতে ভালো হবে তাই আমরা সে দ্বীপেই সব কিছুর ব্যবস্থা করলাম।

ম্যাল্টন, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles