
কানাডায় পুরুষ ও বালকদের স্বাস্থ্যসংকট নিয়ে নতুন করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগের মূল প্রতিপাদ্য “মুখ বুজে সহ্য করার সময় শেষ, এখন কথা বলার সময়।” একজন বাংলাদেশি কানাডিয়ান সবুর খান এই প্রতিবেদককে বলেন, এটা ছিলো সময়ের দাবি। আমি আনন্দিত।
পুরুষ ও বালকদের জন্য কানাডার প্রথম জাতীয় স্বাস্থ্য কৌশল প্রণয়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো পুরুষদের স্বল্প আয়ু, উচ্চ আত্মহত্যার হার এবং অন্যান্য গুরুতর স্বাস্থ্য বৈষম্যের বিষয়গুলো সামনে এনে একটি জাতীয় সংলাপ তৈরি করা।
এই উদ্যোগের সহ-আয়োজকদের একজন এগলিন্টন-লরেন্সের এমপি ভিন্স গ্যাসপারো। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, গত চার-পাঁচ বছরে সমাজে পুরুষ ও বালকদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষাক্ষেত্রে এই বৈষম্য স্পষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে নারীদের উপস্থিতি এখন পুরুষদের তুলনায় বেশি।
গ্যাসপারো আরও উল্লেখ করেন, পুরুষদের মধ্যে আত্মহত্যার হার নারীদের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি, যা একটি গভীর সামাজিক ও মানসিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। একইভাবে, ওপিয়ড ওভারডোজের ঘটনাও পুরুষদের মধ্যে নারীদের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। তার ভাষায়, “এটা বলা নিরাপদ যে আমাদের পুরুষ ও বালকরা বর্তমানে একটি গুরুতর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।”
এই জাতীয় স্বাস্থ্য কৌশলের প্রস্তাব প্রথম উত্থাপিত হয় গত বছরের শেষ দিকে। পরবর্তীতে গত মাস থেকে এ বিষয়ে বিভিন্ন মহলের মতামত গ্রহণ শুরু হয়েছে। কৌশলটির প্রস্তাব দেন কানাডার স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমারজোরি মিশেল।
গ্যাসপারোর মতে, এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ফেডারেল সরকার এখন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করছে যে সমস্যাটি বাস্তব এবং তা অবহেলা করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, “এটি শুধু কানাডার সমস্যা নয়, বরং একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা।”
এই সংকটের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারণা। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি মানসিকতা “নীরবতাই প্রকৃত পুরুষত্বের লক্ষণ” পুরুষদের নিজেদের সমস্যার কথা প্রকাশ করতে নিরুৎসাহিত করেছে। শারীরিক বা মানসিক যেকোনো কষ্টের ক্ষেত্রেই তাদের বলা হয়েছে তা সহ্য করে এগিয়ে যেতে।
এই সংস্কৃতির ফলে ব্যক্তিগত পর্যায়ে যেমন মানসিক চাপ ও একাকীত্ব বেড়েছে, তেমনি এর অর্থনৈতিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। কর্মক্ষমতা হ্রাস, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সব মিলিয়ে এটি একটি বহুমাত্রিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন এই জাতীয় কৌশল যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
সব মিলিয়ে, কানাডার এই উদ্যোগটি শুধু একটি স্বাস্থ্য নীতি নয়, বরং একটি সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে যেখানে পুরুষদের অনুভূতি, দুর্বলতা এবং সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সোহেলি আহমেদ সুইটি : লোকাল জার্নালিজম ইনিশিয়েটিভ রিপোর্টার

