
আজ তার ঘুম হবে না। উত্তম কুমারেরও না। দুই যুগ পর সুচিত্রা সেনকে খুঁজে পাওয়া গেছে। গতকাল থেকে ওরা ফেসবুক বন্ধু। একসময় উত্তম কুমার দিনরাত চব্বিশঘণ্টা সুচিত্রা সেনকে নিয়ে কবিতা লিখত। খাতার পাতায় স্কেচ আঁকত।
সুচিত্রা সেনদের তিনটে বাড়ির পরের বাড়ির দেয়ালে ছেলেমেয়েরা মিলে একটি দেয়াল পত্রিকা লাগাত। দেশে চলছে উনসত্তরের গণআন্দোলন। প্রায় প্রতিটি লেখাতেই দেশপ্রেম আর বিপ্লব-বিদ্রোহ। অথচ দেয়াল পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় একটি কবিতা ছাপা হলো যার নাম, ‘বৃষ্টি তুমি স্নান করো’। কবিতাটি ছিল এরকম;
জগত বৃক্ষ করেছ সবুজ
কত জমি উর্বর
কৃষ্ণচূড়া গাছের সিঁদুর
পাখীদের মর্মর প্রস্তর
পৃথিবীর সব উজ্জ্বলতায় তোমার স্বাক্ষর।
তুমি বৃষ্টি।
নিজ পায়ে কুড়াল মারে মূর্খ মানুষ
করে নষ্টামি।
কেউ দায় নিতে চায় না
দেখে না শ্যামলিমা
একমাত্র তুমিই রেখেছ প্রকৃতি করে
মানুষ করে নি কিছু।
কেউ ভাবছে না একদিন এদেশটা বাংলাদেশ হবে
বৃষ্টি তুমি স্নান করো
তোমার গায়ে অনেক ধুলো।
বলা বাহুল্য উত্তম কুমারের কবিতা পাকিস্তান কেন পৃথিবীর কোন দেশের পত্রিকায় কখনো ছাপা হয়নি। ছাপানো তো দূরের কথা, না ছাপানোর কারণটাও বলার কেউ প্রয়োজন মনে করে নি। এতোই অ-কবিতা ছিল উত্তম কুমারের কবিতা। কিন্তু, একজন মানুষ ছিল যার মনে ভীষণ ধরেছিল ‘বৃষ্টি তুমি স্নান করো’।
ঘটনাটা এরকম। সবেমাত্র বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছে একটি পরিবার। সেই পরিবারে একটি মেয়ে ছিল। কয়েকদিনের মধ্যে মেয়েটার সাথে পাশের বাসার চম্পার ভাব হয়ে যায়। চম্পা উত্তম কুমারকে মামা ডাকতো। এমনি পাড়াত মামা যাকে বলে।
চম্পা এবং নতুন মেয়েটি প্রতিদিন ইভনিং ওয়াক করতে বের হতো। চম্পা একদিন বলল, এসো তোমাকে একটা জিনিস দেখাই। কবি মামা একটা কবিতা লিখেছে।
তারপর হাঁটাহাঁটি বন্ধ করে ওরা দেয়াল পত্রিকা পড়তে লাগল। চম্পা ইশারা করে দেখাল, তোমাদের পাশের বাড়িতে থাকে আমার এই মামা। চম্পার হাত ওঠান এবং মেয়েটির ফিরে তাকান ছাদের ওপর থেকে দেখল একজন অখ্যাত কবি।
পরের দিনের ঘটনা হলো আসল ঘটনা। ইভনিং ওয়াকে চম্পা আসতে পারেনি। মেয়েটি একা একাই হাঁটছে। গলিটা বেশ ফাঁকা ছিল। হয়তো বিরাট মিটিং আছে পলটন ময়দানে। পল্টনে মিটিং থাকলে ঢাকা শহর ফাঁকা হয়ে যেত। হাঁটতে হাঁটতে সে দেয়াল পত্রিকার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আবারও পড়লো ‘বৃষ্টি তুমি স্নান করো’। তার সন্দেহ হলো। কবি বোধ হয় ছাদে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। আসলেই তাই।
মেয়েটা কতসব কাণ্ড করতে পারে তা কবির জানবার কথা নয়, কি করে জানবে। মহল্লায় এসেছে মাত্র দুই সপ্তাহ হলো। কপাল থেকে লাল টিপ খুলে কবিতার শিরোনামের পাশে লাগিয়ে দিল মেয়েটি। তারপর চেয়ে চেয়ে দেখল স্বীকৃতি পাওয়া কবির মুখ দেখতে কেমন লাগে।
একবার ডাইরির পাতায় উত্তম কুমার লিখেছিল ‘রাজহংসীর মত ফর্সা তুমি, ডিম লাইটের আলোতে তোমার চোখে ঘুম হয়ে ঘুমোতে চাই’। ইত্যাদি।
নতুন নতুন উপমা দিয়ে সুচিত্রা সেনকে ডাকতে ভালোই লাগছে। প্রতিদিন এতকিছু লেখা হয় কিন্তু মেয়েটি কখনো এসব জানতে পারে না। এ পর্যন্ত কম করে হলেও তাকে একশটা উপমা দিয়েছে উত্তম কুমার। দেয়াল পত্রিকায় লেখা কবিতা সুচিত্রা সেনকে নিয়ে লেখা নয়, যখন লিখেছিল তখন জানতোই না পাশের বাসার তিন তলাতে কারা এসেছে। কিন্তু কবিতায় লাল টিপ লাগিয়ে দেবার পর থেকে প্রতিটি লেখা হয়েছে মেয়েটিকে নিয়ে।
অনেক হয়েছে আর নয়, যা হবার হবে। রাজহংসী উপমা তাকে জানাতে হবে। যেমনি কথা তেমনি কাজ। দোকান থেকে পাঁচ শলা সিগারেট কেনার পর আট আনা বেঁচেছিল। সেই পয়সা ঘুষ দিয়ে সুচিত্রা সেনদের কাজের মেয়েকে বলল, চিঠিটি তোর আপাকে দিবি। এরপর চটজলদি ছাদে উঠে কাজের অগ্রগতি দেখার জন্য অপেক্ষে করল। কাজের মেয়ে সুচিত্রা সেনের হাতে চিঠি দিয়ে আট আনা আঁচলে গিঁট দিল।
বর্ষা মৌসুম এসে গেছে। তিন চারদিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। এমনি একদিন দুইজোড়া চোখ হাই-জাম্প লংজাম্প খেলেছে মনের সুখে। এক বাড়ির ছাদে উত্তম কুমার। অন্য বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে সুচিত্রা সেন। মৌসুমি বৃষ্টি আর থামছে না। উত্তম কুমার ছাদে দাঁড়িয়ে মন ভরে ভিজছে। সেটা দেখে পাশের বাসার রাজহংসীর পাখার নিচ থেকে বেরিয়ে এল দুটি হাত। আঁজলা ভরা বৃষ্টি নিয়ে প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে তাকিয়ে রইলো, দেব নাকি ভিজিয়ে?
মেয়েটি দূরত্ব ভুলে গেল। ভুলে গেল পেশি শক্তির আন্দাজ। যত জোরে পারে আঁজলা দিল উঁচিয়ে। ওর হাতে ছিল হলুদ রঙের কাঁচের চুড়ি। গির্জার ঘণ্টার মত বেজে উঠল ভেজা শব্দ। শুধু কী বৃষ্টি? মুষলধারে যাকে বলে। বাতাস টেনে নিলো ছুড়ে মারা জল ঘুড়ি। সব ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়লো নিজ গায়ে। না যাক ছুঁড়ে মারা বৃষ্টি জল, তবুও সুচিত্রা সেন খুশিতে দন্ত-খোলা হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। সর্বনাশ যা হবার তা হয়ে গেল কবির। কবি হৃদয়ে নদী বইতে শুরু করে দিল।
এরও কিছুদিন আগের কথা। একদিন বেবিট্যাক্সি থেকে নামতে গিয়ে মেয়েটির দুধে আলতা কোমর দেখে ফেলে উত্তম কুমার। পরে জেনেছিল সেদিনই সে প্রথম শাড়ি পরেছিল। তা পরুক। ততোক্ষণে উত্তম কুমার মেয়েটির নাম দিয়ে দিয়েছে সুচিত্রা সেন। মনে মনে বলেছিল থাকুক স্মরণীয় হয়ে প্রথম শাড়ি পরা দিন। তুমি সুচিত্রা সেন। আজ থেকে আমি উত্তম কুমার। এটাই আমাদের ছদ্মনাম।
আর একদিনের গল্প। ভাত ঘুম দিতে ব্যস্ত মহল্লা বাসি। এমনিতেই উত্তম কুমারদের বাসায় অতিরিক্ত ঘুমের বাহার। সচরাচর অন্য বাড়িতে যা দেখা যায় না উত্তম কুমারদের বাড়িতে সেটাও খুব হয়। ওদের বাড়ির কাজের ছেলে-মেয়েরাও দিনের বেলায় ঘুম দেয়। শুধু উত্তম কুমারের চোখে ঘুম নেই। কি করে হবে? চোখের হাই-জাম্প লংজাম্প সব তো দিনের এই সময়টাতেই বেশি হয়।
হেঁটে হেঁটে ছাদের খাল তুলে দিয়েছে উত্তম কুমার। সুচিত্রা সেন সম্পূর্ণ নিখোঁজ। ওদের বাড়ি ভর্তি মেহমান তাতে কী, দু’একবার বারান্দায় আসতে অসুবিধা কোথায়?
উত্তম কুমার সিগারেটের আগুন দিয়ে সিগারেট ধরায়। কি কাণ্ড কি কাণ্ড হঠাৎ কোথা থেকে ছোট্ট একটি শিশু কোলে নিয়ে সুচিত্রা সেন চলে এল উত্তম কুমারদের ছাদে। ছাদে এল বটে কিন্তু সিঁড়ির দুই ধাপ নিচে দাঁড়িয়ে থাকল। যেন ওদের বাড়ির কেউ দেখতে না পারে।
উত্তম কুমারের হাতে ক্যাপেস্টান সিগারেট। সুচিত্রা সেন দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে শিশুটিকে। দেখে মনে হচ্ছে বাচ্চাটি পরে যেতে পারে তেমন ভয় পাচ্ছে। ভয় পাবারই কথা। মাত্র দু’মাস আগে জীবনের প্রথম শাড়ি পরেছে সে। বাচ্চা কোলে নেওয়ার অভিজ্ঞতা আসবে কোথা থেকে?
উত্তম কুমার প্রশ্ন করলো, এত বড় বাচ্চার মা তুমি?
সুচিত্রা সেন লজ্জা পেল না তবু লজ্জার ভাব করে বলল, মা হতে আর ক’দিন লাগে?
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে সুচিত্রা সেন শিশুটিকে জিজ্ঞেস করেছিল তাজমহলের নাম শুনেছ লক্ষ্মী সোনা?
শোনো নি!
শাহজাহান?
একটু অপেক্ষা কর আজ তোমাকে শাহজাহান দর্শন করাবো।
পাশাপাশি বলা ভুল হবে খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে ওরা। নিমন্ত্রণ খেতে আসা অতিথির ফুটফুটে বাচ্চাটাকে সুচিত্রা সেন আদর করেই যাচ্ছে। আদর করতে করতে এক সময় সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে আসে উত্তম কুমারের ছাদে। আদর করতে করতে সুচিত্রা সেন বলল, এই যে লক্ষীসোনা, এই লোকটি।
সেদিন ওকেও যদি উত্তম কুমার একটু আদর করে দিতো কী যে ভালো হতো। সুচিত্রা সেন যেন সেটাই চেয়েছিল। না হলে কোনদিন তো এভাবে ছাদে উঠে আসে না। কিন্তু ভীরু উত্তম কুমার সেটা করতে পারে নি। সিগারেট টেনে টেনে মনের ভয় তাড়িয়েছে। ওদের গাড়ি ছুটে যাবার সেটাও একটা কারণ হতে পারে।
একটি শিশুকে সাক্ষী রেখে বলা, ‘এই লোকটি’ আর অব্যক্ত কথা ‘আমি ভালবাসি’ বুঝতে পেরেও সিগারেট টেনে যাওয়া ভুল হয়েছিল। রাজনীতি আর প্রেমের ব্যাপারে ভুল করা মানে বিরোধী দলে থাকা। যদিও এতদিন পর জংশনের বাইরে ওরা পুনরায় সংযুক্ত কিন্তু এখানে তো নেই কোন প্লাটফর্ম। এমনকি পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ের নাম বদলিয়ে এখন রেল গাড়ীর নাম হয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। দিল্লি তো বহু দূর।
প্রথম দিনেই উত্তম কুমার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে,
বৃষ্টির কোন বয়স নেই।
স্কারবোরো, কানাডা

