17.5 C
Toronto
রবিবার, মে ২৯, ২০২২

আমার ভাবনা

- Advertisement -
আমার ভাবনা - The Bengali Times
ছবি/আদিত্য সাক্সেনা

কয়েকদিন যাবতই লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু কী দিয়ে শুরু করবো কথাগুলো ভেবে পাচ্ছি না। মানুষের জীবনে অনেক কিছু ঘটে যায়, যার জন্য সে কোনোদিনও প্রস্তুত থাকে না। আবার অনেক কিছু ঘটে যার মাঝে কোনো অপবিত্রতা নেই কুচিন্তা নেই। কিন্তু সমাজ সেটা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে না। নারীর ব্যাপারে ভালো চিন্তা, সুন্দর চিন্তা, পবিত্র চিন্তা অনেক মানুষই করতে পারে না। নারীর চরিত্রে কুৎসা রটিয়ে তাকে যতটা ঘায়েল করা যায় তার চাইতে উত্তম পন্থা এখনো মনে হয় আবিষ্কৃত হয়নি। আদম হাওয়ার যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত নারীকেই চরিত্রহীন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সত্যি কথা জানার চাইতে মিথ্যা কুৎসা শুনতে মানুষ বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে থাকে। যে নারীকে নিয়ে এত কাব্য, এত কবিতা, এত গান, এত কল্পনা, শিল্পীর তুলির ছোঁয়াতে নারীর সৌন্দর্য ফুটে উঠে নানাভাবে, সে নারীকেই নোংরা নর্দমাতে ডুবিয়ে মারতে সমাজ এবং তার আপনজনরা বিন্দুমাত্র দ্বিধা বোধ করে না।

আমরা যতই মুখে বলি-নারী শক্তির প্রতীক, নারীর বল অসীম, নারী হতে পারে প্রয়োজনে অনেক কঠিন, নারী আজ স্বাধীন। কথাগুলোর মাঝে কতটুকু সত্যতা আছে? সত্যি কি নারী আজ স্বাধীন? কয়টা নারী পারে নিজের শক্তিতে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে? অধিকাংশ নারীই মানসিকভাবে প্রচণ্ড দুর্বল। সে দুর্বলতার প্রধান কারণ সামাজিক লজ্জা, সংসার ভেঙে যাবার ভয়, অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব। একেকজনের একেক রকম সমস্যা। অনেক নারীকেই দেখা যায় সে তার স্বামীকে যত না ভালোবাসে তার চাইতে বেশি পায় ভয়। যেখানে ভয়টা এতটা কাজ করে সেখানে ভালোবাসা প্রবেশের জায়গা কোথায়? যার ফলে অভিনয় করে কাটিয়ে দিতে হয় সারাটি জীবন। ভিতরটা উইপোকার মতো খেতে খেতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় কিন্তু প্রকাশ করার কোনো জায়গা নাই। এভাবে ভয় পেয়ে নারী কতদিন জীবন কাটাবে জানি না। আসলে নারী নিরাশ্রয়। তাদের নিজের বলে কিছু নেই। এমনকি নিজের উপরও নারীর নিজের অধিকার নেই। নারী যেন সবখানে পরাশ্রিতা।

- Advertisement -

আমার নিজের ভাবনা এটা-পুরুষের ঈর্ষা বড় ভয়ংকর। লোকে বলে মেয়েরা নাকি ঈর্ষাকাতর। পুরুষের তুলনায় মেয়েরা কম ঈর্ষা করে সেটাও বলবো না, কারণ প্রচুর মেয়ে নিজেরাই মেয়েদের সর্বনাশ করে। তবে এটাও সত্য পৃথিবীতে যতো নারী-পুরুষ ঘটিত অপরাধ ঘটছে তার সিংহভাগ পুরুষের ঈর্ষার কারণে। মেয়েদের শরীরে এসিড ছোড়া হচ্ছে। মেয়েদের পুড়িয়ে, কুপিয়ে, গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে সবই পুরুষের ঈর্ষা ও হিংগ্রতা, হীনমন্যতার কারণে। কটা পুরুষকে ময়েদেরে ঈর্ষার কারণে প্রাণ দিতে হয়? কটা পুরুষের সর্বনাশ করেছে মেয়েরা?

বেশ কয়েক বছর নারীকে নিয়ে অনেক লেখা লিখেছি, তবে গত কয়েক বছর এ বিষয়ে তেমন কিছু লেখা হয়নি অথবা লিখতে ইচ্ছে করেনি। আবার নতুন করে সে ভাবনাগুলো আমাকে চেপে ধরেছে। অনেক নারীকেই বলতে শুনি তার অনেক কথা বলা উচিৎ কিন্তু বলতে ইচ্ছা করে না। তাদের ধারণা কী কারণে আমার সব কথা সব দুঃখের কারণগুলো অন্য মানুষের কাছে ব্যাখ্যা করতে হবে? যার যা খুশি ভাবুক। দেখা যায় দিনের পর দিন আপনজনের কাছ থেকে মানসিক নির্যাতন ভোগ করতে থাকে কিন্তু তার জেদ তাকে মুখ খুলতে দেয় না। শারীরিক নির্যাতনের জন্য আইন আছে, বিচার আছে কিন্তু মানসিক নির্যাতনের কি কোনো বিচার আছে? থাকলে খুব ভালো হতো।

বহুদিন থেকে ভাবছি, না ভুল বললাম বহু বছর থেকে ভাবছি, একটি জীবনকাহিনী লিখবো। কিন্তু কার জীবনকাহিনী লিখবো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। আমার জীবনের নাকি আমার জীবনের খুব কাছের একজন মানুষের জীবনকাহিনী? অথবা কোনো একজন রমণীর জীবনকাহিনী? কোন ধরনের রমণীর জীবনকাহিনী আমি লিখবো? সুখী একজন রমণীর জীবনকাহিনী লিখলে কেমন হয়? যদিও সুখী জিনিশটা একেক মানুষের কাছে একেক রকম ব্যাখ্যা তৈরি করে। শতভাগ সুখী কোনো মানুষ হতে পারে না। সেটা হোক কোনো নারী বা পুরুষ। ভাঙা-গড়া, আলো-আঁধার মিলিয়েই মানুষের জীবন। তবে কোনো কোনো মানুষের জীবনে আঁধার এমনভাবে জড়িয়ে রাখে তখন আলোটা তার কাছে মনে হয় একটা স্বপ্ন।

অনেক মানুষ আছে যাদের পুরো জীবনটা চলে যায় অভিনয় করতে করতে। আমি সুখী, আমি অনেক সুখী, আমার চেয়ে সুখী আর কেউ হতে পারে না। সে সুখের মিথ্যা লুকোচুরি খেলা খেলতে খেলতে জীবনের অন্তিম লগ্নে পোঁছে যায়, তবুও সে নেমে আসতে পারে না অভিনয় মঞ্চ থেকে। আসলে প্রত্যেকটা নারী বা রমণী যাই বলি না কেন তাদের প্রত্যেকটি জীবন একটি গল্প একটি উপন্যাস। মানুষ না বলে নারী বললাম কারণ নারী খাদে পড়ে গেলে খুব কম মানুষই আছে তাকে হাত বাড়িয়ে উপরে তুলে আনবে। তাকে পরিচ্ছন্ন করে দাঁড় করাতে সাহায্য করবে বরং তার খাদে পড়ে যাওয়াটা উপভোগ করবে। কিন্তু একজন পুরুষ যখন খাদে পড়ে-শত হাত ছুটে আসে তাকে সাহায্য করতে। আর সে খাদে পড়া মানুষটা হাত পা ঝেড়ে বুক ফুলিয়ে উঠে দাঁড়ায়।

আসলে প্রতিটি মানুষের চাওয়া পাওয়া ভিন্ন। অনেক কিছুই হয়তো সে জীবনে পায়, কিন্তু সেটা না পেলেও তার কাছে কিছু আসে যেতো না। আবার সে যেটুকু চেয়েছিল সেটুকু তার জীবনে কোনোদিন পূরণ হয় না। এরকম চাওয়া না চাওয়া, পাওয়া না পাওয়ার হিসাব নিকাশ করতে করতে কেউ কেউ দেখা যায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। একটি নারী হয়তো তার জীবনে ছোট ছোট কিছু জিনিশ পেতে চেয়েছিল কিন্তু সে তার চাওয়ার মূল্য কখনো পায়নি। আর যার কাছ থেকে পায়নি সে এ ব্যাপারে কখনো বিচলিত হয়নি। সে তার ছোট ছোট চাওয়ার মূল্য কখনো দেয়নি এবং তার হৃদয়ের কষ্টটুকু অনুভব করার কোনো চেষ্টাও করেনি। বরং মনে করে তার সামান্য চাওয়াটি বিরাট একটা অপরাধ। অধিকাংশ পুরুষই স্ত্রীর শাসকের ভূমিকা পালন করতে বেশি ভালোবাসে। অন্য কোথাও শাসক সাজতে না পারলেও স্ত্রীর কাছে ঢাল-তলোয়ার নিয়ে শাসকের ভ‚মিকা পালনে নেমে যায়। যেখানে স্বামী শাসক হয় সেখানে স্ত্রীর নামকরন কী হওয়া উচিৎ বলুন তো?

মানুষের জীবনে কতো সংগ্রাম। কতো বৈচিত্র। কতো মিলন বিরহ, কতো সুখ দুঃখের কাহিনী। সে সব সম্পর্কে একটু ভাবতে বসলে, নিজেদের জীবনকে, কষ্টকে কতো তুচ্ছ কতো সামান্য মনে হয়। প্রতিটি মানুষের জীবনই মূল্যবান। প্রতিটি মানুষের প্রতি ফোঁটা অশ্রæ অমূল্য। এই তো দেখুন বসেছিলাম একটি জীবনকাহিনী লিখতে তা না লিখে লিখতে শুরু করলাম নারী পুরুষের জীবন কাহিনী। আজ আর লেখা হবে না। তবে সত্যি সত্যি একজন দুঃখী নারীর জীবনের আঁকাবাঁকা কঠিন পথটুকু নিয়ে লিখতে বসবো কোনো একদিন।

৩.
এখন আর ইচ্ছে হয় না পথের দিকে তাকাতে। ভয় লাগে, বড্ড ভয়। পেছনের পথটা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে আর ছোট হয়ে যাচ্ছে সামনের পথটুকু। ছোট হতে হতে মিলিয়ে যাবে সামনের পথটুকু কোনো এক অজানা ঠিকানাতে। তখন কী হবে আমার পথের ঠিকানা, জানি না। কেউ তো সে ঠিকানা থেকে ফিরে এসে বলেনি কেমন পথের শেষের ঠিকানাটি। সে অজানা পথের ঠিকানার চিন্তা আমার দেহ মনে পরগাছার মতো শক্ত হয়ে জড়িয়ে আছে। তাকে যে কোনোভাবেই ছাড়াতে পারছি না আমার দেহ মন থেকে। এটা যে এক ধরনের হতাশা ও মানসিক ব্যাধি সেটা আমি খুব ভালো করেই বুঝি।

আমার বন্ধুরা কেউ এসব নিয়ে ভাবে না। ওদের জীবনে অনেক আশা অনেক স্বপ্ন অনেক পরিকল্পনা। আমি যেন সবকিছু হারিয়ে বসে আছি। যখন জীবনে যখন কোনো আশা আকাক্সক্ষা থাকে না তখন মানুষের স্বপ্নগুলোও কোথায় যেন উড়ে যায়। শুধু ভাবি কেন এখনি ফুরিয়ে যাবার কথা ভাবছি? এখন তো অনেক কিছু করতে পারি, স্বপ্ন দেখতে পারি, সংগ্রাম করতে পারি, আশায় বুক বাঁধতে পারি। সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্ছলতার মতো উছলে পড়তে পারি। পাখির মতো আনন্দে দুটি পাখা মেলে উড়ে বেড়াতে পারি। নীল আকাশে সাদা মেঘের খেলা দেখে দু হাত বাড়িয়ে বলতে পারি, আমি কত ভাগ্যবান তোমার নিচে আমি বাস করতে পারছি। রবি ঠাকুরের গানের কথার সাথে নিজেকে মিলিয়ে অনেক কিছু ভাবতে পারি। কিন্তু আমাকে দিয়ে কিছুই হচ্ছে না। সারাক্ষণ একটা অজানা ভয় আমাকে চেপে আছে। মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন ঘুম ভাঙিয়ে দিচ্ছে। এ কেমন জীবন শুরু হলো আমার? সবকিছু আছে, সবাই আছে, তারপরও মনে হয় কেউ নেই। আসলে দুঃখের মাঝে যে গভীরতা আছে, সুখের মাঝে সে গভীরতা নেই। সুখ শুধু ভেসে বেড়ায় চারপাশে আর দুঃখ ঢুকে যায় হৃদয়ের ভেতরে।

মাঝে মাঝে একটা উদ্ভট চিন্তা মাথায় আসে। মনে হয় সবকিছু ছেড়ে কোনো এক পাহাড়ে নির্জন ঘর বানিয়ে থাকি। যেখানে কেউ আমাকে দেখবে না। আমাকে অহেতুক বিরক্ত করবে না। আমাকে মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হবে না। আমি শুধু থাকবো আমার ভাবনাগুলো নিয়ে।

ভোরের বেলা ভোরের নরম বাতাসে গা ভিজাবো। সূর্য উদয়ের দৃশ্য আমার জীবনে খুব বেশি দেখা হয়নি তখন পাহাড়ের উপরে বসে সে দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হবো। সন্ধ্যায় সূর্যের অস্ত যাবার অপরূপ দৃশ্য আমাকে অনেক ভাবনা থেকে মুক্তি দেবে। জ্যোৎস্নারাতে চাঁদের নিচে বসে চাঁদকে শোনাবো আমার কথা, আমার কবিতা। পাহাড়ের গা ঘেষে বনফুলের ঝাড় থেকে ফুল তুলে এনে আমার কুড়েঘরটি সাজাবো। সকাল সন্ধ্যা পাখির গানের সাথে সুর মিলিয়ে গান করবো। আর শুধু লিখতে থাকবো আমার ভাবনাগুলো। আমার জীবনের সুখ দুঃখের অভিজ্ঞতাগুলো।

জীবনে কতো মানুষের সাথে সখ্যতা হলো। কতো মানুষ হারিয়ে গেলো। কতো মানুষ আবার রয়ে গেলো। আবার হারিয়ে যাওয়া কিছু কিছু মানুষও ফিরে এসেছে জীবনে। কিছু প্রিয় বন্ধু পৃথিবীর কোনো কোনো প্রান্তে বাস করে তাও জানি না। যদিও সামাজিক মাধ্যমগুলো মানুষের কাছে মানুষকে নিয়ে আসার ব্যাপারে দারুণ ভ‚মিকা পালন করছে।

আমি জানি আমি বুঝি মানুষ সামাজিক জীব। নিঃসঙ্গতা মানুষকে অসুস্থ করে তোলে। তারপরও কেন যে আমার এই একা থাকার ভাবনাগুলো আসে বুঝি না। জীবনের ভাবনাগুলো এক সময় ছিল একেবারে অন্যরকম, আর এখন পুরুটাই উল্টো। সময় মানুষকে কতোভাবে কতো দিকে টেনে নিয়ে যায়। আমি হয়ে পড়েছি সময়ের দাস। সময় আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্তে।

ম্যাল্টন, অন্টারিও, কানাডা

- Advertisement -

Related Articles

- Advertisement -

Latest Articles