3 C
Toronto
শুক্রবার, ডিসেম্বর ২, ২০২২

‘মাদক সংশ্লিষ্টতা’ নাকি রাজনৈতিক বিদ্বেষ, কোনটা কাল হলো ফারদিনের?

‘মাদক সংশ্লিষ্টতা’ নাকি রাজনৈতিক বিদ্বেষ, কোনটা কাল হলো ফারদিনের?

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র ফারদিন নূর পরশ (২৪) হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে। ফাঁদে ফেলে তাকে হত্যা করা হতে পারে অথবা ভাড়াটে খুনিরা হত্যা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মরদেহ উদ্ধারের চারদিন পার হলেও এখনো ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু নতুন বিষয় সামনে আসায় সেগুলো নিয়ে ‘ক্লু’ উদ্ঘাটনে কাজ চলছে। ফলে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রহস্য উন্মোচনে সময় লাগছে।

- Advertisement -

এদিকে, মাদকের সঙ্গে ফারদিনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। তবে বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে তার পরিবারের দাবি, ফারদিন মাদকের সঙ্গে কখনোই সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনি খুবই মেধাবী ছিলেন। ফারদিন ধনীর দুলাল নন, ফলে তাকে স্ট্রাগল করে বড় হতে হয়েছে। তার বাবার উপার্জন খুব বেশি নয়। এ অবস্থায় নিজের পড়ালেখার খরচ জোগাতে কোচিং ও টিউশনি করতেন ফারদিন। সেই টাকা থেকে ছোট দুই ভাইয়েরও খরচ দিতেন তিনি।

ফারদিনের পরিবারের দাবি, বুয়েটের কোনো শিক্ষার্থীকে মাদক সংগ্রহ করতে হলে অত দূর যেতে হয়? ঢাকা মেডিকেল এলাকায় কোন জিনিস পাওয়া যায় না? পরদিন যে ছেলের পরীক্ষা সে কীভাবে মাদক আনতে এতদূর যাবে?

ফারদিন বুয়েটের হলেও থাকতেন না। বাসায় থেকে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছিলেন বলে জানিয়েছে তার পরিবার।

এদিকে, র‌্যাবের সঙ্গে ‘গোলাগুলিতে’ চিহ্নিত মাদক কারবারি ‘সিটি শাহীন’ নিহতের ঘটনার সঙ্গে ফারদিন হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছে র‌্যাব।

র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মোমেন বলেন, শাহীন চিহ্নিত মাদক কারবারি। তাকে দীর্ঘদিন ধরে খোঁজা হচ্ছিল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ‘সিটি শাহীনের’ অবস্থান নিশ্চিত হয়ে র‌্যাব-১ বৃহস্পতিবার (১০ নভেম্বর) দুপুরে নারায়ণগঞ্জের চনপাড়া বস্তিতে অভিযান চালায়। র‌্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে সিটি শাহীন ও তার ১০/১২ জন সঙ্গী (অস্ত্রধারী দল) র‌্যাবকে উদ্দেশ্য করে গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে র‌্যাব পাল্টা গুলি ছুড়লে পায়ে গুলিবিদ্ধ হন শাহীন। পরে রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে তিনি মারা যান।

বুয়েট শিক্ষার্থী ফারদিন নূর পরশ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে তার বান্ধবী বুশরাকে কেন্দ্র করে প্রথমে তদন্ত চলে। তবে এরপর আরও কিছু বিষয় তদন্তকারীদের সামনে আসে। এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে বর্তমানে শত্রুতাবশত, ডিবেটিং চ্যাম্পিয়নশিপে স্পেনে যাওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যা, রাজনৈতিক বিদ্বেষ ও প্রেমঘটিত কারণসহ আরও কিছু বিষয় সামনে এনে তদন্ত চলছে। এছাড়া পেশাদার মাদক কারবারিদের হাতে ফারদিন খুন হতে পারেন এমন সন্দেহও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। প্রযুক্তিগত তদন্ত ও সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা এসব তথ্য জানান।

ফারদিনের চাচা আবু ইউসুফ বলেন, ফারদিন মাদকের সঙ্গে কখনোই সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনি খুবই মেধাবী ছিলেন এবং স্ট্রাগল করেই তাকে বড় হতে হয়েছে। কোচিং-টিউশনি করে নিজের পড়ালেখার খরচের পাশাপাশি ছোট দুই ভাইয়েরও খরচ দিতেন ফারদিন।

তিনি বলেন, পারিবারিকভাবে ফারদিনের কোনো শত্রু ছিল না। ফারদিনের স্কুল, কলেজ ও বুয়েটের কারও সঙ্গে কখনো শত্রুতা ছিল না। এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে আমরা এখনো পুরোপুরি অন্ধকারে আছি। তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন ধৈর্য ধরেন।

আবু ইউসুফ আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের আসল ঘটনা যেন অন্যদিকে প্রবাহিত না হয় আমাদের দাবি এটাই। ফারদিনের মা বলেছেন তার ছেলে এক-দুইটা প্রেম করছে- এমন ঘটনাও নেই।

ফারদিনের বাবা নূর উদ্দিন রানা বলেন, আমার তিন ছেলের কেউই সিগারেট পর্যন্ত খায় না। বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়া তারা সহ্য করতে পারে না। শুধু সিগারেট নয়, কোনো খারাপ বিষয় আমার ছেলের মধ্যে ছিল না। ফারদিন যেহেতু বাসায় থেকে লেখাপড়া করেছে, তাই ওর মা ছেলের বিষয়ে আমার থেকে ভালো জানবে। ওর মা কখনো তিন ছেলের কারও মুখে সিগারেটের গন্ধ পায়নি।

তিনি বলেন, বুয়েটের শিক্ষার্থীকে মাদক সংগ্রহ করতে অতদূর যেতে হয়? ঢাকা মেডিকেল এলাকায় কোন জিনিসটা পাওয়া যায় না? পরদিন যে ছেলেটার পরীক্ষা সে কীভাবে মাদক আনতে এতদূর যাবে?

বুশরার বিষয়ে ফারদিনের বাবা বলেন, মামলায় বুশরাকে অভিযোগের তালিকায় আনা হয়েছে, সে আসামি নয়।

কোনো রাজনৈতিক সংঠনের সঙ্গে ফারদিন জড়িত ছিলেন কি না জানতে চাইলে নূর উদ্দিন রানা বলেন, আমার ছেলে কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা সংঠনের সঙ্গে জড়িত ছিল না।

ফারদিন একটা পোস্ট লিখেছিলেন জানিয়ে তার বাবা বলেন, ‘তার যদি মৃত্যু হয়, মৃত্যুর পরে তার নামে নামফলক লিখতে।’ নামফলকে দুইটি ওয়ার্ডে একটি লেখা থাকুক, সেটি হলো- ‘এ রিডার’। ফারদিন অনেক বই পড়তেন। এ কারণে তিনি পাঠক হিসেবে তার নামটি নামফলকে লেখার কথা বলেছিলেন বলে মনে করেন তার বাবা।

আসছে ডিসেম্বরে স্পেনে অনুষ্ঠেয় ওয়ার্ল্ড ডিবেটিং চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেওয়ার কথা ছিল ফারদিন নূর পরশের। ডিবেটিংয়ে কোনো শত্রু ছিল কি না জানতে চাইলে তার বাবা বলেন, এমন কিছু শুনিনি কখনো। তবে এই জায়গায় তদন্ত সংস্থা ও মিডিয়ারও একটি বড় প্রশ্ন।

ফারদিনের ছোট ভাই তামিম বিন নূর ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ভাইয়া নিজের টাকা আমার পিছে খরচ করতে পিছায় নাই। ক্লাস ৮-এ থাকতে আমার ক্যাম্পের কথা বললে বলসিলো আম্মুকে রাজি কর টাকা আমি দেবো। আমার ইভেন্টে যাওয়ার জন্য টাকা লাগলে সবসময় ভাইয়া বের করে দিত। আব্বুর কাছ থেকে নেওয়া লাগতো না। আমাকে কোনোদিন বলে নাই এইটা কর, এইটা ভালো, এইটা শেখ। আমি একদমই পড়ি না, তাই শুধু পড়া নিয়ে বলতো- তাও মাঝেমধ্যে। কোনোদিন কিছু নিয়ে চাপ দেয় নাই। আমি ক্লাসের অন্য দশটা বাচ্চার মতো, কিন্তু ভাইয়া আলাদা। ভাইয়াকে কোনোদিন কাউকে থাপ্পড় পর্যন্ত দিতে দেখি নাই। এমন মানুষকে ওরা মেরেই ফেললো?’

সূত্র জানায়, গত ৪ নভেম্বর নিখোঁজ হওয়ার রাতে ফারদিন কেরানীগঞ্জ, পুরান ঢাকার জনসন রোড এবং রূপগঞ্জ ও ডেমরাসংলগ্ন চনপাড়া এলাকায় অবস্থান করছিলেন। রাত ২টা ৩৫ মিনিটে তিনি ছিলেন চনপাড়া এলাকায়।

প্রযুক্তিগত তদন্তে আরও উঠে এসেছে, ওই রাতে ফারদিন তার বান্ধবী আমাতুল্লাহ বুশরাকে রামপুরায় নামিয়ে দেওয়ার পর আরেক বান্ধবীর সঙ্গে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করেন। ওই বান্ধবীর সঙ্গে রাত ১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত মেসেঞ্জারে কথা বলেন। তবে তাদের কথোপকথনে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি।

এদিকে, ফারদিনের ফেসবুক আইডি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ১৩ আগস্ট ‘সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতির পুনরুত্থানের আশঙ্কায় বুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিবৃতি’ শিরোনামে একটি লেখা পোস্ট করেন তিনি। পোস্টের ক্যাপশনে তিনি লেখেন- ‘দেয়ার ইজ নো প্লেস ফর এনি অর্গানাইজেশন স্টুডেন্টস পলিটিক্স ইন বুয়েট ক্যাম্পাস। লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার।’

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক ধারণা ছিল হত্যার পর ফারদিনের মরদেহ কেরানীগঞ্জ সংলগ্ন কোনো নদীতে ফেলা হয়েছে। তবে প্রযুক্তিগত তদন্তে ফারদিনের সর্বশেষ অবস্থান চনপাড়া এলাকায় নিশ্চিত হওয়ার পর গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, চনপাড়া সংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদীতে তার মরদেহ ফেলা হয়। সর্বশেষ যে স্থানে ফারদিনের অবস্থান দেখা যায়, শীতলক্ষ্যা থেকে সেটা সামান্য দূরে।

প্রযুক্তিগত তদন্তের সঙ্গে যুক্ত ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, রাত সাড়ে ১০টার দিকে ফারদিনের অবস্থান কেরানীগঞ্জে ছিল, এরপর জনসন রোড। সেখান থেকে যান চনপাড়ায়।

র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, বুয়েট শিক্ষার্থী ফারদিন হত্যাকাণ্ডে কিছু নতুন বিষয় নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে। সে রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে র‌্যাবের গোয়েন্দাসহ একাধিক টিম।

গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি প্রধান) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, এরইমধ্যে মামলাটি আমাদের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। গ্রেফতার বুশরাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এছাড়া আরও কয়েকজনকে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করছি। হত্যাকাণ্ডের পেছনের ঘটনা এবং রহস্য উন্মোচনে ডিবি কাজ করছে। এমন মেধাবী শিক্ষার্থীকে হত্যাকাণ্ডের পেছনে যারাই জড়িত থাকুক তাদেরকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।

তিনি বলেন, স্পেনে অনুষ্ঠেয় ওয়ার্ল্ড ডিবেটিং চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধি হিসেবে ফারদিনের অংশ নেওয়ার কথা ছিল। স্পেন যাওয়াকে কেন্দ্র করে কোনো শত্রুতা আছে কি না, পারিবারিক ও চলাফেরাসহ একাধিক বিষয় সামনে রেখে তদন্ত চলছে।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফারদিন নূর পরশ গত শনিবার (৫ নভেম্বর) থেকে নিখোঁজ ছিলেন। ওইদিনই রাজধানীর রামপুরা থানায় এ বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার বাবা কাজী নূর উদ্দিন। নিখোঁজের দুইদিন পর গত সোমবার (৭ নভেম্বর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ফারদিনের মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ।

এ ঘটনায় রাজধানীর রামপুরা থানায় ফারদিনের বাবা নূর উদ্দিন রানা বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছেন। বুধবার (৯ নভেম্বর) দিনগত রাতে নথিভুক্ত হওয়া এ মামলায় বুশরা নামে ফারদিনের এক বান্ধবীসহ অজ্ঞাতদের আসামি করা হয়েছে।

ফারদিনের বাবা নূর উদ্দিন রানা বিজনেস পত্রিকা ‘দ্য রিভারাইন’ এর সম্পাদক ও প্রকাশক। তিনি দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে সাংবাদিকতা করছেন। ফারদিনের মা ফারহানা ইয়াসমিন গৃহিণী। তাদের গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা উপজেলার নয়ামাটিতে। তিন ভাইয়ের মধ্যে ফারদিন ছিলেন সবার বড়। তার মেজ ভাই আবদুল্লাহ নূর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। ছোট ভাই তামিম নূর এবছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে।

ডিসেম্বরে স্পেনে যাওয়া হলো না ফারদিনের
ডিসেম্বরে স্পেনে অনুষ্ঠেয় ওয়ার্ল্ড ডিবেটিং চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেওয়ার কথা ছিল ফারদিন নূর পরশের। কিন্তু তার আগেই তিনি খুন হলেন। ফারদিন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন।

হাসপাতাল মর্গের সামনে কাঁদতে কাঁদতে ফারদিনের বাবা নূর উদ্দিন রানা বলছিলেন, মরদেহ পাওয়া গেছে। তবে যে সন্তানকে হারিয়ে ফেলেছি, তাকে তো এখন আর ফিরে পাবো না। ডিসেম্বরে ওর (ফারদিনের) ওয়ার্ল্ড ডিবেটিং চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার কথা ছিল। ডিবেটিংয়ে ফারদিন খুব ভালো ছিল। তার পাসপোর্টও রেডি হয়েছে। ডিবেটিং চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার জন্যই তার স্পেন যাওয়ার কথা ছিল।

সূত্র : জাগো নিউজ

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles