‘আমার বাবা ভালো বাবা, মিথ্যে অপবাদ দেওয়া হয়েছে’

‘আমার বাবা ভালো বাবা, মিথ্যে অপবাদ দেওয়া হয়েছে’ - the Bengali Times

তুবা ও তার বাবা অনিক সরদার

‘আমার বাবা ভালো বাবা। তার বিরুদ্ধে মিথ্যে অপবাদ দেওয়া হয়েছে।’ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে বরিশালের উজিরপুরের বামরাইলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তুবা বিনতে অরণি। বাবাকে মারধর করে বেঁধে রাখার দৃশ্য নিজের চোখে দেখা ছোট্ট মেয়েটির এখন একটাই চাওয়া—বাবা সুস্থ হয়ে আবার পরিবারের কাছে ফিরে আসুন।

গত শনিবার মধ্যরাত থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত তুবার বাবা অনিক সরদারকে চুরির অভিযোগে বেঁধে রেখে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে। ওই সময় তাকে বেঁধে রেখে চা-রুটি খাওয়ানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে।

- Advertisement -

তুবা জানায়, ভোররাতে বাবাকে আটকে মারধরের খবর পেয়ে সে মা ও ছোট বোনের সঙ্গে ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে বাবাকে দড়ি দিয়ে বাঁধা অবস্থায় দেখতে পায়। লাঠি দিয়ে মারধর ও লাথি দেওয়ার দৃশ্য দেখে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। বাবাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য বারবার অনুরোধ করলেও প্রথমে কেউ তার কথা শোনেনি।

তুবার ভাষায়, ‘আমি গিয়ে দেখি বাবাকে বেঁধে রেখে মারছে। আমি তাদের বলেছি, আমার বাবাকে আর মেরো না, আমার বাবাকে ছেড়ে দাও। বাবার খুব ক্ষুধা লাগছিল। একজন চা আর রুটি দিলে আমি বাবাকে খাইয়ে দিই।’

দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর অনিককে ছেড়ে দেওয়া হলে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসে পরিবার। এরপর দুদিন বাবাকে নিজের কাছে আগলে রাখে তুবা। তবে চিকিৎসার জন্য সোমবার তাকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এখন বাবার সুস্থ হয়ে ফেরার অপেক্ষায় ছোট্ট মেয়েটি।

তুবার মা জান্নাত বলেন, খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। মেয়েটি এতটাই উদ্বিগ্ন ছিল যে স্যান্ডেল পরারও সময় নেয়নি। বাবাকে মারধর করতে দেখে সে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে এবং তাকে না মারার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু তখন অনেকেই বিষয়টি ভিডিও করলেও তার কান্নায় কেউ গুরুত্ব দেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

অনিক সরদারের দাবি, চুরির অভিযোগের পেছনে কোনো প্রমাণ নেই। পূর্বশত্রুতা ও জমি নিয়ে বিরোধের জেরেই তাকে অপমান ও নির্যাতন করা হয়েছে। তার কাছ থেকে চুরির কোনো মালামাল উদ্ধার হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

অনিক বলেন, মেয়ের সামনে বেঁধে মারধর করা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টের ছিল। এখন তিনি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। পাশাপাশি পরিবারের জন্য একটি কাজের সুযোগ হলে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ভালোভাবে বাঁচতে পারবেন বলে জানান তিনি।

এ ঘটনায় প্রশাসনও পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছে। উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা জানান, বিষয়টি জানার পর তিনি তুবার বাড়িতে যান। অনিক অসুস্থ থাকায় তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সোমবার দুপুরে তাকে তিন মাসের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। এ সময় পরিবারের ভরণপোষণসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতায় উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সমাজের মানুষ পাশে থাকবে বলেও জানান তিনি।

বাবাকে বিদায় দেওয়ার সময় তুবার চোখে ছিল পানি। তার একটাই প্রত্যাশা—চিকিৎসা শেষে বাবা সুস্থ হয়ে আবার বাড়ি ফিরবেন। আর ফিরে এসে একটি কাজ পাবেন, যাতে পরিবারের কষ্ট কিছুটা হলেও দূর হয়।

ছোট্ট তুবার সেই আকুতি যেন বারবারই মনে করিয়ে দেয়—বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসার কাছে ভয়, অপমান কিংবা প্রতিকূলতাও কতটা অসহায়।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles