যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার ব্যাপারে কানাডাকে আগেভাগে কিছু জানানো হয়নি

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার ব্যাপারে কানাডাকে আগেভাগে কিছু জানানো হয়নি - the Bengali Times
কার্নি বলেন বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা মূলত আইনের শাসনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক হামলাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এ হামলা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, তিনি এই পদক্ষেপকে “দুঃখের সঙ্গে সমর্থন” করছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন যে, এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোকে দুর্বল করে দিতে পারে এবং বিশ্বব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে।

২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত হামলার পর এই বিষয়ে প্রথমবারের মতো সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন কার্নি। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, কানাডাকে আগেভাগে এ হামলার বিষয়ে অবহিত করা হয়নি এবং এতে অংশগ্রহণের জন্যও কোনো অনুরোধ করা হয়নি। তার মতে, ঘটনাটি আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।

- Advertisement -

কার্নি বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা মূলত আইনের শাসনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই কাঠামোর ধারাবাহিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সম্পৃক্ততা ছাড়া এমন সামরিক পদক্ষেপ বিশ্বরাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, “এই হামলাটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে প্রতীয়মান হয়েছে। আমাদেরকে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি এবং এতে অংশগ্রহণ করতেও বলা হয়নি। তাই এটি আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ কি না সেটা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।” প্রধানমন্ত্রী সিডনিতে বুধবার সকালে এবং কানাডার রাজধানী অটোয়াতে মঙ্গলবার বিকেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের সময় এই মন্তব্য করেন।

গত সপ্তাহান্তে কার্নি বেশিরভাগ ইউরোপীয় মিত্র দেশের সঙ্গে একই অবস্থান গ্রহণ করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে সমর্থন করেন। পরবর্তীতে এই সামরিক অভিযানে ইসরায়েলও যুক্ত হয়। তবে কানাডার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিষয়টি নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। লিবারেল পার্টির কিছু সংসদ সদস্য এই অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কানাডার উচিত বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া এমনকি যদি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রটি প্রতিপক্ষ হিসেবেও বিবেচিত হয়।

প্রধানমন্ত্রী কার্নি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত না করেই এই সামরিক অভিযান শুরু করেছে। তবে তার মতে, ওয়াশিংটন দাবি করছে যে ইরানের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জবাব দিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং রাষ্ট্রপ্রণোদিত সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। কার্নি মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে এই কর্মসূচির অবসান প্রয়োজন।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, সামরিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা ও আইনগত কাঠামোকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। অন্যদিকে তিনি ইরানের প্রতিও আহ্বান জানান, যাতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা বন্ধ করা হয় এবং উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলার মতো পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকা হয়।

এদিকে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনীতা আনান্দ জানিয়েছেন, পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত কানাডিয়ান নাগরিকদের সরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার অভিযান পরিচালনার জন্য ওমানের কাছে তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। তার মতে, কানাডা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক হামলার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আবারও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব এবং সামরিক হস্তক্ষেপের নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যও সেই বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে যেখানে একদিকে নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইনের নীতি ও মানবিক উদ্বেগ এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা চলছে।

- Advertisement -

Related Articles

Latest Articles