7.1 C
Toronto
শুক্রবার, মার্চ ১, ২০২৪

সুলতান মাঝি

সুলতান মাঝি

একাত্তর থেকে বলছি। সে সময় জীবন বাঁচাতে অনেক পরিবারের মতো পরিবার থেকে ছিন্নভিন্ন হয়ে আমরাও আত্মগোপন করে ছিলাম। ঢাকা থেকে পালিয়ে যখন দাদার গ্রামের বাড়িতে আব্বা আমি আর আমদের এক দাদী গিয়ে উঠি তখন আম্মা ছিলেন তার বাবার বাড়ি। সম্ভবত এপ্রিল মাসে সুলতান মাঝিকে আব্বা পাঠিয়ে দিলেন ছোট দুই বোন (রুনি, রোজী) এবং আম্মাকে নিয়ে আসতে। সুলতান আগে কী কাজ করতো জানি না, তবে যুদ্ধ লেগে যাবার পর সে নৌকার মাঝি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ভয়াবহ বিপদে ঢাকা খুলনা যশোর বিভিন্ন যায়গা থেকে লোকজন গ্রাম মুখি হওয়ায় চলাচলের যে সংকট তৈরি হয় সুলতান মাঝি সেই সংকট লাঘব করার জন্য নৌকা নিয়ে যুদ্ধে যোগ দেয়। তার কাজ হলো পাকিস্তানী মিলিটারির চোখ ফাঁকি দিয়ে লোকজনকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়া। শরীর কাঠামো এবং ভয়কে জয় করে চলার কারণে কাজটা বেশ ভালোভাবেই করতে পেরেছিল সে।

- Advertisement -

কোন এক সময় আব্বার প্রয়োজন পড়ে একজন পেশাদার মাঝি। গন্তব্যে পৌঁছে দেবার জন্য বিশ্বস্ত একজন লোক খুবই জরুরী ছিল। কেউ একজন গিয়ে সুলতানকে ডেকে আনে। প্রথম দিন থেকেই সুলতান হয়ে গেল আব্বার ভীষণ ভক্ত এবং আমাদের পরিবারের প্রধান পারাপারকারী। আব্বার অনুরোধে মধুমতী নদীতে নৌকা ভাসিয়ে খাল বিল পাড়ি দিয়ে গোপালগঞ্জের খাটিয়া গড় গ্রাম থেকে আম্মা আর ছোট দুই বোনকে নিরাপদে নিয়ে এলো সুলতান। খানিকের জন্য পরিবারের মিলন হলো। এরপর একদিন মুক্তিবাহিনী কমান্ডার শেখ হাবিব এলেন ভারত থেকে একটি দল নিয়ে। এসেই আব্বার সাথে দেখা করলেন তিনি। আব্বার সুপারিশে সুলতান হয়ে গেল শেখ হাবিবের মুক্তিবাহিনীর বাহক। আমি যখন
কমান্ডার হাবিবের দলে যোগ দেই তখনও সুলতানের নৌকায় চড়ে টহল দিয়েছি দিনে রাতে। তবে কিছুদিনের মধ্যে আব্বা আর আমি ইন্ডিয়া চলে যাবার কারণে সুলতানের দেশ প্রেমের সবটা স্বচক্ষে দেখা হয়নি। স্বাধীনতার পর ইন্ডিয়া থেকে ফিরে এলে আম্মা সহ অনেকের মুখে শুনেছিলাম সুলতানের ত্যাগ ও কর্তব্যপরায়ণতার বিবরণ। ওর প্রতি এতোই কৃতজ্ঞতা জন্মেছিল যে সুলতানকে নায়ক করে মুক্তিযুদ্ধের একটি গল্প লিখেছিলাম। গল্পের নাম ‘জন্ম মৃত্যু পাকা বেল’। গল্পটা যখন লিখেছিলাম তখন সুলতানের নাম মনে করতে পারছিলাম না। তাই গল্পের নায়ক হয়ে যায় কিসলু। কিন্তু নায়কের নাম কিসলু হলেও ঘুরেফিরে মুক্তিযুদ্ধকালীন এক পারাপার সৈনিকের গল্প লেখার চেষ্টা করেছিলাম।

সেই গল্পের একটি জায়গায় লিখেছিলাম; ‘ভীষণ নীরবতার ভেতর দিয়ে কিসলু নৌকা এগিয়ে নেয়। নৌকার কোন যাত্রীরা তেমন শব্দ করে না। চারিদিকে অথৈ পানি এবং ভীষণ নীরবতা। এতোটাই নীরব যে মাথার উপর দিয়ে পাখি উড়ে গেলে ডানার শব্দ শোনা যায়। অল্প দিনেই কিসলু পাকা মাঝি হয়ে উঠেছে। যতটুকু সম্ভব বড় নদী এড়িয়ে খাল-বিল-হাওর-বাঁওড়ের ভেতর দিয়ে সে নৌকা ঢুকিয়ে দেয়। উঁচু উঁচু ধানগাছ অথবা গাদা গাদা কচুরিপানার মধ্য নৌকা ঢুকিয়ে সে ক্লান্ত হয়ে পরে। অথচ তার নৌকা থেমে থাকে না কোথাও। পেছনে বিপদ, সামনের দীর্ঘ পথ। দিন-রাত্রি চলে তার ভেসে বেড়ানো।‘

কথা হলো, সুলতানের নাম জানলাম কী করে। গত বছর বাংলাদেশ গিয়েছিলাম। আমার বড় চাচার বড় মেয়ে অর্থাৎ রিজিয়া বুজি হলেন এখন আমাদের মুরুব্বী বোন। বুজির বাসায় একদিন খেতে গেলে বুজির বড় ছেলে জাহাঙ্গীর ছোট ছোট দুটি মেয়ের হাত ধরে আমার কাছে নিয়ে আসে। এরপর জাহাঙ্গীর বলে, মামা যুদ্ধের সময় আপনাদের যে মাঝি ছিল সুলতান, তার কথা মনে আছে? আমি তো লাফ দিয়ে উঠি। এই নামটাই মনে করতে পারছিলাম না। সুলতানের কথা মনে থাকবে না কেন। সব মনে আছে। এরপর জাহাঙ্গীর বলল, এরা হলো সুলতানের নাতিনের সন্তান। মানে সুলতানের মেয়ের মেয়ের মেয়ে এই দুই বোন। জাহাঙ্গীর আরো বলল, এখন ওরা এই বাড়িতে আম্মার কাছে থাকে। আমার মনে হচ্ছিল ওদের দুজনকে বুকে জড়িয়ে ধরি কিংবা পা ধরে সালাম করি। এক পলকে চলে যাই একাত্তরে। আম্মার মুখ ভেসে ওঠে। আব্বার মুখ ভেসে ওঠে চোখের সামনে। বারুদের গন্ধ পাই। আমার চোখ ভিজে যায়। বুজির মেয়ে জ্যোৎস্না পরিচয় করিয়ে দিলো মামা, বড় জনের নাম নাদিরা আর ছোটজন আনিকা। নাদিরা আর আনিকার হাতে হাত রেখে আমি সুলতান মাঝির সম্পর্কে কিছু কথা বললাম। আমার কৃতজ্ঞতার কথা ওদের জানালাম। ওরা দুই বোন চোখ তুলে আমার দিকে তাকিয়ে আমার সব কথা শুনল। এরপর নাদিরা বললো, সে কে? তাকে তো আমরা চিনি না।

পলকেই একাত্তর থেকে ফিরে এলাম দুই হাজার বাইশে। বুঝতে পারলাম, সুলতান মাঝিকে কেউ মনে রাখেনি। হয়তো এমন করে কেউ কোনদিন সুলতানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেনি। কাজেই কথার সুতোয় আটকে থাকেনি সে। অথবা ছোট্ট দুটি মেয়ে জানে না এক বীরের রক্ত বইছে ওদের শরীরে। বংশপরিচয় হয়তো এভাবেই হারিয়ে যায়।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles