12.5 C
Toronto
মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২২

জুতো জোড়া ছিল বড়ই আদরের

- Advertisement -
ছবি/সিএ ক্রিয়েটিভ

জেলা স্কুলে আমাদের ক্লাসে সবচাইতে ধনী ব্যক্তির ছেলের জুতোর উচ্চতা ছিল গোড়ালি আর হাঁটুর মাঝামাঝি পর্যন্ত। “রিবক” কোম্পানির সেই জুতোর ফিতার উপরে ঝুলে থাকা উটের জিহ্বাটুকুতে যত গদি ছিল, তা দিয়ে অনায়াসে মধ্যবিত্তের আরও ছয় জোড়া আর গরিবের দু-ডজনখানেক জুতোতে গদি দেওয়া যেত। অবশ্য ঐ কোম্পানির জুতো আরও কয়েকজন পায়ে দিতো। সেগুলোর উচ্চতা ছিল কিছুটা কম। সে হিসেবে তাদের বাবাদের ফেলে দিতাম দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ধনীর কাতারে।

আমার জুতো জোড়া ছিল বড়ই আদরের।

ধবধবে সাদা রাবারের বাটার জুতো। গদি না থাকলেও ভেতরে চারকোনা শেপের অনেকগুলো বায়ুকুঠুরি ছিল। বন্যার সময় টাটকিনি মাছ পর্যন্ত লুকিয়ে থাকতে পারতো। প্রতিদিন বাসায় ফিরে সাবান পানি দিয়ে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে নিতাম। আর প্রাণ ভরে কড়া রাবারের গন্ধ নিতাম। তবে বেশি ঘষামাজা করাটাই হলো কাল; সৃষ্টিকর্তা ভালো চোখে দেখেননি। তিনি ওটাতে লেপ্টিয়ে দিলেন কলঙ্ক।

একদিন স্কুলের পুবদিকের মাঠের [কলকাকলি স্কুলের মেয়েরা ঠিক দেয়ালের অন্য পাশেই এক্কা-দোক্কা খেলতো] ঝোপে কিছু একটা পাড়ালাম..। [“পা দিয়ে দেখি নরম, হাত দিয়ে দেখি গরম”- টাইপের কিছু] বাসায় গিয়ে ঘ্রাণেন্দ্রিয় দিয়ে নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হলাম পদার্থটা সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট সেরা জীব হতে উৎপত্তি। তাই গন্ধেও সেরা। সৃষ্টিকর্তা কৌতূহলবশত; গবেষণাস্বরূপ আমার জুতোর কড়া রাবারের গন্ধের সাথে ঐ ‘ঘেয়া’ রঙের পদার্থের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে নতুন এক স্থায়ী মৌলিক পদার্থের সূচনা করলেন। বিজ্ঞানী মেন্ডেলিফ বেঁচে থাকলে নিশ্চিত আবিষ্কৃত মৌলিক পদার্থটির নাম দিতেন “গুলিডিয়াম বা মানবডিনাম”। তারপর “পিরিয়ডিক টেবিলের” যথার্থ স্থানে বসিয়ে দিয়ে হাত ঝাড়তেন। তবে সেটার আশেপাশের মৌলিক পদার্থগুলো ইলেট্রন-প্রোটন চেঞ্জ করে তাদের অবস্থান পাল্টাতে যে তাড়াহুড়ো শুরু করে দিতো, তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকতো না। সে সময়ে কেমিস্ট্রি বইতে মৌলিক পদার্থের সংখ্যা ১১৮ টা লিখা থাকলেও আমি পরীক্ষার খাতায় লিখতাম ১১৯ টা।

সেই জুতো ছোট হয়ে যাবার পর কটকটিওয়ালার কাছে পাল্টিয়ে পেলাম কিছু গুড়ের কালচে কটকটি। আমি বেঁচে গেলেও সর্বনাশ ডেকে এনেছিলাম বাংলাদেশের জুতো ইন্ডাস্ট্রিতে। দেশে জুতোর দোকানে ঢুকলে আপনার নাকে প্রথম যে ধাক্কা দিবে, মনে রাখবেন এতে জাভেদ ইকবালের একটা বড় অবদান আছে। সেদিন টরন্টোর একটা জুতোর দোকানে ঢুকেও মনে খচ খচ করতে লাগলো; তবে কি.. কোনো সন্দেহই নেই। খুঁজে পেলাম সেই একশত উনিশ নাম্বার মৌলের অব্যর্থ ঘ্রাণ, সুনিশ্চিত উপস্থিতি!
হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া গানের মতো, তুমি সেই গন্ধ যদি একবার নিছো ভাই রে ভাই.. আজীবন তোমাকে বয়ে বেড়াতে হবে!
আর ছাড়ান নাই!

ভাগ্য ভালো নীল আর্মস্ট্রং চাঁদে গিয়ে জুতোর স্টেপ ফেলেছিলেন নাইনটিন সিক্সটি নাইনে। উনিশশো নব্বই সালের পরে চাঁদে গেলে এলিয়েনরা পৃথিবীর ধারে কাছেও ঘেঁষতো কিনা সন্দেহ। মহাবিশ্বের ইতিহাসই পাল্টে যেত। রবিঠাকুরের গানের মতো; তারাগুলো সত্যি সত্যি খসে পড়ে ছুটতো দিকবিদিকহীন, অন্য কোনো গ্যালাক্সির খোঁজে।
যেখানে নেই কোনো মানব সন্তান, নেই তার ছায়া..

অটোয়া, কানাডা

Related Articles

Latest Articles