
অ্যালকোহল সেবনের নিরাপদ মাত্রা নিয়ে দীর্ঘদিনের ধারণায় পরিবর্তন এনেছে কানাডিয়ান সেন্টার অন সাবস্ট্যান্স ইউজ অ্যান্ড অ্যাডিকশন (সিসিএসএ)। সংস্থাটির নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, সপ্তাহে দুই স্ট্যান্ডার্ড ড্রিংকসের বেশি অ্যালকোহল পান করলে নারী ও পুরুষ উভয়েরই স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। আগের নির্দেশিকার তুলনায় এই সীমা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। তবে অল্প পরিমাণে অ্যালকোহল সেবনের ঝুঁকি এবং এ বিষয়ে বিদ্যমান গবেষণার সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
আগের নির্দেশিকায় দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর জন্য পুরুষদের সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১৫টি এবং নারীদের ১০টি স্ট্যান্ডার্ড ড্রিংকসের মধ্যে অ্যালকোহল সেবন সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। নতুন নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, অ্যালকোহল সেবনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত কোনো মাত্রা নেই। সেবনের পরিমাণ যত বাড়ে, স্বাস্থ্যঝুঁকিও তত বাড়তে পারে।
অল্প পরিমাণে অ্যালকোহল পান করলে আদৌ কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করেছেন ‘প্রুফ: দ্য নিউ সায়েন্স অব অ্যালকোহল’ অনুষ্ঠানের সঞ্চালক অ্যান্থনি মরগান। এ বিষয়ে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অ্যালকোহল গবেষকদের সঙ্গে কথা বলেছেন।
সিবিসি ডকসকে দেওয়া বক্তব্যে মরগান বলেন, অ্যালকোহল নিয়ে বৈজ্ঞানিক ধারণা কত দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে, তা বিস্ময়কর। একসময় অনেকের মধ্যে ধারণা ছিল, সীমিত পরিমাণে অ্যালকোহল সেবন স্বাস্থ্যের জন্য কিছুটা উপকারী হতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণার আলোকে সেই ধারণা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। অ্যালকোহল সেবন ও স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে, অল্প পরিমাণে অ্যালকোহল পান করলে মৃত্যুঝুঁকি কমে কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন ভিন্ন ফল পাওয়া গেছে।
নতুন নির্দেশিকা অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হলেও, এর পেছনের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অ্যালকোহল-সম্পর্কিত লিভার রোগবিষয়ক গবেষক ডা. গৌতম মেহতার মতে, অ্যালকোহল সেবন ও মৃত্যুহারের সম্পর্ক নিয়ে করা অনেক গবেষণাই পর্যবেক্ষণমূলক। এ ধরনের গবেষণায় বিভিন্ন মানুষের স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও অ্যালকোহল পানের অভ্যাসের মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়। তবে শুধু এই সম্পর্কের ভিত্তিতে অ্যালকোহল সেবন সরাসরি মৃত্যুঝুঁকি কমায় বা বাড়ায় এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
মেহতা উল্লেখ করেন, কিছু পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখা গেছে, পরিমিত অ্যালকোহল পানকারীদের মধ্যে মৃত্যুহার অতিরিক্ত পানকারীদের তুলনায় কম। অন্যদিকে, যারা একেবারেই অ্যালকোহল পান করেন না, তাদের মধ্যে মৃত্যুহার পরিমিত পানকারীদের তুলনায় সামান্য বেশি দেখা গেছে।
তবে এই ফলাফলের ব্যাখ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। যারা বর্তমানে অ্যালকোহল পান করেন না, তাদের সবাই যে কখনোই পান করেননি, তা নয়। অতীতে অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন বা স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে অনেকে পান করা ছেড়ে দিতে পারেন। গবেষণায় তাঁদের অতীতের পান করার অভ্যাস যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিলে ফলাফল বিভ্রান্তিকর হতে পারে। মেহতার মতে, গবেষণার নকশা এবং তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা।
অ্যালকোহল সেবনের স্বাস্থ্যগত প্রভাব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গবেষণার ধরন, অংশগ্রহণকারীদের পূর্ববর্তী স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি পান করার অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই কোনো একটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণার ফলাফলকে সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রয়োগ করা যায় না।
তবে গবেষণাপদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, অ্যালকোহল সেবনের সঙ্গে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে এ বিষয়ে সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নির্দেশিকার মূল বার্তা হলো, অ্যালকোহল সেবনের পরিমাণ কমালে সংশ্লিষ্ট ঝুঁকিও কমানো সম্ভব। আর সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত মাত্রা ধরে নিয়ে অ্যালকোহল পান করাকে নিরাপদ বলা যায় না।

