
বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরি হত্যা মামলায় দুই দফায় সাত দিনের রিমান্ড শেষে আসামি জেরিকা তাসনিম দিশাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন তিনি বলে দাবি করেছে তদন্ত সংস্থা। তবে তদন্তের স্বার্থে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দিশাকে আদালতে হাজির করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন। এ সময় তাকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, দিশার পক্ষে কোনো জামিন আবেদন করা হয়নি।
তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনে বলা হয়, মামলার রহস্য উদঘাটনে বিভিন্ন কৌশলে দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, ঘটনার আগের দিন ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফের সঙ্গে উত্তরার নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলেন। এর আগে সন্ধ্যায়ও তারা দীর্ঘ সময় একসঙ্গে ঘোরাঘুরি করেন। বিভিন্ন স্থানে তাহসিফের মোটরসাইকেলে চড়েও ঘুরেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে দিশা মামলার বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে সেসব তথ্য গোপন রেখে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে তিনি অত্যন্ত কৌশলী হওয়ায় অনেক প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন এবং কিছু বিষয়ে নীরব থেকেছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা জানান, মামলার আরেক আসামি ও তাহসিফের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের বক্তব্যের সঙ্গে দিশার দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়েছে। পাশাপাশি তাহসিফের মুঠোফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণ করে দিশার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডে দিশার সংশ্লিষ্টতার কিছু তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বলেও আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তদন্তের স্বার্থে দিশাকে কারাগারে রাখা প্রয়োজন উল্লেখ করে তদন্ত কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, জামিনে মুক্তি পেলে তিনি আত্মগোপনে গিয়ে তদন্তে বিঘ্ন ঘটাতে পারেন। প্রয়োজনে মামলার আরও তথ্য জানার জন্য তাকে পুনরায় রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
এর আগে গত ১ নভেম্বর রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে দিশাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন তাকে প্রথম দফায় চার দিনের রিমান্ডে পাঠান আদালত। পরে ৪ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় আরও তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
এ মামলার আরেক আসামি দীপকেও কয়েক দফায় রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। গত ৩১ অক্টোবর প্রথম দফায় চার দিন, পরে দ্বিতীয় দফায় তিন দিন এবং তৃতীয় দফায় আরও তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত ২৮ অক্টোবর বিকেলে তুরাগের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফ সাউরির ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ। এর আগের দিন ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বন্ধু দীপের ডাকে বাসা থেকে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছিলেন তাহসিফ।
দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই রাতে একটি রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে খাবার খাওয়ার পর উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকায় তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান তিনি।
তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের তিন দিন পরও মামলা না হওয়ায় দীপকে ঘিরে নানা আলোচনা তৈরি হয়। পরে ৩০ অক্টোবর রাতে তাকে নৌ-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। একই রাতে তাহসিফের বাবা হত্যা মামলা দায়ের করলে ওই মামলায় দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৩০ অক্টোবর সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। মাদক কেনাবেচার স্থান হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় মধ্যরাতে তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার কথাও স্বীকার করেছিলেন দীপ। পরে তাকে সঙ্গে নিয়ে ওই এলাকা পরিদর্শন করেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কর্মকর্তারা।
তদন্তকারীরা এখন দিশা ও দীপের বক্তব্য, মুঠোফোনের কলতথ্য এবং অন্যান্য আলামত মিলিয়ে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছেন।

