
ভালোবাসা যে মৃত্যুর পরও ফুরিয়ে যায় না তারই এক হৃদয়স্পর্শী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ভারতের নাগাল্যান্ডের ৯০ বছর বয়সী মসেনয়ি ইয়াখরো
ভালোবাসা যে মৃত্যুর পরও ফুরিয়ে যায় না, তারই এক হৃদয়স্পর্শী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ভারতের নাগাল্যান্ডের ৯০ বছর বয়সী মসেনয়ি ইয়াখরো। প্রয়াত স্ত্রী ভিভোলহেরির সমাধিকে ঘিরে গড়ে তুলেছেন মনোরম ফুলের বাগান। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা সেই বাগান এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদেরও আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
নাগাল্যান্ডের কিগওয়েমা গ্রামের বাসিন্দা মসেনয়ির স্ত্রী ভিভোলহেরি প্রায় এক দশক আগে ৮০ বছর বয়সে মারা যান। মৃত্যুর আগে গ্রামের একটি পাহাড়ি মনোরম জায়গায় তাঁকে সমাহিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। স্ত্রীর সেই ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে তাঁর মৃত্যুর পর সমাধিস্থলটি সাজিয়ে তোলার উদ্যোগ নেন মসেনয়ি।
প্রতিদিন ভোরে নিজ হাতে বাগানের পরিচর্যা করতেন তিনি। ধীরে ধীরে সমাধিস্থলটি রূপ নেয় ফুলে ফুলে সাজানো এক সুন্দর উদ্যানে। বর্তমানে জায়গাটি ‘মসেন ভিউপয়েন্ট’ নামে পরিচিত। পাহাড়ি মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এই বাগান থেকে দেখা যায় নাগাল্যান্ডের বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ ও মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য।
বাগানে ফুটে রয়েছে নানা রঙের কসমস ফুল। রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট গাছ, বাতাসের দিক নির্দেশক যন্ত্র, বসার বেঞ্চ ও ঝুলন্ত দোলনা। স্থানীয় শিশুরা এখানে খেলাধুলা করে। পর্যটকেরাও ঘুরতে এসে সময় কাটান প্রবীণ মসেনয়ির সঙ্গে।
নিজের হাতে গড়ে তোলা বাগান নিয়ে বেশ আনন্দিত তিনি। দর্শনার্থীদের উপস্থিতি এবং তাঁদের মুখের হাসি তাঁকে তৃপ্তি দেয়। মসেনয়ি বলেন, মানুষ এখানে এসে আনন্দ পায়, তাদের খুশি দেখতে তাঁরও ভালো লাগে।
প্রয়াত স্ত্রীকে স্মরণ করে মসেনয়ি বলেন, ভিভোলহেরি ছিলেন অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ ও আদর্শ স্ত্রী। তাঁদের নাতি-নাতনিরাও তাঁকে ভীষণ ভালোবাসত।
ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও মসেনয়ির জ্ঞান ও স্মৃতিশক্তি বিস্ময়কর। একসময় সরকারি কার্যালয়ে পিয়নের চাকরি করার সময় লাইব্রেরিতে প্রচুর সময় কাটাতেন তিনি। পছন্দের বই পড়েই জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিজের গ্রামে জাপানি সেনাদের প্রবেশের স্মৃতিও এখনো স্পষ্টভাবে মনে করতে পারেন তিনি। বিভিন্ন ঐতিহাসিক তারিখও নির্ভুলভাবে বলে দিতে পারেন।
প্রতি বছর ১৫ জানুয়ারি নিজের জন্মদিনে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এই বাগানে আনন্দে মেতে ওঠেন মসেনয়ি। তবে জীবনের শেষ ইচ্ছার কথা জানাতেও দ্বিধা নেই তাঁর। হাসিমুখে তিনি জানিয়েছেন, মৃত্যুর পর তাঁর সমাধিও তৈরি করা হবে প্রিয় স্ত্রীর পাশে, এই স্মৃতি উদ্যানে।
মৃত্যুর পরও প্রিয় মানুষটিকে আগলে রাখার এই ব্যতিক্রমী প্রয়াস যেন বলে দেয়, সত্যিকারের ভালোবাসার কোনো সমাপ্তি নেই।

