অফিস ও ভদ্রলোকের গল্প

- Advertisement -

ছবি/অটোয়া সিটি

এ বিশ্বে গুটিকয়েক মানুষের মুখের কথা আমি একদম বুঝি না। তখন মনে মনে হেমন্তের সেই গানটা গাই-
“তুমি কি যে বলো বুঝি না।
তোমার মুখের পানে চাহিলে আমি-
কিছু শুনি না।
তার চেয়ে চোখে নয় রাখ চোখ,
এভাবে দুজনার কথা হোক?…”
যেমন আমাদের অফিসের বড় বস।
প্রায় তিন মাস হতে যাচ্ছে এখানে জয়েন করেছি; কিন্তু উনার ভদ্র, সুন্দর, স্মার্ট ব্রিটিশ উচ্চারণ আমি ধরতে পারি না। কথাও বলে আস্তে। তার কথা যারা বুঝে, তাদের দিকে চেয়ে বিস্ময়ে ভাবি, এরা কি ট্যালেন্ট রে! অথচ ব্রিটিশ উচ্চারণ আমার খুব পছন্দ, এমন কি আমি নিজেও আসলে কিছুটা ব্রিটিশ উচ্চারণে ইংলিশ বলি; “র” উহ্য রেখে। উনার সাথে যদিও কম কথা হয়। আমি যখন তার কথা আরেকবার রিপিট করতে অনুরোধ করি, তখন আবার হুবুহু একই রেজাল্ট পাই। আবার প্রতি মঙ্গলবার তার সাথে মাইক্রোসফট টিমস এর ভিডিও কনফারেন্সে আমাদের কাজ সংক্ষেপে ব্রিফও করা লাগে।
.
এই ভদ্রলোক খুব কর্মঠ। কাজও করে অনেকের চাইতে বেশি। Bবয়স পঁয়ষট্টির কাছাকাছি হবে। খুব রেস্পেক্ট করি। প্রতিদিন সকালে নিজে কফি বানাবে, অন্যদেরও খাওয়াবে। একদিন এসে বলল, জাভেদ কফি খাবা? আমি শুধু কফি শব্দটা বুঝেছি। উত্তর দিলাম- ধন্যবাদ নোর্ম্, আমি আসলে কফির খুব একটা ভক্ত নই, চা প্রিফার করি।
মিটিং ফোবিয়া আমার মাঝে সুস্পষ্ট। কোভিডের কারণে ডেস্ক মিটিং হয় না। কথায় কথায় এখন মিটিং। আবার ইদানিং রান্নাও শেখানো হয় জুম্ এ। এদের খেয়ে দেয়ে কাজ নাই, আজাইড়া..। প্রথম প্রথম মিটিং-এ লেট্ করতাম। সবাই জানতো জাভেদ ঢুকবে সবার শেষে। তারপর দেখা যেত আমার মাইক্রোফোন বন্ধ, অথচ কথা বলেই যাচ্ছি হাবা-কালার মতো। পাশ থেকে কোনো কলিগ এসে ঘাড়ে টোকা দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে যেত, “তোমার মাইক্রোফোন অন করো জাভিড!”
এই মিটিং ফিটিং আমার খুব অপছন্দ। গরিবের আবার..! এর হাত থেকে পলায়ন করতে যত তাড়াতাড়ি পারি অফিসে গিয়ে কিছু ইমেইল রিপ্লাই দিয়ে, ইমেডিয়েট বসের সাথে কাজ নিয়ে আলাপ করে ফীল্ডে ছুটি। নোর্ম্ এর মিটিং প্রতি মঙ্গলবার নয়টায় ধরাবাধা, তাই পৌনে নয়টার আগেই পালাই। প্রথম পলায়ন শুরু করার আগে তার কাছে গিয়ে বললাম- নোর্ম্, আমি মনে হয় আজকে তোমার মিটিং এ থাকতে পারবো না। ফীল্ডে থাকবো
– ঠিক আছে। এরকম অনেকেই পারে না
– থ্যাংকস এ লট!
ব্যাস! পলায়ন জায়েজ করে ফেললাম। তবে একজনের সাথে মিটিং করতে খুব ভালো লাগে। উনি হলেন আমাদের এডভাইজার। ভদ্রলোক থাকে লন্ডন, অন্টারিওতে। খুব হাসিখুশি, রসিক। মনের সুখে জুম্ মিটিং করা যায়। আধা-ঘন্টা/পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মিটিং শেষ হলে মনে হয় আরেকটু বেশি হলে কী ক্ষতি হতো? নোর্ম্ যদিও এখানে শ্রোতা হিসাবে বসে থাকে।
যাই হোক, আমাদের ব্রিটিশ বড় সাহেব বসেন ছোট্ট এক কর্নারে। আমার ধারণা উনার ডেস্ক এর চেয়ে আমার ডেস্ক অনেক সুন্দর আর দামি। যদিও আমি ছোট পোস্টের কর্মী। এদেশে এই জিনিসটা বেশিরভাগ অফিসেই দেখা যাবে। কেউ এসে ঢুকলে বুঝতেই পারবে না কোনটা বস, কোনটা ক্লার্ক, কোনটা পার্টটাইমার। তার ওপর বস যদি কফি বানিয়ে ডেস্কে ডেস্কে সেধে দিয়ে আসে; বাংলাদেশের পিয়নের মতো..
আজকে ক্যাসাব্লাঙ্কা সিনেমা নিয়ে কলিগদের সাথে আলাপ করছিলাম। ভদ্রলোক আমাদের মাঝে এসে যোগ দিয়ে সিনেমাটা কয়বার দেখছে, কত সুন্দর সেটা বলতে লাগলো। আমার দিকে তাকিয়েও কি জানি বলল, আমি মিষ্টি হেসে চোখে চোখ রেখে চেয়ে থাকলাম অপলক। প্রেমিকের মতো। এভাবে আর হয় না, ভদ্রলোককে জানাতেই হবে ঘটনাটা। মনে মনে রাগও হলো, আরে ব্যাটা তুই থাকিস কানাডা, এখনো ঐ খাঁটি ব্রিটিশ স্টাইলে কথা কেন বলিস? খুব রাজবংশের ফিরিঙ্গি জমিদার হইছিস, না?
আমার ইমিডিয়েট বস বলেছিল আমার যদি কোনো কোর্স করার ইচ্ছা থাকে; যেমন- এক্সেল, কম্পিউটার বা ফ্রেঞ্চ লেঙ্গুয়েজ কিংবা অন্য যে কোনোটা; তাকে যেন জানাই। অফিস এ ব্যাপারে খুব লিবারেল।
আমার খায়ে-দায়ে কাজ নাই, এই বয়সে এখন ওসব শিখবো..। এক্সেল যেটুকু পারি, চালিয়ে দেওয়া যায়। আর ফ্রেঞ্চ শিখবো? আমাকে পাগলে কামড়াইছে? যদিও অটোয়াতে ফ্রেঞ্চ এর খুব চলন। ফ্রেঞ্চ জানা থাকলে চাকরি-বাকরির ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা মেলে। আমার যখন এই অফিস থেকে ইন্টারভিউ নেওয়া হয়, তখন সেটাও ছিল জুম্ মিটিং। তখন আমি টরন্টো থাকতাম। ভাইভা’তে নোর্ম্ ও ছিল। ভাগ্য ভালো সে সেদিন তেমন কিচ্ছু জিজ্ঞেস করে নাই, শুধু বিরক্ত চোখে চেয়ে ছিল। তা না হলে এতদিন আমাকে টরন্টোতেই থাকা লাগতো।
যাই হোক, নোর্ম্ এর কথা আজকেও বুঝতে না পেরে মনে মনে ভাবলাম, আহা রে.. ব্রিটিশ অ্যাকসেন্ট নিয়ে যদি কোনো কোর্স থাকতো; তবে কসম, আজ থেকে শুরু করে দিতাম! অথচ বাসায় আমি আর আমার মেয়ে ব্রিটিশ অ্যাকসেন্ট/প্রোনাউনসিয়েশন নিয়ে গত পাঁচ বছর ধরে কত ইয়ার্কি ফাজলামি, হাসাহাসি করি। বাংলাদেশে থাকতে বোনের সাথেও এই ফাজলামি করতাম। ফলস্বরূপ আল্লাহ এতবড় শাস্তি আমাকে দিলো?
আজকে ফিল্ডে যাবার আগে দেখি ডাইনিং এ নোর্ম্ ঢুকতেছে। ভাবলাম এই একটা সুযোগ। আর কতকাল চোখে চোখে কথা বলবো? এবার বলেই ফেলি? কাছে এগিয়ে বললাম, নোর্ম্, তোমাকে কিছু বলার ছিল
– বলো?
– আমি সত্যি খুব দুঃখিত। কারন তোমার অসাধারণ, স্মার্ট ব্রিটিশ উচ্চারণের ব’ও বুঝি না!
– এ আর নতুন কি.. অনেকেই বুঝে না। তা এতদিন যে এতো কথা বললাম, কিচ্ছু বুঝো নাই?
– না। যখন দেখবা তোমার প্রশ্ন কিংবা কথা শুনে আমি ড্যাপ ড্যাপ করে চেয়ে আছি, বুঝে নিবা আমি কিচ্ছু বুঝি নাই
– ঠিক আছে, কোনো চিন্তা করো না। তোমাকে কফি দেই?
– আমি কফি কম খাই। ঐ দেখো আমার চায়ের সরঞ্জাম..
– তা এখন ক্যামনে বুঝলা কথা?
– জানি না। থ্যাংক ইউ নোর্ম্!
.
পা ছুঁয়ে সালাম করতে গিয়েও করলাম না। তখন যদি আবার আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে- “ঠুমি বেশে ঠাখো বাবা..হোনেক বুড়ো হউ..”

বিগ রিলিফ! কেল্লা ফতে। ভদ্রলোক কিচ্ছু জিজ্ঞেস করলে এখন থেকে উত্তর না দিলেও চলবে! আর বুঝতে পারলেও চুপ মেরে থাকবো। ব্যাটা তুই নর্থ আমেরিকার ইংরেজির কোর্স করে তারপর আমার কাছে আসিস। ভদ্রলোক অবশ্য এমনিতেই আমার কাছে আসতে এখন দুইবার করে ভাববে..
কি তামশা!

- Advertisement -

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles