22.1 C
Toronto
শুক্রবার, জুলাই ১২, ২০২৪

কোন বাঙালি কত বছর আগে কানাডায় প্রথম পা রেখেছিলেন

কোন বাঙালি কত বছর আগে কানাডায় প্রথম পা রেখেছিলেন
১৮৯৩ সালে শিকাগোতে পার্লামেন্ট অব ওয়ার্ল্ড রিলিজিওনসে যোগ দিতে যাবার সময় স্বামী বিবেকানন্দ কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া অতিক্রম করেছিলেন সেটা অনেকের জানা

কোন বাঙালি কত বছর আগে কানাডায় প্রথম পা রেখেছিলেন সে এক কঠিন গবেষণার বিষয়। ১৮৯৩ সালে শিকাগোতে পার্লামেন্ট অব ওয়ার্ল্ড রিলিজিওনসে যোগ দিতে যাবার সময় স্বামী বিবেকানন্দ কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া অতিক্রম করেছিলেন সেটা অনেকের জানা। কিন্তু কেমন ছিল সেই সময়ে কানাডার চিত্র? সেটা জানার জন্যে অনেকেরই আকুলতা। কানাডায় থাকা সেই সময়কার ভারতীয়দের দৈনন্দিন জীপনযাপনও আমরা জানতে পারি না ভারতভূখণ্ডের কোনো মানুষের রচনাতে। এই না-জানাটা বড়োই পীড়াদায়ক। আমরা জানি, কতো টানাপড়েন শেষে ১৯২৯ সালে রবীন্দ্রনাথ কানাডায় এলেন এবং অবস্থান করলেন সেই ব্রিটিশ কলাম্বিয়াতেই। তখনও আমরা বিশেষ কিছু জানতে পারলাম না এদেশের জনজীবন নিয়ে। বিবেকানন্দ এবং রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণমধ্যে ১৯০৬ সালে এক বাঙালি সন্তান জাপান থেকে আমেরিকা যাবার পথে বেশ কিছুদিন কানাডায় অবস্থান করতে বাধ্য হয়েছিলেন। জাপান ও আমেরিকা ভ্রমণের ওপর লেখা তাঁর বিত্তান্তে অনেকগুলো পৃষ্ঠা পাই ওই ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ভ্যাঙ্কুভারে ভারতীয়দের যাপিত জীবন নিয়ে। লেখকের নামহীন সেই গ্রন্থের মূল্য অন্যরকম।

বাঙালির লেখা বা ভারতীয় কারো লেখা কানাডার জীবন নিয়ে বই আছে বলে আমার মনে হয় না। ১৮৯৩ সাল থেকে গত একশ ত্রিশ বছরে কোন কোন বাঙালি দুই মহাসাগরের মধ্যবর্তী এই বিশাল ভূখণ্ডে পা রাখলেন, এখানকার আলো-বাতাস গ্রহণ করলেন তা নিয়ে গত এক দশক ধরে আমার তীব্র আগ্রহ। কানাডায় অভিবাসীজীবনের পুরোটা সময়ে অন্য যে বিষয়গুলো আমাকে তাড়িত করেছে তার মধ্যে কানাডায় বাঙালিদের অভিবাসন একটি অগ্রগণ্য অনুষঙ্গ। সেই না-থাকার যন্ত্রণার মধ্যে একজন উদ্যমী বাঙালি অসিত কুমার দত্তের সাথে আমার সংযোগ। সেই সংযোগের তিন বছরের ফসল ব্যবসায়ী মানুষটির লেখা ‘আমার কথা: টরন্টোর বাঙালিদের কথা’। অসিত কানাডায় এসেছিলেন ১৯৬৭ সালে। তিন বছর ধরে কর্কটাক্রান্ত মানুষটির সাথে থাকতে থাকতে ২০২২ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত হলো তাঁর বইটি। অনেক ক্ষুদা মেটাতে পেরেছিলেন অসিত। কিন্তু তাড়ণা পুরোটা কমেনি। আর সেই তাড়ণাকালেই গত সেপ্টেম্বরে আমার সংযোগ ঘটে যায় অটোয়াবাসী একজন ঝর্ণা চ্যাটার্জীর সঙ্গে।

- Advertisement -

সংযোগের কারণ অন্যবিধ। টরন্টোর সাপ্তাহিক বাংলামেইল পত্রিকায় অটোয়ার দুর্গাপূজার ইতিহাস লেখার জন্যে মানুষ খুঁজছিলাম আমি। কেননা সেই বিশেষ সংখ্যার অতিথি সম্পাদকের দায়িত্ব বর্তেছিল আমার কাঁধেই। মাধ্যম ছিলেন অটোয়ার প্রতিভাবান অনুবাদক সুপর্ণা মজুমদার। সেই লেখার সূত্রেই ঝর্ণা চ্যাটার্জী ক্রমে ক্রমে হয়ে উঠলেন আমার ঝর্ণাদি। বর্তমান ভূমিকা লেখার পূর্ব পর্যন্ত দেখাও হয়নি তাঁর সাথে। বই প্রকাশের আগে সাক্ষাৎ হবে কি না সেটাও জানি না। কিন্তু ফোনে কথা বলে এটা জেনেছি চুরাশি বছরের মানুষটি অসামান্য মানসিক শক্তির অধিকারী। বুঝে গেছি বাংলা লেখায় তাঁর অতুলনীয় দক্ষতা। নিজে ল্যাপটপে বসে অকল্পনীয় দ্রুততায় তিনি বাংলায় লিখে থাকেন। সে লেখাতে থাকে বোধ ও প্রজ্ঞার সম্মিলন, অভিজ্ঞতা ও হাস্যরসের বিচ্ছুরণ। এই ঝর্ণা চ্যাটার্জীর হাত দিয়েই মাত্র চৌদ্দ-পনেরো দিনে বের হলো এই পাণ্ডুলিপি।

গত শতাব্দীর ষাটের দশকে যখন ভারতের বাঙালিরা আসতে শুরু করেছিলেন উত্তর আমেরিকার উত্তরের দেশটিতে, তেমন সময়ে ১৯৬৬ সালে সাতাশ বছরের বাঙালি মেয়ে ঝর্ণাও আসেন। সাতান্ন বছরের কানাডা জীবনের কথা ছোট্ট এই বইতে তুলে এনেছেন ঝর্ণা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ ঝর্ণার কেমন কেটেছে অর্ধশতক আগে কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়ে? যেই সময়ে হাতে গোণা বাঙালির পদচারণা কানাডায়, তখন শাড়ি পরে শীতের মধ্যে তিনি কীভাবে চলতেন? আরসিএমপি-তে চাকরি করার সময় দৈনন্দিন পোশাক হিসেবে শাড়ি কতোটা গৃহীত হতো তাঁর সহকর্মীদের কাছে? টুকরো টুকরো মূল্যবান সব স্মৃতি রয়েছে ঝর্ণা চ্যাটার্জীর এই জীবনকথায়। নিজের জীবনের মূল্যবান অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরতে পরতে মিশে আছে গত পাঁচ দশকের কানাডার জীবনও।

সেই ১৯৬৮ সালে মোহনীয় এক পুরুষ পিয়ের ট্রুডো প্রধানমন্ত্রী হলে তাই নিয়েও কথা বলেন ঝর্ণা। কানাডার সমাজে সমকামিতার কথা বলতেও দ্বিধা করেন না তিনি। বলেন বাঙালি কায়দায় নিজের প্রেম-সময়ের কথা। বিয়ের কথা, সংসারের কথাও বাদ যায় না লেখাতে। ১৯৬৯ সালে চাঁদে মানুষের অবতরণের টেলিভিশন স্মৃতিও পাওয়া যায় এই বইতে। ১৯৮৫ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার বিধ্বংসী ঘটনার উল্লেখও রয়েছে এই বইতে। ২০০০ সালে ভিয়েনাতে জাতিসংঘের বিশ্বসম্মেলনে কানাডার আইনমন্ত্রী অ্যান ম্যাকলেননের সঙ্গী হবার গল্পও রয়েছে এই বইতে। নায়াগ্রা-অন-দ্য-লেইকে শ ফেস্টিভ্যালে নাটক নিয়েও কথা রয়েছে এই রচনায়। আরও আছে ড্রাইভ-ইন সিনেমাতে সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতার কথা। নিজের বাড়ির বেইজমেন্টে ঘরের মানুষেরা মিলে দুর্গাপূজার মহালয়া করার স্মৃতিও বাদ যায় না এই আত্মজৈবনিক গদ্যে।

কানাডার থাকা কোনো বাঙালির লেখা এমন জীবনগ্রন্থ আর আছে কি না আমার জানা নেই। গদ্যের স্বাদুতার কারণে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলেছি পুরো পাণ্ডুলিপি। ঝর্ণাদিদির ইচ্ছেমতো ভূমিকাও লিখে ফেলেছি দ্বিতীয় নিঃশ্বাসেই। বার বার অনুতাপ হচ্ছে কেন মানুষটার সাথে আমার সংযোগ ঘটলো না আরও আগেই। কেন তাঁর লেখালেখির খবর আমার চেনা বলয়ের কেউ দিতে পারলেন না? কেন কানাডায় থাকা এমন মেধাবী এক বাঙালি লেখকের কথা জানতে আমাদের বাকি লেখকদের এতো দেরী হয়ে যায়!

গত দশ বছর ধরে আমিতো আসলে এমন একটি বই-ই খুঁজছিলাম। যে বই এই কানাডায় বাঙালিদের অভিবাসনের অভিজ্ঞতার কথা বলবে। তাঁদের দৈনন্দিন চড়াই-উৎরাইয়ের কথা বলবে। নতুন দেশে এক বাঙালি সন্তানের কালচারাল শক বা সাংস্কৃতিক ধাক্কার কথা বলবে।
ঝর্ণা চ্যাটার্জীকে অভিনন্দন তিনি সেই বইটি আমাদের উপহার দিলেন।
ঝর্ণা চ্যাটার্জী, আপনি আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করুন।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles