-4.7 C
Toronto
শনিবার, ফেব্রুয়ারী ৪, ২০২৩

সেদিন ছিলো ২২ তারিখ

সেদিন ছিলো ২২ তারিখ
আইবুরো ভাত হলুদ মেহেদী নাচ গান কিছুই বাদ রইলো না

তারপরের কয়েকটা দিনের গল্প ছিলো সংক্ষিপ্ত । ঈদ এর পরদিন দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর সবাই মিলে ঢাকার বাসার দিকে রওয়ানা হয়েছিলাম , যেহেতু বিয়েটা ঢাকাতেই হবে।। সেদিন ছিলো ২২ তারিখ । ২৯ তারিখ আমার বিয়ে। মাত্র ৬ দিন বাকি। ঢাকা নামতে নামতেই শুরু হয়ে গেলো বিয়ে বাড়ি । বাবা মায়ের ছোট মেয়ে বোনদের সবার ছোট বোন কাজেই কোন অনুষ্ঠানই বাদ রাখা যাবে না। আইবুরো ভাত, হলুদ মেহেদী , নাচ গান কিছুই বাদ রইলো না। ছেলের বাড়ি থেকে হলুদের সাজগোজ নিয়ে আসা, আমাদের বাড়ি থেকে পাত্রের জন্য সাজগোজ নিয়ে যাওয়া সব কিছুই জাঁকজমক হোলো । সারা বাড়িতে আত্মীয় স্বজনের আসা যাওয়া আনন্দ ফুর্তি চলতে লাগলো । সব কিছু আমাকে ঘিরে হচ্ছে। আর আমি নির্বাক , অনভুতি হীন ভাবে তাকিয়ে থেকেছিলাম। আমার মনে হচ্ছিলো
আমার কোন বোধ শক্তি নেই আবার মনে হচ্ছিলো এটা আমার কোন হেলোসিনেসান নয় তো ?

তারপর এসে গেলো ২৯সে অগাস্ট তোমাকে চিরতরে হারিয়ে ফেলার দিন। বিয়ের আগের দিন রাতেও আমি সৃষ্টি কর্তার কাছে কেঁদে কেঁদে প্রার্থনা করেছি- এমন কোন মিরাকেল কি তুমি দেখাতে পারো না যে কোন কারনে বিয়েটা হোল না । না সে রকম কোন ঘটনা আমার জীবনে ঘটে নি। বিয়েটা কোন হলে হয়েছিলো আজ ৪৩ বছর পরে আমার কিছু মনে নেই। তবে হলটা বড় ছিলো বুঝতে পেরেছিলাম বহু মানুষের সমাগম দেখে। অবশেষে আমার অদেখা অচেনা আমেরিকা ফেরত ইঞ্জিনিয়ারিং এ পি, এইচ ডি পাত্রের সাথে আমার বিয়েটা হয়ে গেলো । বিয়ে পরানোর সময় আমি কাঁদতে কাঁদতে প্রায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। সেটা অবশ্য তেমন কেউ বুঝতে পারে নি শুধু আমাকে জড়িয়ে ধরে যে দুই একজন ঘনিষ্ট লোক বসে ছিলো তারাছাড়া । উনারা খুব আন্তরিকতার সাথে ব্যাপারটা সামলে নিয়েছিলেন। বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ হলে আব্বা, আম্মা, ভাই বোন সবাইকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেটে সবাইকে কাঁদালাম । আব্বা কাঁদতে কাঁদতে আমাকে জড়িয়ে ধরে বরের গাড়ীতে নিয়ে বসালেন ।

- Advertisement -

তারপর আমি কিছু বলতে পারবো না । কারা আমাকে গাড়ী থেকে নামালো । কারা বধূ বরণ করলো কারা আমাকে বাসর সাজানো ঘরে বসালো আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমার শ্বাশুরী ছেলে বউকে পাশাপাশি বসিয়ে মিষ্টি সরবত খাওয়ালেন । অনেকক্ষন ধরে ঐ বাড়ীর ননদ , ভাবী শ্রেণীর সবাই আমার সাথে হাসি দুষ্টামি করার চেষ্টা করলো । কিন্তু আমার কানে মোটামুটি কিছুই ঢুকছিলো না। আমি মাথা নিচু করে বসেই ছিলাম ।

পরদিন সকালে নিয়ম অনুযায়ী আমার কাজিনরা আমাকে দেখতে এসেছিলো । ওরা বাড়ীতে ফিরে যাবার সাথে সাথে সবার জিজ্ঞাসাবাদ কেমন দেখলো আমাকে ঠিক মতো সাজগোজ করে আছিতো ? রিপোর্ট ভালো গেলো না। আমি দামী একটা শাড়ি পরে বসে আছি, খোলা চুল কোন সাজগোজ নেই। গহনা বলতে শুধু চুরি পরে ছিলাম। এই খবরে আমার বোনেরা , আম্মা চিন্তিত হয়ে পড়েছিলো সেদিনই বিকেলে ছিলো বৌ ভাত একটা চাইনিজ রেষ্টুরেন্টে । বিকেল হবার আগেই আমার বোনেরা আমাকে সাজাবার জন্য একজন বউ সাজানোর মেয়ে নিয়ে হাজিয়ে হোলো। আমাকে সাজিয়ে গুছিয়ে তারপর ওরা গেলো । সিঙ্গাসন মার্কা একটা চেয়ারে আমাকে বউ সাজিয়ে বসিয়ে দেয়া হোল । অতিথীরা আসতে থাকলো । আমাকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একে একে সবাই দেখছে। কেউ কেউ আবার আগ্রহ নিয়ে গহনা দেখছে। কোনটা কোন বাড়ি থেকে দেয়া হয়েছে সেটাও অনেকের আগ্রহ জানার। আমার পাশে বসা ছিলো আমার এক ঘনিষ্ঠ বান্ধুবী , আমার হয়ে সেই সব প্রশ্নের জবাব গুলো দেবার চেষ্টা করছিলো । আবার একজন আরেকজনকে বলতে শুনলাম দেখেন বউটা কি মিষ্টি দেখতে কেমন টকটক করছে গায়ের রং ।আসলে ৪৩ বছর আগের মানুষ গুলো অনেক সোজা সরল ছিলেন। বিয়ের ব্যাপারে জিনিস পত্রের ব্যাপারে তাদের আগ্রহটা একটু বেশীই ছিলো । খাওয়া দাওয়া অতিথী বিদায় শেষ করে আবারো নিয়ম অনুযায়ী আমাদের বাসায় ফিরা ।
জামাই বরণ করা হোলো। আবারো পাশাপাশি বসে সরবত মিষ্টি খাওয়া । তারপর দিন ফরিদপুরের দিকে রওয়ানা । আমার বরদের আসল বাড়ি । আবারো বঁধু বরণ । তারপর দিন আবার বউভাত । তারপর দুই দিন ফরিদপুর থেকে আবার ঢাকা আসা । আমার শরীর মন সব ক্লান্ত। আমি কলের পুতুলের মতো আসছি যাচ্ছি । বার বার বৌ সাজছি । এদিকে আমার পরিবারের লোকজন আমাদের হানিমুনে যাবার টিকেটও বুক করে ফেললো । এ যেনো ছিলো আমার সান্তনা পুরুস্কার। আমার চাচা বিরাট সরকারি কর্মকর্তা । তিনি তাঁর পরিচয় প্রয়োগ করে একদিনের মধ্যে ভারতের ভিসা বের করে দিলেন। আমরা ঢাকা দুদিন থেকে দিল্লি আগ্রা চলে গেলাম। দিল্লি আগ্রার বিভিন্ন জায়গাতে ঘুরে তাজমহল দেখলাম। সেখানে সাপ্তাহ ২ ছিলাম। এই দুই সাপ্তাহে অপরিচিত মানুষ টাকে চিনলাম জানলাম। তিনি ছুটি বাড়িয়ে নিয়েছিলেন তার কাজ থেকে। দুই সাপ্তাহ পরে আমাকে বাংলাদেশে রওয়ানা করিয়ে দিয়ে তিনি চলে গেলেন তার কর্ম স্থানে। আর আমিও দুদিন বাসায় থেকে ফিরে গেলাম হলে।

আমার প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় , আমার প্রিয় সামসুন্নাহার হল আমার প্রিয় বন্ধুদের কাছে ফিরে এলাম ঠিকই কিন্তু আমার আগের জীবন হারিয়ে গেলো আমার কাছ থেকে। আমার এখন আর হাওয়াই চপ্পল পরে ছুটে রাস্তা পার হতে ইচ্ছে করে না। আমি আগের মতো বন্ধুদের সাথে লাফিয়ে চার তালায় উঠি না ক্লাসে যেতে । প্রথম দিন ক্লাসে একটা নতুন জামদানি শাড়ি পরে গিয়েছিলাম। আমাকে দেখে আমাদের বন্ধু কামাল বলে উঠলো , কি শ্বশুর বাড়ি থেকে এমন কয়টা শাড়ি পেয়েছো ? কামালের কথাটা সেদিন আমার বুকে কাঁটার মতো বিধেছিলো । আমার জীবন থেকে উচ্ছলতা পুরো পুরী হারিয়ে গেলো । আমি তখন বন্ধুদের রুমে আড্ডা দিতে যাই না। হলের বাইরে হাঁটতে যাই না। আমার মনে হচ্ছিল আমার বয়েসটা যেনো এক লাফে কয়েক বছর বেড়ে গেছে। সারাক্ষন একটা হারিয়ে ফেলার হাহাকার আমাকে চুরমার করে ফেলছিলো । প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় আমার কাছে মনে হতে লাগলো আমার জীবনের শোক স্তম্ব এর থেকে বের হতে পারলে যেনো আমি বাঁচি । আমি মানসিক ভাবে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে গেলাম।

সামনে পরীক্ষা । শামা আমাকে এতদিন মিস করা সব ক্লাসের নোট দিলো পড়তে । আমি খাতা খুলে বসে থাকি পড়তে পারিনা। আমার চোখ দিয়ে টপ টপ পানি পড়ে ।
শামা একদিন আমার পাশে বসে আমাকে বুঝিয়ে বললো , তুই এখানে থাকতে পারবি না। দেখতেতো পাচ্ছি পড়তেও পারিস না। শুধু কাঁদিস । তুই বরং তোর বরের কাছে বিদেশ চলে যা । বরের কাছে চলে গেলে ধীরে ধীরে সব ভুলে যাবি । এমন ঘটনা তো কতোই হচ্ছে এবং সবাই সব কিছু ভুলে সুখে শান্তিতে সংসার করে। আর তোর যখন সুযোগ আছে দেশের বাইরে যাবার চলে যা । এটা তোর রায়হান ভাই দুজনের জন্যই ভালো । তাহলে উনারও তোকে ভুলে যাওয়া সহজ হবে।

ম্যাল্টন, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles