
কানাডার বৃহত্তম শহর টরন্টোর আগামী মেয়র নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাবেক টরন্টো সিটি কাউন্সিলর এবং অন্টারিও প্রাদেশিক সংসদের সদস্য (এমপিপি) মাইকেল ফোর্ড জানিয়েছেন, তিনি শহরের পরবর্তী মেয়র নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। এই ঘোষণা টরন্টোর রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে, কারণ ফোর্ড পরিবার দীর্ঘদিন ধরেই শহরের রাজনীতিতে প্রভাবশালী একটি নাম।
মাইকেল ফোর্ড হলেন অন্টারিওর বর্তমান প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ডের ভাগ্নে এবং টরন্টোর সাবেক বিতর্কিত কিন্তু জনপ্রিয় মেয়র রব ফোর্ডেরও ভাগ্নে। ফলে তার সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
বুধবার বিকেলে এক প্রতিক্রিয়ায় মাইকেল ফোর্ড নিশ্চিত করেন যে, তিনি আসন্ন মেয়র নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করছেন। তার মতে, টরন্টোবাসীর সামনে বর্তমানে বেশ কয়েকটি গুরুতর সমস্যা রয়েছে, যার মধ্যে অপরাধ বৃদ্ধি, যানজট এবং ক্রমবর্ধমান সম্পত্তি কর সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, “অনেক টরন্টোবাসীর মতো আমরাও অপরাধ, যানজট এবং আকাশচুম্বি সম্পত্তি করকে শহরের প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখছি। এই বিষয়গুলো নাগরিকদের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে।” মাইকেল ফোর্ড আরও বলেন, জনসেবা সবসময়ই তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই কারণেই তিনি মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছেন।
টরন্টোর বর্তমান মেয়র অলিভিয়া চাউ এখন পর্যন্ত ঘোষণা দেননি যে তিনি আবারও মেয়র পদে নির্বাচন করবেন কিনা। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তিনি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। এদিকে ইস্ট-এন্ডের কাউন্সিলর ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড ইতিমধ্যেই নির্বাচনে অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে টরন্টোর সাবেক মেয়র জন টরি পুনরায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা স্পষ্টভাবে নাকচ করে দিয়েছেন। ফলে আগামী নির্বাচনে নতুন নেতৃত্বের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যেখানে মাইকেল ফোর্ডের মতো তরুণ রাজনীতিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মাইকেল ফোর্ডের রাজনৈতিক পথচলার সঙ্গে ফোর্ড পরিবারের ঐতিহ্য গভীরভাবে জড়িত। তার চাচা রব ফোর্ড একসময় টরন্টোর মেয়র ছিলেন এবং শহরের রাজনীতিতে শক্তিশালী প্রভাব রেখেছিলেন। আরেক চাচা ডগ ফোর্ড বর্তমানে অন্টারিও প্রদেশের প্রিমিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৪ সাল পর্যন্ত মাইকেল ফোর্ড তার কারাবন্দী পিতা এনিও স্টার্পের পদবি ব্যবহার করতেন। পরে তিনি ফোর্ড পদবি গ্রহণ করেন এবং সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশ নিতে শুরু করেন।
মাইকেল ফোর্ডের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় টরন্টোর ওয়ার্ড ২, ইটোবিকোক নর্থ এলাকা থেকে। শুরুতে তিনি কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে তার চাচা রব ফোর্ড মেয়র নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে শেষ পর্যন্ত তিনিও সেই সময় প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেন। পরবর্তীতে রব ফোর্ড ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি মেয়র নির্বাচনের পরিবর্তে ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সময় মাইকেল ফোর্ড ইটোবিকোক নর্থ এলাকা থেকে টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ডের ট্রাস্টি হিসেবে নির্বাচিত হন এবং প্রায় দুই বছর এই দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৬ সালে রব ফোর্ডের মৃত্যুর পর ওয়ার্ড ২–এর কাউন্সিলর পদ শূন্য হয়ে যায়। তখন মাইকেল ফোর্ড ট্রাস্টি পদ থেকে পদত্যাগ করে ওই আসনে উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি ১১ জন প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করে বিপুল জয় অর্জন করেন। তিনি ৭০ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন, যা তাকে টরন্টোর রাজনীতিতে দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
টরন্টোর আসন্ন মেয়র নির্বাচনকে অনেকেই শহরের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, যানজট কমানো এবং নগর অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা এসব ইস্যু আগামী নির্বাচনে প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে মাইকেল ফোর্ড যদি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন, তবে টরন্টোর রাজনীতিতে তা একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

