7 C
Toronto
রবিবার, মার্চ ৩, ২০২৪

টরন্টো টু ঢাকা

টরন্টো টু ঢাকা
টরন্টো ছাড়ার আগে যথারীতি ঢাকায় টিপটিপ ভাবীকে ফোন করে ছিলাম তিনি বল্লেন এখন আসছো কেন গোটাদেশ শীতে কাঁপছে

টরন্টো ছাড়ার আগে যথারীতি ঢাকায় টিপটিপ ভাবীকে ফোন করে ছিলাম। তিনি বল্লেন এখন আসছো কেন! গোটাদেশ শীতে কাঁপছে। ১৪ প্লাশে নেমেছে ঢাকার অবস্থা।

ভাবীর কথায় হাসবো না ভয় পাবো বুঝে উঠতে সময় নিলাম। যেহেতু টরন্টোতে সেদিন মাইনাস ২২ ছাড়িয়ে আরো বাড়ছে শীত। তবু মনে খটকা লাগল। মনে হলো ঠিক নেই তবু একটা কানাডিয়ান শীতের সোয়েটার আর হালকা কোট নিয়ে যাই। ঢাকা এয়ারপোর্টে অপেক্ষারত গাড়িতে উঠতে এই একটু হাঁটায় মনে হলো এ কী রে বাবা! প্লাস ১৪ এমন ঠান্ডা,এত ভয়াবহ কেন? কোনোভাবে দৌড়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। ড্রাইভার সাহেব ট্রলি থেকে ব্যাগ ব্যাকডালায় তুলে বন্ধু কিশওয়ার ইমদাদের বাসা গুলশানের দিকে রওনা দিলেন।

- Advertisement -

আমি ভাবলাম বিমানের মোটা কম্বলের ভেতর ওমে ছিলাম, হঠাৎ তাই প্লাস ১৪ এভাবে ভূতের মতো কামড়াতে তেড়ে এসেছে। আবার ভাবলাম, টরন্টোর পিয়ারসন এয়ারপোর্টে এমনি গাড়ি থেকে নেমে ট্রলি নিয়ে ব্যাগ তুলে তারপর টার্মিনালে ঢুকেছিলাম। তখন তো মাইনাস ২২ এভাবে কামড়াতে আসেনি।

তাহলে কি বাংলাদেশের প্লাস ১৪ টরন্টোর মাইনাস ২২ থেকে ভয়াবহ! যাই হোক গুলশান ঢাকার অভিজাত এলাকা। অভিজাত বান্দারা থাকেন। অনেক বাসায় গিজার থাকায় গরমপানি নলে আসে, টরন্টোতে গরিব ও বড়লোক সবার ঘরেই যা থাকে। তিন তলায় উঠতে কিশওয়ার জড়িয়ে ধরে ঘরে ঢোকাল। বিমানে এতটা ঘন ঘন মজার সব খাওয়া দেয় যে পেট ভরে টইটম্বুর। রাতও অনেক হয়েছে, তিনটা ছুঁইছুঁই। শোয়ার ঘরে ব্যাগ ঢুকিয়ে নিজে ঢুকতে মনে হলো চার দেয়াল ও ছাদে সেঁটে ছিল শীতভূত, চরম কনকনে ঠান্ডায় অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে তুলল।

টুইস্ট নাচের মতো নাচতে লাগলাম। টরন্টোতে মাইনাস ৩০ বাইরে হলেও ঘরের ভেতরে পাতলা টি-শার্ট পরে থাকে সবাই। রুমগুলোতে ইনবিল্ড হিটার সেই অক্টোবর থেকে চালু হয়ে যায়। বাড়ির দেয়ালের কাঠের দুই আস্তরের মাঝে মোটা করে ফোমের মতো কিছু একটাও দেওয়া হয় বাড়ি তৈরির সময়, যাতে শীত ভেতরে ঢুকতে না পারে। ঢাকায় তো গুলশান হোক আর শনিরআখড়া যেখানেই পাকা সিমেন্টের দেয়াল শীতের ঠান্ডা যতটা পারে টেনে নিয়ে ভেতরে উত্তর মেরুর অবস্থা করে তোলে। রুম হিটার দিয়েও এ ঠান্ডা দূর করা মুশকিল।

কানাডায় প্রায় ২৮ বছরে কখনও প্যান্টের নিচে ইনার বলে গরম টাইট পরে সবাই, আমি পরিনি। মোটা জিন্স প্যান্ট দিয়ে চালিয়ে দিয়েছি। এই ঢাকার প্লাস ১৪ আমাকে তা পরাল। গরম টাইটস তো আনিনি, ট্র্যাকসুটের নিচেরটা পরে তার ওপর জিন্স প্যান্ট ওপরে মোটা সোয়েটার পরে পায়ে মোটা মোজা মাথায় গরম টুপি পরে বিছানায় গেলাম। ওরে বাব্বা এ কী! বিছানা দক্ষিণ মেরুর ভাসমান বরফঝণ্ড মনে হলো। এক লেপে কুলাচ্ছে না, তবু পার করলাম রাত। বারবার টিপটিপ ভাবির কথা মনে হচ্ছিল। ঢাকা শীতে কাঁপছে এখন…!

মাইনাস ২৫-এ বসে টরন্টোতে বুঝে উঠতে পারিনি ঢাকার প্লাস ১৪ কী ভয়াবহ।

শীত কিংবা ঠান্ডা জিনিসটাই এমন- প্রপার প্রতিহত করার ব্যবস্থা থাকলে শীত খুবই মজার আর ব্যবস্থা না থাকলে ভয়াবহ। শীতে মজার একটা ছোট্ট সত্যি ঘটনা বলে শেষ করি। সেই নব্বই দশকের মাঝামাঝি।মোবাইল ফোন তখনো মানুষ দেখেনি। প্রথম যখন কানাডা গিয়েছিলাম ছিলাম মন্ট্রিয়ল শহরে নেমে ছিলাম। মন্ট্রিয়লে স্নো পড়ে বেশি। ঠান্ডাও টরন্টোর চেয়ে বেশি,পরে বুঝেছি।

বর্তমানে প্রয়াত কবি ও গল্পকার মামুনর রশীদের বাসায় গিয়ে উঠলাম। মন্ট্রিয়লের বাঙালি এলাকা মেট্রো পার্কের কাছে। তিন রুমের বাসা। স্ত্রী সদ্য তাকে ছেড়ে গেছেন, তাই দুই রুমই খালি। আমি তো মহানন্দে আছি, মামুন ভাই রাঁধেন, আমি খাই। রাঁধতে ইচ্ছে না করলে লম্বা লংকোট চাপিয়ে স্নো বুট পরে ছপছপ করে স্নোতে গর্ত করে পাশে চলচ্চিত্র পরিচালক সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল আর কাজী মীরার বাসা কিংবা কবি সাজি আর মিঠুর বাসায় গেলেই পেটভর্তি খাওয়া জোটে। মামুন ভাইয়ের তিন নম্বর খালি রুমে এসে আশ্রয় নিল আরেক জন। কবিতা লেখেন না তবু কবি কবি ভাব।

সেজেগুজে পারফিউম দিয়ে বাবু সেজে থাকার ঝোঁক। আমাকে কেন যেন তেমন পছন্দ করতেন না। একদিন তো বলেই বসলেন এই যে ব্রাদার, আমার দিকে ওভাবে অন্তরভেদী তাকাবেন না তো! আমার ভেতরটা কেঁপে ওঠে। আমি রেগে বললাম কী বলেন ভাই উল্টাপাল্টা এসব! আমার বাড়ি চট্টগ্রাম হতে পারে কিন্তু আমি ওসবে নেই! মামুন ভাই না থাকলে সারাক্ষণ কোনো নারীর সঙ্গে ঘণ্টাকে ঘণ্টা কথা বলেন। রাত হলে মামুন ভাই ঘুমালে মোটা কোট বুট মাফলার মাংকিক্যাপ পরে শীতের মধ্যে বেরিয়ে পড়েন। পাশে রাস্তার ধারে গ্লাস ঢাকা ফোন বুথ।

এক কোয়ার্টার কয়েন ঢুকিয়ে ফোন বক্সে এক ঘণ্টা কথা বলা যায়। তিনি প্রায় রাতে তাই করেন। ঘণ্টাকে ঘণ্টা কথা বলে কয়েন শেষ হলে ভোররাতে বাসায় ফেরেন। এক রাতে এমন লাগাতার স্নো পড়া শুরু হলো। তিনি গায়েব। ভোরের আলো ফুটে গেছে। বেরিয়ে গরম কাপড় পরে বুটপরে বেরুতে দেখি এক কোমর স্নো রাস্তায়।

কোনোভাবে পা ফেলে ফোন বুথের কাছে গিয়ে দেখি গোটা বুথ ঢেকে গেছে স্নোতে। ভেতরে কেউ আছে কি না দেখা যায় না। গিয়ে গ্লাভ পরা হাত দিয়ে স্নো সরাতে লাগল পনেরো মিনিট। দেখি ভেতরে তিনি মেঝেয় বসে আছেন বরফখণ্ড হয়ে। পয়সা শেষ, ফোন করতেও পারছিলেন না। টাকার নোট ফোনে ঢোকে না। বুথকে বাইরে থেকে এত স্নোর পাহাড় চেপে ধরেছে যে দরজা খুলে বেরুতেও পারছিলেন না। সেদিন বুঝেছিলাম শীতে প্রেমও জমে মানুষকে মৃত করতে শক্তি রাখে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles