
অনলাইনে পরিচয়, নিয়মিত কথা বলা, ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠতা—সবকিছুই অনেক সময় সত্যিকারের প্রেমের মতো মনে হয়। কিন্তু এই সম্পর্কের আড়ালে কেউ যদি আপনার বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে অর্থ, ব্যক্তিগত তথ্য কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে সেটি হতে পারে রোমান্স স্ক্যাম।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অ্যারন বুগালের মতে, এ ধরনের প্রতারকেরা শুরুতেই অর্থের কথা বলে না। বরং কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে কথাবার্তার মাধ্যমে বিশ্বাস অর্জন করে। পরে আবেগকে কাজে লাগিয়ে অর্থ বা ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
অনলাইনে পরিচিত কারও আচরণে নিচের লক্ষণগুলো দেখা গেলে সতর্ক হওয়া জরুরি—
১. ছবি অস্বাভাবিক রকম নিখুঁত
প্রোফাইলের ছবি অতিরিক্ত পেশাদার বা নিখুঁত মনে হলে সতর্ক থাকুন। একই ছবি অন্য কারও নামে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে ছবির মাধ্যমে অনুসন্ধান করা যেতে পারে।
২. পরিচয় ও কথাবার্তায় অসঙ্গতি
ব্যক্তিগত তথ্য খুব কম দেওয়া, আবার কথাবার্তায় নিজের পরিচয় বা জীবনের গল্প বারবার বদলে ফেলা সন্দেহের কারণ হতে পারে। সুন্দরভাবে সাজানো কোনো গল্পও যাচাই ছাড়া বিশ্বাস করা উচিত নয়।
৩. দেখা করতে বা ভিডিও কলে আসতে অনীহা
নিয়মিত কথা বললেও সামনাসামনি দেখা করতে না চাওয়া কিংবা ভিডিও কল এড়িয়ে চলা সতর্ক হওয়ার সংকেত। কাজ, অসুস্থতা, ভ্রমণ বা অন্য কোনো কারণ দেখিয়ে বারবার দেখা এড়িয়ে গেলে বিষয়টি যাচাই করুন।
৪. ভালোবাসার সুযোগে টাকা চাওয়া
সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর হঠাৎ চিকিৎসা, ভ্রমণ, বিমানভাড়া, আইনি জটিলতা বা জরুরি প্রয়োজনের কথা বলে টাকা চাওয়া প্রতারণার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। একবার টাকা দেওয়ার পর নতুন সমস্যার কথা বলে আবার অর্থ চাওয়াও হতে পারে।
৫. সহজে ফেরত পাওয়া যায় না—এমন পদ্ধতিতে টাকা চাওয়া
ব্যাংক স্থানান্তর, উপহার কার্ড বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে বললে সতর্ক থাকুন। এ ধরনের লেনদেনে টাকা ফেরত পাওয়া অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
৬. উপহারের নামেও অর্থ দাবি
বিদেশ থেকে দামি উপহার পাঠানোর কথা বলে পরে কুরিয়ার খরচ, শুল্ক বা পণ্য ছাড়ানোর জন্য টাকা চাইতে পারে প্রতারক। উপহার পাওয়ার আশায় এ ধরনের দাবিতে অর্থ পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ।
৭. পরিবার-বন্ধুদের থেকে দূরে রাখতে চাওয়া
আপনার পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্কটি নিয়ে আলোচনা করতে নিষেধ করা, তাদের প্রশ্নকে অবিশ্বাস হিসেবে দেখানো কিংবা আপনাকে কাছের মানুষদের থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা—এসবও সতর্ক সংকেত। প্রতারকেরা অনেক সময় ভুক্তভোগীকে অন্যদের পরামর্শ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে।
শুধু অর্থ নয়, ব্যক্তিগত তথ্যও ঝুঁকিতে
রোমান্স স্ক্যামের ক্ষতি শুধু অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিচয়পত্রের তথ্য, ব্যাংক ও আর্থিক তথ্য, পাসওয়ার্ড, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য কিংবা ব্যক্তিগত ছবি সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে প্রতারকেরা। এসব তথ্য পরে প্রতারণা, পরিচয় চুরি বা ব্ল্যাকমেইলের কাজে ব্যবহার করা হতে পারে।
এ ছাড়া ভুয়া বিনিয়োগ বা ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্মে অর্থ রাখার জন্যও প্রলুব্ধ করা হয়। ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও শেয়ার করার পর সেগুলো ব্যবহার করে অর্থ দাবি কিংবা ভয় দেখানোর ঘটনাও ঘটতে পারে।
কী করবেন?
একটি লক্ষণ দেখলেই যে কেউ নিশ্চিতভাবে প্রতারক—এমন নয়। তবে একাধিক সতর্ক সংকেত একসঙ্গে দেখা গেলে সম্পর্কের গতি কমিয়ে পরিচয় ও দাবিগুলো যাচাই করা জরুরি।
অনলাইনে পরিচিত কাউকে টাকা পাঠানোর আগে বিশ্বস্ত পরিবারের সদস্য বা বন্ধুর সঙ্গে বিষয়টি আলোচনা করুন। পাসওয়ার্ড, ব্যাংকসংক্রান্ত তথ্য, পরিচয়পত্রের তথ্য কিংবা ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল ছবি শেয়ার করা থেকে বিরত থাকুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অনলাইনে কোনো সম্পর্ক যতই গভীর বা আবেগপূর্ণ মনে হোক, বিশ্বাসের পাশাপাশি যাচাইও জরুরি। আবেগের মুহূর্তে নেওয়া একটি সিদ্ধান্তই কখনো বড় আর্থিক বা ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

