18.7 C
Toronto
রবিবার, জুন ২৬, ২০২২

ট্রেনের টিকিট বিক্রিতে কেলেঙ্কারি

- Advertisement -

ট্রেনের টিকিট বিক্রিতে কেলেঙ্কারি - The Bengali Times

ট্রেনের টিকিট বিক্রিতে কেলেঙ্কারি ঘটেছে। অপারেটরের অনিয়ম ও কারিগরি ত্রুটিতে বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে রেলওয়ে। ট্রেনে অতিরিক্ত দুটি বগির কথা বলে টিকিট বিক্রি করায় সিট না পাওয়া ক্ষুব্ধ যাত্রীরা স্টেশনে ভাঙচুরের চেষ্টা চালান। এ ছাড়া একই আসনে একাধিক টিকিট বিক্রি, চাহিদা সত্ত্বেও আসন খালি রাখাসহ নানা ঘটনায় লোকসান গুনছে রেল। এ রকম ঘটনায় দেখা গেছে- মাত্র চার দিনে কেবল ঢাকাতেই ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা গচ্চা দিতে হয়েছে রেলকে। রেলের টিকিট বিক্রির অপারেটর চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করলে নির্ধারিত দিন পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। এর পরও শর্ত না মানলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই প্রতিষ্ঠানের চুক্তি বাতিল হওয়ার কথা। এ হিসেবে গত ১৯ এপ্রিল চুক্তি বাতিল হয়ে গেছে। যদিও ওই প্রতিষ্ঠান দিয়েই চলছে টিকিট বিক্রির কার্যক্রম। এর আগে দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে অস্বচ্ছতার প্রমাণ পেয়েছে সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত ইউনিট-সিপিটিইউ।

গত ২৫ মার্চ সন্ধ্যার পর থেকে নতুন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে টিকিট বিক্রির কার্যক্রম শুরু হয়। এর আগে ১৫ ফেব্রুয়ারি রেলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় যৌথভাবে সহজ-সিনোসিস-ভিনসেন। চুক্তিপত্রের শর্ত অনুযায়ী এবং দরপত্র দলিলের সেকশন-৫ এর সাপ্লাই, ইনস্টলেশন, টেস্টিং, কমিশনিং অ্যান্ড অ্যাকসেপটেনস অব দ্য সিস্টেম এর ক্লজ-১৮ অনুযায়ী ২১ কার্যদিবসের মধ্যে আগের নিয়মে সম্পূর্ণ সিস্টেম চালু করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সিসিএসআরটিএসের সব ফিচারসহ টিকিট বিক্রির কার্যক্রম পরিচালনার ব্যর্থতায় চুক্তিপত্রের (৪) শর্ত অনুযায়ী পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। এ হিসেবে গত ১৯ এপ্রিল সময়সীমা উত্তীর্ণ হয়েছে। ২১ মার্চ সহজ-এর কার্যক্রম শুরু হলেও প্রযুক্তিগত ও আনুষঙ্গিক কাজের জন্য বিশেষ বিবেচনায় জরিমানা মওকুফ করে ২১ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত রেলওয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় টিকিট বিক্রি করা হয়। বর্তমানে সহজ-এর মাধ্যমে কাউন্টার ও ওয়েবসাইটে টিকিট বিক্রি চললেও মোবাইল অ্যাপস কার্যকর হয়নি। এ জন্য ১৯ এপ্রিলের মধ্যে কাউন্টার, অনলাইন, মোবাইল অ্যাপসভিত্তিক টিকিট ইস্যু ও সিসিএসআরটিএসের সব ফিচারসহ পরিচালনার জন্য সহজ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দেয় রেলওয়ে। গত ১৭ এপ্রিল এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানোর পরও অ্যাপস যুক্ত হয়নি এখনো।

সংশ্লিষ্টরা জানান, চুক্তি ও দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী ১৯ এপ্রিলের পর চুক্তি বাতিল হয়ে গেছে। অথচ ওই প্রতিষ্ঠান দিয়েই টিকিট বিক্রির কাজ করছে রেলওয়ে। বরং গত ১২ মে রেল মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এ সংক্রান্ত বৈঠকে সহজ-এর ত্রুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনারও সুযোগ মেলেনি। যদিও এজেন্ডায় এসব বিষয় ছিল। উল্টো আরও এক মাস তথা ১২ জুন পর্যন্ত অ্যাপস চালু করতে সময় দিতে আলোচনা হয় ওই বৈঠকে।

এ নিয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, চুক্তির নবায়ন ছাড়া অথবা নতুন চুক্তিবদ্ধ হওয়া ছাড়া এখন আগের চুক্তির বৈধতা নেই। শর্ত না মানলে চুক্তির ৩০ দিন (১ মাস) পর্যন্ত প্রতিদিন ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু কোনো জরিমানা আদায় করা হয়নি।

এ ছাড়া সহজ লিমিটেডের সঙ্গে রেলওয়ের চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এবং দরপত্র দলিলের সেকশন-৫ এর পেমেন্ট অ্যান্ড কালেকশন এর ক্লজ-৫ অনুযায়ী, অনলাইনে টিকিট বিক্রির অর্থ পরবর্তী ৫ কার্যদিবসের মধ্যে রেলওয়ের নির্ধারিত কোডে জমার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু তা এখনো জমা দেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে জানতে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের দপ্তরে গতকাল দুপুরে গেলে তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো রকম কথা বলতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে তিনি আমাদের সময়কে বলেন, সাংবাদিকরা ঈশ্বরদীতে টিকিট বিক্রির ঘটনা নিয়ে যেসব তথ্য প্রচার করেছে তা মিথ্যা। বিনা টিকিটে যাত্রী চড়ার অভিযোগ থেকে শুরু করে ওই সময়ে প্রচারিত ও প্রকাশিত তথ্যগুলো বানোয়াট। এ ধরনের প্রতিবেদনের মাধ্যমে ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার চেষ্টা চলেছে বলে মন্ত্রী জানান। তিনি এ-ও বলেন, ওই ঘটনার তদন্তে আসল সত্য বেরিয়ে এসেছে। শিগগির জাতির সামনে তা তুলে ধরবেন। তাই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা তার ঠিক হবে না। এমন যুক্তিতে তিনি রেলের সেবা, টিকিট বিক্রির কার্যক্রম ও সহজ-এর সঙ্গে রেলওয়ের সম্পাদিত চুক্তি কিংবা চুক্তির ব্যত্যয়- কোনো ইস্যুতেই কথা বলতে রাজি নন বলে জানান।

এর আগের দিন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ডিএন মজুমদার বলেন, নতুন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। কিছু ত্রুটির খবর আসছে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মোবাইল অ্যাপস চালু না হওয়া ও চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঈদের আগে অ্যাপস চালু হয়ে যাবে। মন্ত্রী এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন।

জানা গেছে, রেলের টিকিট বিক্রি নিয়ে অনিয়ম ও ত্রুটির ঘটনা বেড়েই চলেছে। ১৫ মে ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রীরা কমলাপুর স্টেশনের ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্মে হট্টগোল করেন। ট্রেনের এক্সটা-২ ও এক্সট্রা-৩ নামে দুটি অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করে টিকিট বিক্রি করে সহজ। ১১ মে ও ১৪ মে দুদিনে এসব অতিরিক্ত টিকিট (৭৮+১০৫টি আসন) বিক্রি করে দুই বগির নামে। বাস্তবে এসব বগি সংযোজনের জন্য রেল কর্তৃপক্ষ লিখিত ও মৌখিক কোনো অনুমতি দেয়নি। নির্ধারিত বগি না পেয়ে যাত্রীরা উত্তেজিত হয়ে ট্রেন ও স্টেশন ভাঙচুরের চেষ্টা চালায় বলে তারবার্তায় রেলওয়েকে জানিয়েছেন স্টেশন ম্যানেজার।

একই আসনে একাধিক টিকিট বিক্রিও হচ্ছে প্রায়ই। ১৪ এপ্রিল পারাবত এক্সপ্রেসের কাউন্টার থেকে ঢাকা-শ্রীমঙ্গল, ঞ/৪৪ এবং অনলাইন থেকে ঢাকা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঞ/৪৩-৪৪ আসনে টিকিট বিক্রি হয়েছে। এ নিয়ে পরে ট্রেনে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হয়। ১২ এপ্রিল ইস্যুকৃত (যাত্রার তারিখ ১৬ এপ্রিল) পোড়াদহ-খুলনা রুটে পোড়াদহ স্টেশন থেকে সাগরদাড়ি এক্সপ্রেস ট্রেনের একই আসনে ৬টি টিকিট ইস্যু করা হয়। এর মধ্যে মাত্র একটি টিকিট রিফান্ড করা হয়। অগ্রিম টিকিট ইস্যুর ক্ষেত্রেও চুক্তিভঙ্গের ঘটনা ঘটছে।

স্ট্যান্ডিং টিকিট ইস্যু করা যাচ্ছে না, ফলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ববঞ্চিত হচ্ছে রেলওয়ে। সমস্যার এখানেই শেষ নয়, ইমারজেন্সি কোটার টিকিট ইস্যুর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কাউন্টার নির্বাচন করার পরও তা দৃশ্যমান হয় না। ফলে টিকিট টিকিট ইস্যু করা সম্ভব হয় না। পরে তা অনলাইনে চলে যায়। ট্রেন বিলম্ব হলে ট্রেনের টাইম ‘মিনিট’ হিসাবে বাড়াতে হয়। প্রত্যেক শ্রেণির জন্য আলাদা করে বাড়াতে হচ্ছে। একবারে টাইম বাড়ানোর অপশন নেই। তা ছাড়া সেলস রিপোর্ট ও শিফট রিপোর্টের আয় ভিন্ন প্রদর্শিত হচ্ছে। এতে ডেইলি আর্নিং সঠিকভাবে নিরূপণ করতে পারছে না রেলওয়ে। ট্রেন ও স্টেশনভিত্তিক দৈনিক ও মাসিক বিক্রীত টিকিট ও যাত্রীসংখ্যা এবং আয়ের রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে না।

খুলনা স্টেশনে ডেইলি রিপোর্টের সঙ্গে ১০ দিনের রিপোর্ট ও মাসিক রিপোর্টের ঘাটতি রয়েছে। কেবল মার্চ মাসে এসএমএস ও ৫০ শতাংশ ওয়ারেন্টের ১৫ লাখ টাকা ঘাটতি রয়েছে। এপ্রিলে ১১ লাখ টাকার ঘাটতি। এটি কেবল খুলনা স্টেশনের কাহিনী। এ কারণে খুলনা স্টেশনের দুই মাসের রিটার্ন পাঠানো যাচ্ছে না। আরেকটি সমস্যা, রোড সাইড স্টেশনে টিকিট সকাল ৮টায় সব স্থানে বিক্রি শুরু হওয়ায় এক স্টেশনের টিকিট অন্য স্টেশনে বিক্রি হচ্ছে। ফলে যাত্রী অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করেছে। তা ছাড়া পাসের অনুকূলে ক্রয়কৃত টিকিট রিলিজ করা যাচ্ছে না। টিকিট রিফান্ড করাও যাচ্ছে না। আবার পাসের অনুকূলে ইস্যু করা টিকিটে মূল্য প্রদর্শিত হচ্ছে। শিফট রিপোর্টে অ্যাডমিন কর্তৃক বাতিলকৃত টিকিটের হিসাব প্রদর্শিত হচ্ছে না। তা ছাড়া ১০০ ভাগ ওয়ারেন্ট ও পাস রিপোর্ট একত্রে আসছে, এটি পৃথক হওয়ার কথা। বড় বিপত্তি- ট্রেন গন্তব্য স্টেশনে পৌঁছানোর পরও টিকিট রিফান্ড করা সম্ভব হচ্ছে। তা ছাড়া টিকিটের রিফান্ডের শর্তাবলিতে যে সময় ও অর্থ নির্ধারণ করে দেওয়া তার ব্যত্যয় ঘটছে।

আগে টিকিট বিক্রিতে ৫০ ভাগ ‘ডিফারড’ টিকিটের ক্ষেত্রে শুধু ভাড়া থেকে ৫০ ভাগ কর্তন করা হতো। এসি বার্থের ক্ষেত্রে ভ্যাট ও বেডিং চার্জের টাকা অক্ষুণœ রাখা হতো। ভ্যাট ও বেডিং চার্জ বাদে শুধু মূল ভাড়ার ৫০ ভাগ ডিফারড অ্যামাউন্ট হিসেবে কর্তন করা হতো। বর্তমানে ৫০ ভাগ রিপোর্টে ভ্যাট ও বেডিং চার্জ থেকেও ৫০ ভাগ কর্তনের ফলে আর্নিংয়ের ক্ষেত্রে তারতম্য দেখা দিয়েছে। এতে রেলওয়ের রাজস্ব হারানোর উপক্রম হয়েছে। বিষয়টি তুলে ধরে রেলওয়ের সিসিএমের কাছে চিঠি দিয়েছেন ঢাকার সহকারী বাণিজ্যিক কর্মকর্তা। এ ছাড়া ডিসপ্লেতে এসি বার্থের সিট নম্বর বোঝা যায় না। কী পরিমাণ অবিক্রীত টিকিট তা বোঝা যায় না। মিলিটারি ভাউচারে এসি বার্থ ও এসি সিটের ক্ষেত্রে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ ভাড়া যাত্রী থেকে আদায় করার কথা। কিন্তু ৫০ শতাংশ আদায়ের অপশন রয়েছে। আবার রাজবাড়ী, ভাঙা, ফরিদপুর রুটে টিকিটের গন্তব্য স্টেশনের নাম বাংলায় প্রদর্শিত হয় না। এ রকম ত্রুটি ও অনিয়ম তুলে ধরে মাঠপর্যায় থেকে বেশ কয়েকটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী সহজ-এর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ করেও প্রতিকার মেলেনি। কিছু ক্ষেত্রে জরুরি প্রয়োজনে সহজ কর্মকর্তাদের সঙ্গে টেলিফোনেও যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে সহজ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মালিহা এম কাদিরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কথা বলেন প্রতিষ্ঠানটির তথ্য কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, মোবাইল অ্যাপসের বিষয়টি চুক্তিতে নেই। বরং আগের অপারেটর হস্তান্তর না করায় রেল ও জনগণের স্বার্থে সহজ নতুনভাবে চালুর চেষ্টা করছে। শিগগির তা কার্যকর হয়ে যাবে। যেহেতু চুক্তিতেই নেই তাই চুক্তি লঙ্ঘনের সুযোগ নেই।

টিকিট বিক্রিতে অনিয়ম ও কারিগরি ত্রুটির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগের অপারেটর সিএনএস ২১ দিনের মাথায় মানে শেষ কর্মদিবসে একটি সিডি বুঝিয়ে দেয়। তাদের অসহযোগিতার পরও আমরা ২১ দিনেই সল্যুশন তৈরি করেছি। ওয়েবসাইট ও ৭৭টি স্টেশনে সল্যুশন দিতে পেরেছি। আমরা সময়মতো সার্ভিস দিয়েছি। এর পরও কোনো সমস্যা হলে সে অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সূত্র : আমাদের সময়

- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles