শিরীন শারমিন চৌধুরীর আত্মগোপনের দেড় বছর

শিরীন শারমিন চৌধুরীর আত্মগোপনের দেড় বছর - the Bengali Times
শিরীন শারমিন চৌধুরী

ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের ফলে গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী স্বৈরাচার শেখ হাসিনা। এ ঘটনার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনেকে গ্রেপ্তার আতঙ্কে আত্মগোপনে চলে যান। গ্রেপ্তারও হন অনেকে। সরকারের পতনের ২৭ দিনের মাথায় সাবেক স্পিকার পদ থেকে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সরে দাঁড়ান বলে জানিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর গত দেড় বছরে তাকে আর প্রকাশ্যে আসতে দেখা যায়নি। এই সময়ের মধ্যে তার অবস্থান নিয়ে নানা গুঞ্জন শোনা গেছে। কিন্তু তিনি এত দিন কোথায় ছিলেন এবং মঙ্গলবার কীভাবে পুলিশের কাছে ধরা পড়লেন?

সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে ধানমন্ডি থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, প্রায় দেড় বছর পর ‘গোপন তথ্যের ভিত্তিতে’ ধানমন্ডির ৮/এ’র চাচাতো ভাইয়ের বাসা থেকে সাবেক স্পিকারকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ডিবি-প্রধান বলছেন, তারা জানতে পেরেছেন যে, ঢাকা সেনানিবাস থেকে বের হওয়ার পর দেশের ভেতরেই বিভিন্ন জায়গায় ‘আত্মগোপনে ছিলেন’ শিরীন শারমিন চৌধুরী। ‘উনি বলছেন যে, এত দিন দেশেই ছিলেন। যে বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেটা তার স্বামীর নামে বলে জানতে পেরেছি। ধরা পড়ার আগে তিনি কোথায় কোথায় ছিলেন, জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।

- Advertisement -

এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর লালবাগ থানার একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালত। এর আগে আদালত রিমান্ড ও জামিন নামঞ্জুর করেন। সাবেক স্পিকারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়ার পর নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের পাল্টাপাল্টি স্লোগান ও হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় সাংবাদিকদের ওপর বিচারকের ক্ষোভ ঝাড়ার ঘটনা ঘটে।

মঙ্গলবার দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (সিএমএম) আনার পর তাকে সিএমএম আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। পরে রিমান্ড ও জামিনসংক্রান্ত শুনানি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। গণঅভ্যুত্থানের সময় সহিংসতা, ভাঙচুর ও হত্যাচেষ্টার ঘটনায় রাজধানীর লালবাগ থানায় করা একটি মামলায় শিরীন শারমিন চৌধুরীকে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। অন্যদিকে রিমান্ড আবেদন বাতিল চেয়ে জামিনের আবেদন করে আসামিপক্ষ। পরে রিমান্ড ও জামিন আবেদন দুটিই নামঞ্জুর করেন আদালত।

আসামিপক্ষের আইনজীবী হামিদুল মিজবাহ বলেন, উনি একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি ছিলেন। সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে শপথ নিয়েছেন। ওনার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার যে মামলা, তা লালবাগের; আমরা সেই মামলায় জামিন চেয়েছিলাম। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনার একজন অন্যতম সহযোগী ছিলেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। তাকে আত্মগোপন থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। জুলাইয়ে হত্যা ও নির্যাতনের পরিকল্পনার সঙ্গে তিনি জড়িত। এ জন্য তার রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।

ঢাকার আদালতে সাবেক স্পিকারের রিমান্ড শুনানিকে কেন্দ্র করে চরম বিশৃঙ্খলা ও হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়ে বিচারক সাংবাদিকদের ওপরই ক্ষোভ ঝাড়েন, যা নিয়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল দুপুরে আদালতে এ ঘটনা ঘটে। বেলা ৩টার পর শিরীন শারমিনকে এজলাসে তোলা হয়। শুনানি শেষে আদালত রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আদেশ ঘোষণার পরপরই আসামিপক্ষের আইনজীবীরা এজলাসের ভেতরে হট্টগোল শুরু করেন। পুরো পরিস্থিতিতে বিচারককে এজলাসে নির্লিপ্তভাবে বসে থাকতে দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

একপর্যায়ে আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়ে বিচারক আদালতে পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে তাদের এজলাস থেকে বের করে দেওয়া হয়। এ সময় মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন। কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন আচরণে আদালতে উপস্থিত আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিচারিক পরিবেশে এমন পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

এ সময় এজলাসে উপস্থিত সংবাদকর্মী তসলিম হোসেন রনি বলেন, ‘আদালতে চলমান বিশৃঙ্খলার মধ্যেই আমরা দায়িত্ব পালন করছিলাম। এ সময় হঠাৎ বিচারক সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন। ক্ষোভ প্রকাশ করে কর্মরত সাংবাদিকদের এজলাস থেকে বের করে দেন। ঘটনাটি আমাদের বিস্মিত করেছে।’

ঢাকার সিএমএম আদালত প্রাঙ্গণে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের পাল্টাপাল্টি স্লোগানে আদালত প্রাঙ্গণে উত্তেজনা দেখা দেয়। শিরীন শারমিন চৌধুরীকে আদালত থেকে হাজতখানায় নেওয়ার সময় আদালত প্রাঙ্গণে হট্টগোলের ঘটনা ঘটে। তাকে আদালতের দ্বিতীয় তলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামানোর সময় আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীরা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘শিরীন আপার ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’ স্লোগান দিতে থাকেন। পরে তারা সিএমএম আদালতের সামনে এলে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরাও পাল্টা স্লোগান দেন। ‘আইনজীবী ফোরামের অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’, ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’, ‘সন্ত্রাসীদের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘আওয়ামী লীগের কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’Ñ এসব স্লোগান দেন তারা।

দেড় বছর কোথায় আত্মগোপনে ছিলেন?

গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ভারতে পালিয়ে যাওয়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনেকে গ্রেপ্তার আতঙ্কে আত্মগোপনে চলে যান। গ্রেপ্তারও হন অনেকে। জনরোষে প্রাণহানির আশঙ্কায় সে সময় অনেকে বিভিন্ন সেনানিবাসেও আশ্রয় নিয়েছিলেন। তখন ছয় শতাধিক ব্যক্তিকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক নেতা, বিচারক, আমলা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যরা ছিলেন বলে ২০২৪ সালের ১৮ অগাস্ট প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। ‘মানবিক দায়বদ্ধতার কারণে এবং আইনবহির্ভূত হত্যাকা- থেকে জীবন রক্ষা করতেই’ তাদের সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল বলে আইএসপিআরের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। প্রাথমিকভাবে সবার নাম-পরিচয় প্রকাশ করা না হলেও বছরখানেকের মাথায় গত বছরের ২২ মে সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের নামের একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেই তালিকায় আওয়ামী লীগের অন্য অনেক নেতাদের সঙ্গে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর নামও ছিল। সেখান থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতনের পর সাবেক স্পিকার সপরিবারে ঢাকা সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

সেনানিবাসে থাকা অবস্থায়ই ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর শিরীন শারমিন রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান বলে ধারণা করা হয়। কীভাবে তিনি সেনানিবাসে গিয়েছিলেন, তার একটি বর্ণনা পাওয়া যায় সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের এক জবানবন্দিতে।

গত বছরের এপ্রিলে পলক আদালতকে জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতনের দিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুসহ তারা প্রায় ১২ জন জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরের একটি কক্ষে ‘লুকিয়ে ছিলেন’। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর রাত আড়াইটার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেখানে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে সেনানিবাসে নিয়ে যান বলে জানান পলক। কিছুদিন পর দেশ ছাড়ার প্রস্তুতিকালে পলক ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হন। কিন্তু শিরীন শারমিন চৌধুরীর কোনো খোঁজ তখন পাওয়া যায়নি। তিনি কত দিন সেনানিবাসে ছিলেন এবং কবে বের হন, সে বিষয়েও আইএসপিআরের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা মামলাসহ অন্তত অধা ডজন মামলার আসামি হিসেবে নাম রয়েছে শিরীন শারমিন চৌধুরীর। এর মধ্যে একটি রংপুরের শ্রমিক মুসলিম উদ্দিন হত্যা মামলা। এজাহারের তথ্য থেকে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রংপুরে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় তিনি নিহত হন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ২৭ অগাস্ট নিহতের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার বাদী হয়ে আদালতে মামলাটি করেন। সেখানে শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়। টিপু মুনশিকে আগেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হিসেবে জাতীয় সংসদে যান শিরীন শারমিন চৌধুরী। এরপর মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। নবম সংসদের শেষ দিকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুর পর সেই সময়ের স্পিকার আবদুল হামিদকে রাষ্ট্রপতি বানায় আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী স্পিকার নির্বাচিত হন শিরীন শারমিন চৌধুরী। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি টানা তিন মেয়াদে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles