
ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে কানাডাজুড়ে ভ্রমণ ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক শহর টরন্টো ও ভ্যানকুভারে দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে হোটেল, বিমান ভাড়া এবং ভাড়ায় চালিত গাড়ির খরচ গত বছরের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে। সোমবার প্রকাশিত স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা-র সর্বশেষ প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন মাসে কানাডায় ভ্রমণকারীদের আবাসন ব্যয় সার্বিকভাবে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে বিশ্বকাপ আয়োজক দুই প্রদেশ অন্টারিও ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায়। এই দুই অঞ্চলে হোটেল ও অন্যান্য আবাসনের খরচ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি।
বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক দর্শক টরন্টো ও ভ্যানকুভারে ভিড় জমিয়েছেন। জুন মাসেই এই দুই শহরে মোট ১০টি বিশ্বকাপ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি জুলাই মাসেও আরও তিনটি ম্যাচ আয়োজন করা হচ্ছে। ফলে কয়েক সপ্তাহ ধরে পর্যটক ও ফুটবল সমর্থকদের চাপ অব্যাহত রয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে পর্যটন ও ভ্রমণ খাতে।
স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য বলছে, ভাড়ায় চালিত গাড়ির ভাড়া জুন মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেড়েছে। বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ, এর ঠিক আগের মাস মে-তে গাড়ি ভাড়ার খরচ প্রায় একই হারে কমেছিল। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি কেবল সাধারণ বাজার পরিস্থিতির ফল নয়; বরং বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাড়তি পর্যটক আগমনের কারণে গাড়ির চাহিদা বেড়ে যাওয়াই এর অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে বিমানবন্দর থেকে শহরে যাতায়াত এবং বিভিন্ন ম্যাচ ভেন্যুতে যাতায়াতের জন্য ভাড়ার গাড়ির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ফুটবল বিশ্বকাপকে ঘিরে জুন মাসে সামগ্রিক ভ্রমণ ব্যয়ও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তুলনামূলকভাবে মে মাসে এই প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ১ শতাংশ, যা দেখায় যে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভ্রমণ ব্যয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক ক্রীড়া আসর আয়োজনের ফলে হোটেল, পরিবহন, রেস্তোরাঁ এবং স্থানীয় ব্যবসাগুলো বাড়তি আয়ের সুযোগ পেলেও সাধারণ ভ্রমণকারীদের জন্য খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
জুন মাসে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বিমান ভাড়ার ঊর্ধ্বগতি। স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, বিমান ভাড়া গত বছরের জুনের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বোচ্চ বার্ষিক বৃদ্ধি। কেবল বিশ্বকাপের কারণে অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের চাহিদা বাড়েনি; একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে জেট ফুয়েলের আন্তর্জাতিক মূল্যও বেড়েছে। এর ফলে বিমান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সেই অতিরিক্ত ব্যয় টিকিটের মূল্যের মাধ্যমে যাত্রীদের ওপর চাপানো হচ্ছে। ন্যাশনাল ব্যাংকের অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ক্যামেরন ডুয়ার্কসেন এক গবেষণা নোটে উল্লেখ করেন, জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি এয়ারলাইন্সগুলোর ব্যয়ে পড়ছে। ফলে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই টিকিটের দাম বাড়িয়ে সেই অতিরিক্ত ব্যয় সমন্বয়ের চেষ্টা করছে।
বিশ্বকাপের মতো বড় আন্তর্জাতিক আয়োজন স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। হোটেল, পরিবহন, খাদ্য, খুচরা বিক্রয় এবং বিনোদন খাতে আয় বাড়ে। তবে এর বিপরীতে সাধারণ ভ্রমণকারী এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য আবাসন ও যাতায়াত ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলো শেষ না হওয়া পর্যন্ত টরন্টো ও ভ্যানকুভারে ভ্রমণ ব্যয় স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার সম্ভাবনা কম। পর্যটকদের উচ্চ চাহিদা অব্যাহত থাকলে হোটেল, ফ্লাইট এবং গাড়ি ভাড়ার বাজারে মূল্যচাপ আরও কিছুদিন বজায় থাকতে পারে।

