17 C
Toronto
সোমবার, মে ২৭, ২০২৪

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : সাত

মধ্যপ্রাচ্য থেকে টরন্টো : সাত

ফোনে কথা বার্তা হচ্ছিলো বন্ধুদের সাথে। আমাদের এক বন্ধু ছিলেন একটু নিরাপদ জায়গাতে সেখান থেকে মেইন রোডটা দেখা যেতো না। তিনি আমাদের খুবই ঘনিষ্ট বন্ধু। তার বাসাও ছিলো খালি। ভাবী বাচ্চাদের নিয়ে দেশে গিয়েছেন বেড়াতে । আমরা একটা সুটকেসে যতটুকু প্রয়োজনীয় বাচ্চাদের আমাদের জামা কাপড় ও কিছু বাচ্চাদের দরকারি ঔষধ পত্র খাবার আমার ছোট ছেলেটার দুধ নিয়ে করুনার ব্যাগ গুছিয়ে নিতে বললাম। আমাদের এক সুটক্যসে ১১ বছরের মধ্য প্রাচ্যর সাজানো গুছানো সংসার ফেলে বেড়িয়ে এলাম। বাসা থেকে বেড়িয়ে আগে আমার বাচ্চা ছেলেটা তার ঘুমাবার ক্রিবে ( বাচ্চাদের বিছানা ) হাত বুলিয়ে ক্রিবের চারপাশে ঘুরে ঘুরে বলতে লাগলো , মাম্মি আমি আর কখনো আমার বিছানায় ঘুমাতে পারবো না? এটা ছিলো আমার কাছে অত্যান্ত বেদনার একটি দৃশ্য । আমি জানি না আমার শিশু বাচ্চাটি কি ভাবে বুঝেছিলো আমাদের আর ফিরা হবে না , আর ওর কখনো ওর বিছানাতে ঘুমানো হবে না।

- Advertisement -

আমাদের সে বন্ধুর বাসায় আমরা চার বন্ধু মিলিত হলাম। কারন কেউই একা থাকাটা নিরাপদ অনুভব করছিলাম না। আমার ছোট ছোট দুই বাচ্চা আর আমাদের আরেক বন্ধুর ও আমার বাচ্চাদের মতো দুই বাচ্চা। আমরা যে বন্ধুর বাসায় উঠলাম উনার বাসায় ভালো বাবুর্চি ছিলো আর আমার সাথেও ছিলো কাজের মানুষ। তাই এতো মানুষের রান্না বান্নার অসুবিধা হয়নি।

প্রতিদিনই সবাই মিলে আলোচনাতে বসতো কতো দিন এভাবে চলবে নিশ্চয়ই বৃহৎ শক্তিরা হস্তক্ষেপ করে শিগ্রীই এটার একটা মীমাংসা হবে। কিন্তু সহসা কিছু হোল না। আমাদের চার বাড়ীর ফ্রিজে এবং ফ্রিজের বাইরেও যে সব শুকনো খাবার ছিলো, চার পুরুষ একদিন বেড়িয়ে তিন বাড়ীর খাবার সব কিছু সংগ্রহ করে আনা হোলো । তখনো বাজার খুলে নি ব্যাংক বন্ধ । টাকা উঠানো যাচ্ছে না। যার ঘরে যতোটা টাকা ছিলো সেটাই সম্বল। আমরা কয়েকদিন আগেই টার্কি থেকে বেড়িয়ে এসেছিলাম বলে আমাদের কাছে বেশ কিছু আমেরিকান ডলার ছিলো আমাদের বন্ধুদের কাছেও আমেরিকান ডলার কিছু কিছু ছিলো । ওরা বন্ধুরা প্রতিদিনই বের হতেন খাবারের সন্ধানে। বিশেষ করে আমার ছেলের জন্য দুধ সংগ্রহ করতে।

কিন্তু আমরা বুঝতে পারলাম আমাদের এখানে বেশী দিন থাকা উচিৎ হবে না। আমাদের কুয়েত থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হয়ে যেতে হবে। আরো কিছু বাঙ্গালির সাথে পরামর্শ করে একটা বাঙ্গালিদের বাস ভারা করা হোল । আমাদের চার বন্ধুর মাঝে আমিই একমাত্র বয়েসে কম মহিলা। করুনা ছিলো কিন্তু তাকে নিয়ে চিন্তার তেমন কারন ছিলো না। আমাদের এক বন্ধু আমাকে বললেন শিখা একটা বোরখা পড়ে নাও। কিন্তু আমি কোথায় বোরখা পাবো এখন? আসলে তখন মনে ৭১ ঘুরছিলো । এক দেশের সৈন্য অন্য দেশে ঢুকে গেছে। অনেক কিছুই হতে পারে। তারপরও ভালো করে ওড়না দিয়ে মাথা শরীর জড়িয়ে নিলাম আমি এবং অন্য ভাবীটা। নিজেদের খাবার বাচ্চাদের খাবার বক্সে বক্সে ঘুছিয়ে নিলাম। যার যার জিনিষ নিয়ে আমরা বাসে উঠলাম কুয়েত থেকে ইরাকের বর্ডার পর্যন্ত যাবার জন্য । সে বর্ডারের নাম ছিলো মৌসুল বর্ডার । শোনা যাচ্ছিল কুয়েতে বসবাস কারি লোকজন সবাই সে বর্ডার পার হচ্ছে। আমরাও সে উদ্দেশেই রওয়ানা হলাম। তখন ইরাক আর কুয়েত একই দেশ কাজেই কুয়েত থেকে ইরাক যেতে আমাদের কোন সমস্যাই হোল না। মৌসুল ছিলো ইরাকের একটি শহর । তখন মৌসুল বর্ডার পার হয়ে অনেকই টার্কি ঢুকছিলো শরণার্থী হিসাবে। যে ভাবে ৭১ রে বাংলাদেশের মানুষ ভারত প্রবেশ করছিলো । আমাদেরও সে রকম প্লেন ছিলো ।

আমাদের বাস মৌসুল বর্ডার থেকে অনেকটা দূরে গিয়ে থামলো । কারন কাছে থামা একেবারেই সম্ভবও ছিলো না। আমরা যা দেখলাম শত শত মানুষ বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে ৩০ ডিগ্রী সেলসি এসে বসে আছে। বাচ্চাদের কান্না শুনা যাচ্ছে । আমরাও বাস থেকে নেমে শরণার্থীর মতো প্রচণ্ড মাথা ফেটে যাওয়া গরমে বাচ্চাদের নিয়ে গিয়ে বসলাম । কিছুক্ষণ পরে দেখলাম একটা ট্রাক এসে একটা একটা আরবি রুটি ছুড়ে দিয়ে যাচ্ছে সবাইকে। এই দৃশ্য দেখে আমাদের চোখে পানি চলে এলো । নাহ এটা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। এভাবে আমরা থাকতে পারবো না। আমরা সবাই মিলে সিধান্ত নিলাম সবাই মানে আমরা চার পরিবার। আমরা এখান থেকে একটা মাইক্রো বাসে করে মৌসুল শহরে চলে এলাম। সেখানে একটা হোটেলে উঠলাম । মোটা মোটি মাঝারি গোছের একটা হোটেল। এসে স্বস্থি পেলাম। নিজেরা ও বাচ্চারা একটু বিশ্রামের সুযোগ পেলাম।

সকাল থেকে আবার শুরু হয়ে গেলো ইরাক থেকে বের হবার পথ খুঁজা । ইরাকের রাজধানী বাগদাদে বাংলাদেশ দুতাবাসে যিনি রাষ্টদূত ছিলেন তার সাথে যোগাযোগ করা হোল । তিনি আমাদের বাগদাদে চলে যেতে বললেন। সেখান থেকে ব্যবস্থা করা যাবেন বলে জানালেন। দুতাবাসের কাউন্সেলার আমাদের তাঁর বাসায় থাকার আমন্ত্রন জানালেন। আমাদের সেটা ছিলো শাপে বর পাবার মতো । কারন আমাদের কারো কাছেই পর্যাপ্ত পরিমান টাকা ছিলো না যে আমরা অনিরদিষ্ট সময়ের জন্য হোটেলে থাকবো । আমরা কাউন্সেলার সাহেবের বাসায় বিনা দ্বিধায় উঠে গেলাম উনার ঘারে সব দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে আমরা এগারো জন মানুষ । উনার ফ্যামিলির সবাই বাংলাদেশে গিয়েছিলেন তখন তাই বাসা খালি ছিলো মোটা মুটি , শুধু কাউন্সেলার সাহেব উনার এক শালা আর বাংলাদেশের রান্নার বুয়া ছিলো বাসায় । মোটা মুটি পুরো বাড়িটা তখন আমাদের দখলে। কিন্তু তারপরও কষ্ট আমাদের ছেড়ে যাচ্ছিলো না কোন ভাবেই। আমাদের বাচ্চারা প্রচণ্ড ডাইরিয়াতে আক্রান্ত হয়ে পড়লো । নানা জায়গাতে ঘুরে নানা অনিয়মে তারা সুস্থ থাকতে পারলো না। আমার আড়াই বছরের ছেলেটার অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেলো , মনে হচ্ছিলো আমার শিশু ছেলেটাকে আর বাঁচাতে পারবো না। আমরা ইরাকের বাসিন্দা না আমরা এখনকার কিছুই চিনি না। যাহোকে একজন ইরাকি ডাক্তারকে বাসায় নিয়ে আসা হোল । তিনি যাযা চিকিৎসা ঔষধ প্রয়োজন লিখে দিয়ে গেলেন। ডাক্তার আমাদের কাছ থেকে কোন ফি নিলেন না। তিনি আমরা যে তখন কতোটা অসহায় সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। আগেও বলেছি একমাত্র সাদ্দাম ও তার লোকজন ছাড়া ইরাকের মানুষ জন অত্যান্ত ভালো মনের ছিলো ।

যা হোক ঔষধ পড়াতে বাচ্চারা খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠলো । আমাদের গ্রুপের ছেলে বন্ধুদের কাজ ছিলো রোজ সকালে দুতাবাসে যাওয়া আর খোঁজ খবর নেয়া কোথা দিয়ে কোন ফ্লাইটে অন্য দেশে যাওয়া যায় । অবশেষে বাংলাদেশ দুতাবাসের সহযোগিতায় আমাদের বাগদাদ থেকে জর্ডান যাবার ব্যবস্থা করা হোল । সে ভাবেই টিকেট করে আমরা জর্ডানের পথে ফ্লাই করলাম। জর্ডানে পৌঁছে হোটেলে উঠলাম ক্লান্ত বিধস্ত অবস্থাতে । এখন এখান থেকে আমাদের বাংলাদেশে যাবার ব্যবস্থা করতে হবে। সমস্যা হোল টাকার । আমাদের পাঁচটা টিকেট । আমরা দুজন, আমাদের দুই ছেলেমেয়ে আর শ্রীলংকার কাজের মহিলা করুনা। শুধু আমরাই আমাদের কাজের মহিলাটাকে সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম আর কেউ আনেনি , যাদের কাজের লোক ছিলো । কিন্তু আমরা এতো অমানবিক হতে পারিনি। কি করে আমরা এতো গুলো টিকেটের ব্যবস্থা করবো । যারা একা ছিলেন তাদের একটা টিকেট করতে সমস্যা ছিলো না। যাহোক ব্যবস্থাতো হয়েই যায় । আমার বড় বোন আমেরিকা থেকে টিকেটের টাকা পাঠালেন । বড় আপার সাথে রোজই কথা হতো । আমাদের আরেক বন্ধুর ও টাকা আসলো উনার বাবার কাছ থেকে। আমরা আবার টিকেট করলাম প্রথম করুনাকে শ্রীলংকার টিকেট করে শ্রীলংকার প্লেনে উঠিয়ে দিলাম। তারপর আমরা সবাই গালফ এয়ার লাইনে বাংলাদেশের পথে রওয়ানা হলাম।

ম্যাল্টন, কানাডা

- Advertisement -
পূর্ববর্তী খবর
পরবর্তী খবর

Related Articles

Latest Articles