10.1 C
Toronto
বুধবার, অক্টোবর ৫, ২০২২

বাংলাদেশকে যুদ্ধের ফাঁদে ফেলার অপচেষ্টা করছে মিয়ানমার!

- Advertisement -

বাংলাদেশকে যুদ্ধের ফাঁদে ফেলার অপচেষ্টা করছে মিয়ানমার!

মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গারা নির্যাতনের শিকার হয়ে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা অবস্থান করছে।

১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝি মোহাম্মদ ওসমান বলেছেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সেখানকার মগ বৌদ্ধরা রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতন করে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান মিয়ানমারে অবস্থান করছেন। যাদেরকে নির্যাতনের মাধ্যমে আবার বাংলাদেশে পাঠাতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে। সীমান্তে উত্তেজনা তারই ইঙ্গিত বহন করছে বলে মনে করছেন এই মাঝি।

উখিয়ার নাগরিক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বহুমুখী ষড়যন্ত্রের গোলা তুমব্রু সীমান্তে। কঠিন প্রস্তুতি ও ধৈর্যের সাথে পাতানো ফাঁদের পরিস্থিতি অতি কৌশলে মোকাবেলা করাই উত্তম বলে মনে করছি।’

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে গোলাগুলি চলছে। রাখাইন রাজ্যের পাহাড় থেকে ছোড়া একটি মর্টার শেল এসে তুমব্রু সীমান্তের বিপরীতে শূন্য রেখায় পড়ে এক রোহিঙ্গা কিশোর নিহত হয়। এতে এক শিশুসহ পাঁচ রোহিঙ্গা আহত হয়। শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে উখিয়ার কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই কিশোরের মৃত্যু হয়।

আরও পড়ুন :: রাঙ্গার পর এবার জিয়াউল হক মৃধাকে জাপা থেকে অব্যাহতি

নিহত কিশোরের নাম মো: ইকবাল (১৫)। সে শূন্য রেখার আশ্রয় শিবিরের রোহিঙ্গা মুনির আহমদের ছেলে। আহত পাঁচ রোহিঙ্গার মধ্যে চারজনের পরিচয় পাওয়া যায়। এরা হলেন- জাহিদ আলম (৩০), নবী হোসেন (২১), মো: আনাস (১৫) ও সাহদিয়া (৪)।

তুমব্রু সীমান্তের বাসিন্দা ও ঘুমধুম ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য দিল মোহাম্মদ ভুট্টু বলেন, মিয়ানমারের পাহাড় থেকে ছোড়া মর্টার শেলের আঘাতে ছয়জন রোহিঙ্গা আহত হন। পরে ইকবাল নামে এক রোহিঙ্গা তরুণ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। এক শিশুসহ আহত পাঁচ রোহিঙ্গা বর্তমানে এমএসএফ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আহত ব্যক্তিরা একই পরিবারের সদস্য কিংবা আত্মীয় কিনা তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আবার মুহুর্মুহু গোলাগুলি শব্দ শোনা যায়। প্রায় তিন দিন গোলাগুলি বন্ধ থাকার পর আবার গোলাগুলি শুরু হয়েছে। মর্টার শেলের গোলার বিকট শব্দে কাঁপছে এপারের ভূখণ্ড। এতে এপারের ঘুমধুম ইউনিয়নের ২০ গ্রামের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। রাত ১০টা পর্যন্ত গোলাগুলি ও মর্টার শেল নিক্ষেপের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।

ঘুমধুম ইউনিয়নের স্থানীয় কৃষক মোহাম্মদ আলম বলেন, শনিবার সকালে মাঠে কাজ করার সময়ে এপারে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান।

শূন্য রেখার আশ্রয় শিবির ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান দিল মোহাম্মদ বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে মিয়ানমারের পাহাড় থেকে মুহুর্মুহ গুলিবর্ষণের পাশাপাশি থেমে থেমে মর্টার শেল ছোড়া হচ্ছিল। বেশ কিছু গুলি ও মর্টার শেল শূন্য রেখার বিভিন্ন জায়গায় এসে পড়ছিল। রাত ৮টা ২০ মিনিটের দিকে বিকট শব্দে একটি মর্টার শেল আশ্রয় শিবিরের ওপর এসে পড়ে। এত ছয়জন রোহিঙ্গা আহত হন। পরে একজনের মৃত্যু হয়। এর আগে ও পরে মিয়ানমারের একটি জেট ফাইটার বাংলাদেশ সীমান্তের অভ্যন্তরে তুমব্রু এলাকা চক্কর দিয়ে রাখাইন রাজ্যের দিকে ফিরে গেছে।

তুমব্রু সীমান্তের বিপরীতে শূন্যরেখায় পাঁচ বছর ধরে আশ্রয়শিবির গড়ে তুলে বসবাস করছে মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত চার হাজার ২০০ জনের বেশি রোহিঙ্গা। আশ্রয়শিবির ঘেঁষে (পেছনে) মিয়ানমারের কাঁটাতারের বেড়া ও রাখাইন রাজ্যের একাধিক পাহাড়। পাহাড়ের ওপর দেশটির বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) একাধিক তল্লাশিচৌকি।

শূন্যরেখার আশ্রয়শিবির ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান দিল মোহাম্মদ বলেন, তিন দিন ধরে আশ্রয়শিবিরের পেছনের পাহাড়ে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়নি। কিন্তু শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে পাহাড়ের চৌকি থেকে ব্যাপকহারে গুলি ছোড়ার পাশাপাশি মর্টার শেল নিক্ষেপ করা হচ্ছে। গোলাগুলি চলছে। কিন্তু কি কারণে এত বেশি গোলা ও মর্টার শেল ছোড়া হচ্ছে, তা জানা যাচ্ছে না। শূন্যরেখায় থাকা রোহিঙ্গারা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছেন।

৯ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার থেকে ছোড়া একটি ভারী অস্ত্রের গুলি তুমব্রু বাজারের পাশে কোনারপাড়ার কৃষক শাহজাহানের বাড়ির আঙিনায় এসে পড়ে। বাড়ির পাশেই শূন্যরেখায় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির। এর আগেও বাংলাদেশের ভূখণ্ডে মিয়ানমারের হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া দুটি মর্টার শেল এসে পড়ার ঘটনায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছিল বাংলাদেশ।

আশ্রয়শিবিরের রোহিঙ্গারা জানায়, তিন দিন গোলাগুলির শব্দ কানে আসেনি। তবে আশ্রয়শিবিরের পেছনে দূরের ওয়ালিডং ও খ্য মং সেক পাহাড়ে ব্যাপক গোলাগুলি হচ্ছে। গুলির শব্দ কানে বাজছে। এর মধ্যে গত সোমবার রাত ১০টার দিকে হঠাৎ জেট ফাইটার থেকে গোলা ও বোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। রোহিঙ্গা নেতাদের ধারণা, তিন দিন এই সীমান্তে গোলাগুলি বন্ধ রেখে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে মিয়ানমার।

ঘুমধুম ২ নম্বর ওয়ার্ডের তুমব্রু এলাকার ইউপি সদস্য দিল মোহাম্মদ ভুট্টু বলেন, সন্ধ্যা থেকে হঠাৎ গোলাগুলির বিকট শব্দে তুমব্রুর ভূখণ্ড কাঁপছে। এতে এলাকার মানুষ ফের আতঙ্কে আছেন। এক মাসের বেশি সময় ধরে মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সাথে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনায় বাংলাদেশের মানুষ উদ্বিগ্ন। তারা স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারছেন না। চাষীরা মাঠে নামতে পারছেন না। শিক্ষার্থীরা পাঠের পরিবেশ হারাচ্ছে। এসএসসি পরীক্ষার্থীরাও কেন্দ্রে যেতে নিরাপদ বোধ করছে না। সীমান্তের ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষার্থী আছে ৪৯৯ জন।

ঘুমধুম সীমান্তের তুমব্রু এলাকার কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী কোন সময় গুলি ছোড়ে, তার ঠিক-ঠিকানা নেই। তারা গুলি ছুড়লে জবাবদিহি করতে হয় না। তিন দিন গোলাগুলি বন্ধ থাকায় ঘুমধুমের বেশ কিছু কৃষক চাষাবাদে মাঠে নামলেও আগামীকাল থেকে কারও নামা হবে না। সীমান্তে মাইন আতঙ্কে ভুগছেন চাষিরা।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, গত ১৩ আগস্ট থেকে তুমব্রু সীমান্তের বিপরীতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ওয়ালিডং ও খ্য মং সেক পাহাড়ে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে স্বাধীনতাকামী সশস্ত্রগোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) যুদ্ধ চলছে। এক মাসের বেশি সময় ধরে চলমান এই যুদ্ধ বন্ধের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উল্টো ২৭১ কিলোমিটার স্থল ও জলসীমানায় তৎপরতা বাড়াচ্ছে মিয়ানমার। তিন দিন ধরে সেন্ট মার্টিনের বিপরীতে (পূর্ব দিকে) মিয়ানমার জলসীমানায় দেশটির তিনটি নৌ-বাহিনীর জাহাজ তৎপরতা শুরু করে। তবে সেন্ট মার্টিন জলসীমানাতেও তৎপর আছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড।

ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন পাহাড়ে আরাকান আর্মির সাথে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর যুদ্ধ পরিস্থিতি এপার থেকে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সীমান্তে কাউকে যেতে দেয়া হচ্ছে না। এপারে তৎপর বিজিবি।

এ দিকে শুক্রবার বিকেলে শূন্যরেখার কাঁটাতারের কাছে গরু আনতে গিয়ে তুমব্রু এলাকার চাকমাপল্লির এক তরুণ মাইন বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হন। তার বা পায়ের গোড়ালি আলাদা হয়ে গেছে। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

সূত্র : নয়াদিগন্ত

Related Articles

Latest Articles