
এবার মাত্র একটি ফুল ফুটেছে। তবে আশা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। গাছের ডাটার দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, আরও দুটি কুঁড়ি অপেক্ষা করছে। হয়তো আগামীকাল, না হয় পরশু, তারাও পাপড়ি মেলে ধরবে। সেই আশাতেই প্রতিদিন একটু করে খোঁজ নেওয়া।
সারা বছর অপেক্ষা করে থাকি এই সময়টার জন্য। বসন্তের শেষভাগে কিংবা গ্রীষ্মের শুরুতে যখন আইরিশ ফুলগুলো ফোটে, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে তার রঙের বাক্স খুলে বসেছে। আগে এই ছোট্ট বাগানে অনেকগুলো আইরিশ ফুটত। এখন বছর বছর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। যত্নের অভাবে সৌন্দর্যও যে ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়, এই ফুলগুলো যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
ছবির এই চমৎকার ফুলটির নাম আইরিশ (Iris)। এটি আইরিশ পরিবারের একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, এটি একটি দ্বিরঙা বেয়ার্ডেড আইরিশ (Bearded Iris), যার বৈজ্ঞানিক নাম Iris germanica । গ্রিক পুরাণের রংধনুর দেবী আইরিশের নামানুসারেই ফুলটির নামকরণ।
ফুলটির গঠনও বেশ অভিনব। উপরের দিকে খাড়া হয়ে থাকা পাপড়িগুলোকে বলা হয় স্ট্যান্ডার্ডস (Standards), আর নিচের দিকে নুয়ে থাকা পাপড়িগুলোকে বলা হয় ফলস (Falls)। এই ফুলে উজ্জ্বল হলুদ রঙের স্ট্যান্ডার্ডসের সঙ্গে রয়েছে সাদা-হলুদ শিরাযুক্ত গাঢ় বেগুনি রঙের ফলস। আইরিশপ্রেমীদের ভাষায় এই রঙের সমন্বয়কে বলা হয় ভ্যারিগাটা (Variegata)। নিচের পাপড়ির গোড়ায় থাকা নরম রোমশ অংশটি দেখতে অনেকটা দাড়ির মতো, তাই এর নাম বেয়ার্ডেড আইরিশ।
মজার বিষয় হলো, এই ফুলগাছ আমরা লাগাইনি। বাড়িটি কেনার সময়ই এগুলো ছিল। দশ বছর আগে এক গ্রীষ্মকালে ফুটন্ত ফুলে ভরা ছোট্ট এই বাগানসহ বাড়িটি কিনেছিলাম। প্রথম দেখাতেই বাড়িটির প্রতি এক ধরনের মায়া জন্মেছিল। বাড়িটির সামনে পার্ক, পিছনে বিশাল হালট। মনে হয়েছিল, আগের মালিক নিশ্চয়ই সৌন্দর্যপ্রেমী মানুষ ছিলেন। ফুল আর প্রকৃতি পছন্দ করতেন।
বাড়িটি কেনার কিছুদিন পর একদিন আগের মালিক তাঁদের নামে আসা কয়েকটি চিঠি নিতে এসেছিলেন। কথায় কথায় তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ” বাড়িটি বিক্রি করলেন কেন?”
তিনি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলেছিলেন, “আমার স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল। তাই বাড়িটি বিক্রি করা ছাড়া আর উপায় ছিল না।”
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। কেন সেই বিচ্ছেদ হয়েছিল, সে প্রশ্ন করার সাহসও পাইনি, প্রয়োজনও মনে হয়নি। মানুষের জীবনের কিছু গল্প থাকে, যেগুলো জানার অধিকার বাইরের মানুষের থাকে না।
আজ এই সুন্দর ফুলটি প্রায় অবহেলাতেই বেঁচে আছে। তেমন কোনো যত্ন নেওয়া হয় না। ফলে গাছের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। আগে অনেকগুলো ডাটা উঠত, এবার উঠেছে মাত্র একটি। সেই একটি ডাটায় ফুটেছে একটি মাত্র ফুল।
প্রকৃতির নিয়ম বড় সহজ। যত্ন ছাড়া কিছুই টেকে না। ফুলগাছ টেকে না, বাগান টেকে না, সৌন্দর্য টেকে না।
আর শুধু ফুলগাছই বা কেন?
যত্ন ছাড়া ভালোবাসাও টেকে না। সম্পর্কও টেকে না। একসময় রঙিন পাপড়ির মতো উজ্জ্বল যা ছিল, অবহেলার ঋতু পেরোতে পেরোতে তা-ও মলিন হয়ে যায়।
টরন্টো, কানাডা

