গত বছর কানাডায় প্রায় ৫০টি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ উদ্বোধন পিছিয়েছে

গত বছর কানাডায় প্রায় ৫০টি জীবন রক্ষাকারী ওষুধ উদ্বোধন পিছিয়েছে - the Bengali Times
এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মোস্ট ফেভারড নেশন বা এমএফএন মূল্যনীতির কথা সামনে এসেছে

কানাডায় নতুন জীবনরক্ষাকারী ও জীবন বর্ধনকারী ওষুধ বাজারে আনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গত বছর দেশটিতে প্রায় ৫০টি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের উদ্বোধন হয় বাতিল হয়েছে, নয়তো পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ওষুধ ইতিমধ্যেই হেলথ কানাডার অনুমোদনও পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিরল রোগসহ জটিল বিভিন্ন অসুখের চিকিৎসায় সর্বাধুনিক ওষুধ কানাডীয় রোগীদের কাছে সময়মতো পৌঁছানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সানিব্রুক হেলথ সায়েন্সেসের ফিজিশিয়ান-ইন-চিফ এবং একজন নেফ্রোলজিস্ট এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বিরল রোগের চিকিৎসায় সহায়ক হতে পারে এমন নতুন প্রজন্মের ওষুধ অদূর ভবিষ্যতে কানাডীয়দের জন্য সহজলভ্য নাও হতে পারে এই বিষয়টি সাধারণ মানুষের জানা প্রয়োজন।

এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মোস্ট ফেভারড নেশন’ বা এমএফএন মূল্যনীতির কথা সামনে এসেছে। গত বছরের মে মাসে এ সংক্রান্ত নীতি ও নির্বাহী আদেশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল প্রেসক্রিপশন ওষুধের ক্ষেত্রে মার্কিন নাগরিকদের বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ মূল্য না দিতে দেওয়া। ওষুধ সংস্থাগুলোর দৃষ্টিতে, এই নীতির সম্ভাব্য প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারে ওষুধের দাম নির্ধারণের ওপরও পড়তে পারে। বিশেষ করে কানাডার মতো তুলনামূলকভাবে কম দামের বাজারে নতুন ওষুধ ছাড়ার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

- Advertisement -

ইনোভেটিভ মেডিসিনস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, গবেষণাগারে একটি নতুন ওষুধের আবিষ্কার থেকে শুরু করে সেটিকে বাজারে আনার প্রক্রিয়া শেষ করতে সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছর সময় লাগে। এই দীর্ঘ গবেষণা, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় গড়ে প্রায় ৩৫০ কোটি ডলার ব্যয় হয়। এই বিপুল বিনিয়োগের একটি বড় অংশ ওষুধ কোম্পানিগুলো মার্কিন বাজার থেকে পুনরুদ্ধার করে। এর অন্যতম কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধের দাম সাধারণত ওইসিডি-ভুক্ত অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল জনসংখ্যার কারণে সেখানে নতুন ওষুধের সম্ভাব্য বাজারও অনেক বড়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে প্রত্যাশিত আয় কমে গেলে কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে ওষুধের দামের ওপর নতুন চাপ তৈরি হলে কোম্পানিগুলো ছোট ও তুলনামূলক কম দামের বাজারে নতুন ওষুধ চালুর বিষয়ে আরও সতর্ক হতে পারে।

কানাডায় নতুন কোনো ওষুধ বাজারে আসার প্রক্রিয়া শুধু হেলথ কানাডার অনুমোদনেই শেষ হয় না। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন হওয়ার পর হেলথ কানাডা ওষুধটি নিরাপদ ও কার্যকর বলে অনুমোদন দিলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা সেটিকে কানাডার ড্রাগ এজেন্সির কাছে জমা দেয়। এরপর ওষুধটির কার্যকারিতা, চিকিৎসায় সম্ভাব্য উপকার এবং সেই তুলনায় খরচ সবকিছু মূল্যায়ন করা হয়। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে সুপারিশ করা হয়, ওষুধটি সরকারি স্বাস্থ্যবিমা বা পাবলিক ইন্স্যুরেন্স প্ল্যানের আওতায় রাখা হবে কি না। অর্থাৎ, কোনো ওষুধ হেলথ কানাডার অনুমোদন পেলেও রোগীরা সঙ্গে সঙ্গে সেটি সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে পাওয়ার সুযোগ পান না। মূল্য নির্ধারণ ও সরকারি কভারেজের এই অতিরিক্ত ধাপের কারণে বাজারে ওষুধ পৌঁছাতে আরও সময় লাগে।

কানাডায় বাজারজাত করার পরিকল্পনা থাকা ১৬টি ওষুধ এমএফএন-সংক্রান্ত মূল্য নির্ধারণের কারণে সরাসরি বাতিল করা হয়েছে। আরও ৩২টি ওষুধের বাজারে প্রবেশ একই কারণে বিলম্বিত হয়েছে। এর ফলে উদ্বেগের বিষয় শুধু ওষুধ কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়। চিকিৎসকদের মতে, নতুন ওষুধ বাজারে না এলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন সেই রোগীরা, যাঁদের জন্য প্রচলিত চিকিৎসা কার্যকর নয় বা যাঁরা বিরল ও জটিল রোগে আক্রান্ত। বিশেষ করে বিরল রোগের ক্ষেত্রে নতুন ওষুধের সংখ্যা এমনিতেই সীমিত। তাই কোনো নতুন থেরাপি কানাডার বাজারে প্রবেশে কয়েক মাস বা কয়েক বছর পিছিয়ে গেলে রোগীদের চিকিৎসার সুযোগও সীমিত হয়ে যেতে পারে।

কানাডার স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং রোগীদের নাগালের মধ্যে চিকিৎসা রাখা দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু একই সঙ্গে নতুন ওষুধ যাতে দ্রুত রোগীদের কাছে পৌঁছায়, সেটিও চিকিৎসাক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মূল্য নির্ধারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ ও কোম্পানিগুলোর বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের টানাপোড়েনের ফলে কানাডায় নতুন ওষুধ বাজারজাতকরণ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। আর তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে এমন রোগীদের ওপর, যাঁদের জন্য নতুন প্রজন্মের চিকিৎসাই হয়তো শেষ ভরসা। তাই ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কানাডার বাজারে উদ্ভাবনী ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিও নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles